সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু প্রযুক্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যে জটিলতা দেখা দেবে মধ্যপ্রাচ্যে

চলতি বছরের ২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে। উদ্দেশ্য, সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়া। এই চুক্তি সই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশাল আলোড়ন আর গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবকে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই এখনই এই চুক্তি কার্যকর হচ্ছে । তবে চুক্তির প্রাথমিক আলোচনাই ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেখতে এটি সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন চুক্তির মতো মনে হলেও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।

তাদের মতে, এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শৃঙ্খলার ভিত্তিই দুর্বল করে দিতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের এক বিপজ্জনক নতুন নজিরও।

চুক্তিটি হঠাৎ এত বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠার কারণ একটাই—এর মাধ্যমে সৌদি আরব এমন কিছু বিশেষ ছাড় পেতে পারে, যা আগে অন্য কোনো অ-পারমাণবিক দেশ কখনো পায়নি। বিশেষ করে সৌদি আরব যদি নিজের মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা পেয়ে যায়, তবে সেই প্রযুক্তি খুব সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগানো যায়।

এই পরিস্থিতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে, যা বিশ্বকে নতুন এক পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে ঠেলে দেবে। এ কারণেই এই বেসামরিক চুক্তিকে পারমাণবিক অ-প্রসারণ নীতির লঙ্ঘন এবং একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ বলে বর্ণনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান।

গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, মূলত ৩০ বছরের জন্য এই ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত চুক্তি সই হয়েছে।

তেলসমৃদ্ধ দেশ হয়েও সৌদি আরব অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ চাহিদা পারমাণবিক শক্তি দিয়ে মেটাতে চায়। এর পেছনে আছে সহজ এক অর্থনৈতিক হিসাব, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার কমিয়ে সেই বেঁচে যাওয়া তেল বিক্রি করে আয় বাড়ানো। এটি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রধান অংশ।

মার্কিন দৈনিক দ্য হিল জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানিগুলো সৌদি আরবের পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে।

এতে যুক্তরাষ্ট্র নিজের পারমাণবিক শিল্পের জন্য বড় ব্যবসার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব বিস্তারও ঠেকিয়ে দিতে পারবে দেশটি।

তবে এই বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালে সৌদি আরবের রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি এক নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশও। সৌদি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারমাণবিক অংশীদারত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে আসছে।

দ্য হিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের আসল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন একটি বিশেষ ছাড় আদায় করা, যাতে তারা নিজের মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বৈধ অধিকার পেয়ে যায়।

এই চাওয়ার পেছনে আছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের বিরুদ্ধে একধরনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। সৌদি নীতিনির্ধারকরা অতীতে বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরান যদি কোনোদিন পারমাণবিক অস্ত্র পায়, তবে সৌদি আরবও একই সক্ষমতা নিশ্চিত করবে।

গার্ডিয়ান জানায়, চুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক শর্তটি হলো, সরাসরি তাৎক্ষণিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি না দিলেও চুক্তিতে দুই বছরের যৌথ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। এই সমীক্ষায় যদি সিদ্ধান্ত হয় সৌদি আরবের নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ সুবিধা দরকার, তবে ভবিষ্যতে তারা তা করতে পারবে।

অর্থাৎ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হবে কি হবে না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্ভবত পরবর্তী কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসনের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে।

এই চুক্তি কেন বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি, তা বুঝতে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণমান এবং পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের তদারকি ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা দরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সহযোগিতা আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি ভাগাভাগি করতে হলে অত্যন্ত কঠোর শর্ত মানতে হয়।

২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়, তখন আমিরাত স্বেচ্ছায় একটি কঠোর শর্ত মেনে নিয়েছিল। শর্তটি ছিল, তারা কখনো নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না, আর ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানিও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করবে না।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানায়, এই নিঃশর্ত অঙ্গীকারকেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অ-প্রসারণের ক্ষেত্রে বলা হয় ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’।

কিন্তু বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি চুক্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তটিই বাদ পড়েছে বলে জানায় গার্ডিয়ান। বদলে সৌদি আরবের জন্য ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ খোলা রাখা হয়েছে।

এতে এক পিচ্ছিল ঢাল তৈরি হচ্ছে। সৌদি আরব এই ছাড় পেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ভবিষ্যতে নিজের চুক্তি শিথিল করার দাবি তুলতে পারে। আর অন্য নতুন দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একই রকম শিথিল শর্ত চাইতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল অঞ্চল। সৌদি আরব যদি এই চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের ক্ষমতা পায়, তবে তা এই অঞ্চলে এক ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করে দিতে পারে।

প্রথমত, ইরান তাদের নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা থেকে সম্পূর্ণ সরে যেতে পারে। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবই যখন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলছে, তখন ইরান কেন পিছিয়ে থাকবে?

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তি এবং খোদ ইসরায়েলও এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসরায়েলের নিজেরও একটি অত্যন্ত গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আছে বলে জানা যায়। এই চুক্তি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যকে সম্পূর্ণভাবে তছনছ করে দিতে পারে।

কোনো দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি সত্যিই শান্তিপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম জাতিসংঘের পরমাণু শক্তি তদারকি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)।

আইএইএর একটি বিশেষ ব্যবস্থা আছে, যাকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’। বিশ্বের ১৪৪টি দেশ এতে সই করেছে। এই প্রোটোকল আইএইএকে যেকোনো দেশের পারমাণবিক চুল্লিতে আকস্মিক ও গভীর পরিদর্শনের ক্ষমতা দেয়, যাতে কেউ গোপনে পারমাণবিক প্রযুক্তি সামরিক কাজে ব্যবহার করতে না পারে।

আশঙ্কার বিষয়, বর্তমান সৌদি চুক্তিতে এই ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ মানার কোনো বাধ্যতামূলক শর্তই রাখা হয়নি। বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সই হয়েছে একটি ‘দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি’।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভাষ্য, এই দ্বিপাক্ষিক তদারকি ব্যবস্থা কখনো আন্তর্জাতিক বা আইএইএর পরিদর্শনের মতো গ্রহণযোগ্য ও কঠোর নিরাপত্তা দিতে পারে না। এটি মূলত একটি দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থা, যা পারমাণবিক সুরক্ষাকেই ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

এই পারমাণবিক চুক্তি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ। এই খেলায় জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং চীন-রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশ।

ওয়াশিংটনের জন্য এই চুক্তির বড় সুবিধা অর্থনৈতিক লাভ এবং রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের হিসাবে, এই চুক্তি সফল হলে আগামী ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এটি সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অংশীদারকে চীন বা রাশিয়ার বলয়ে চলে যাওয়া থেকেও বিরত রাখতে পারে বলে জানায় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।

কিন্তু এই সমীকরণ জটিল হয়ে পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক এক অনড় দাবিতে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হঠাৎ যোগ করেছেন এক নতুন শর্ত। এই পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে অবশ্যই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে এবং ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ যোগ দিতে হবে।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা সৌদি আরবকে উভয়সংকটে ফেলে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে একটি অনড় নীতি ধরে রেখেছে। তা হলো, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির একমাত্র পূর্বশর্ত হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য একটি পথ। কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো সম্ভাবনাই সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক অভিযান আর প্রাণহানি সৌদি আরবের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি চরম ক্ষোভ তৈরি করেছে।

দ্য হিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত না করে শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের শর্ত মেনে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলানো সৌদি রাজপরিবারের জন্য অত্যন্ত রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়, এতে সৌদি সরকারের বৈধতাই ধুলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।

সৌদি আরব একটি বড় ইসলামি ও আরব রাষ্ট্র হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের আঞ্চলিক নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। তাই তারা ট্রাম্পের এই দাবি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে, আর আশা করছে—তিনি হয়তো এই অনড় অবস্থান থেকে সরে আসবেন।

সৌদি আরবের সতর্কতার পেছনে আরেকটি বড় কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা। আব্রাহাম চুক্তিতে সই করা প্রথম দেশগুলোর একটি ছিল আমিরাত। চুক্তির ফলে সেখানে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছিল। যেমন, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আয়রন ডোম প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল।

কিন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নির্মম আচরণে আমিরাতের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানায় দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে আবুধাবির ইহুদি উপাসনালয় (সিনাগগ) নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বন্ধ রাখতে হয়েছে, আর সেখানকার ধর্মীয় উৎসবও এখন পালন করা হচ্ছে গোপনে।

ফলে আরব দেশগুলোর কাছে আব্রাহাম চুক্তি এখন আর কোনো অনুকরণীয় আদর্শ নয়, বরং একটি বাড়তি সতর্কবার্তা।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক এই চুক্তির বিভিন্ন দুর্বল দিক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ৮০ বছরের বৈশ্বিক পারমাণবিক শৃঙ্খলা ইতিমধ্যে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। এই চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে অনুমোদিত হলে বৈশ্বিক পারমাণবিক নিয়মনীতির শিথিলকরণ আরও জটিল হবে।

তাদের ভাষ্য, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত রাখতে প্রতিনিয়ত লড়ছে। অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেসের সৌদি আরবের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের এই পথ খুলে দেওয়া উচিত নয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের ভাষ্য, গাজা যুদ্ধের এই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা সৌদি আরবের জন্য এতটাই রাজনৈতিক ঝুঁকির যে তা সৌদি রাজপরিবারের টিকে থাকার ওপরই আঘাত হানতে পারে। তাই সৌদিরা এই শর্ত নিয়ে জলঘোলা না করে নীরবে সেটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষকরা মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে এবং সমালোচকদের শান্ত করতেই এই নতুন শর্ত এনেছেন, যাতে তিনি দরকষাকষির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন—এমনটা না মনে হয়। ইসরায়েলের বর্তমান চরমপন্থী সরকারের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্থাপনকে তারা এই মুহূর্তে বাস্তবতাবর্জিত, প্রায় অসম্ভব এক চিন্তা বলছেন।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঠিক আগে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি গভীর সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব। পাকিস্তানের কাছে আছে প্রায় ১৭০টিরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র, আর দেশটি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অ-প্রসারণ চুক্তিতেও সই করেনি।

তাদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের পরমাণু শক্তি দিয়ে সৌদি আরবের সুরক্ষায় ব্যবহারের এক অনানুষ্ঠানিক বা দ্বিপাক্ষিক ‘পারমাণবিক ছাতা’ তৈরি হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, সৌদি আরব গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের একাধিক পথ বা ব্যাকআপ পরিকল্পনা সচল রেখেছে।

তাই যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি বিশ্ব শান্তি ও পারমাণবিক অ-প্রসারণ ব্যবস্থার জন্য নিয়ে এসেছে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়। অর্থনৈতিক লাভ এবং চীন-রাশিয়ার সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র বিসর্জন দিতে চলেছে নিজেদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও কঠোর পারমাণবিক নীতি।

সৌদি আরবকে নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া এবং আইএইএর কঠোর অতিরিক্ত প্রোটোকল পরিদর্শনের বাইরে রাখা—এই দুই সিদ্ধান্ত বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে এমন এক বিপদের মুখে, যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে উঠবে অসম্ভব। এটি অন্যান্য দেশের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও উসকে দেবে, আর আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তিগুলোকে মূল্যহীন করে তুলবে।

Related Articles

Latest Posts