বাংলাদেশে এ বছর ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি ছড়ানো ধরন (সেরোটাইপ) হয়ে উঠেছে ডিইএনভি-৩। গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এ তথ্য জানিয়েছে । গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়ার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
সম্প্রতি আইইডিসিআর ৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে। এতে দেখা যায়, ৬৫ জন বা ৯১ দশমিক ৫৫ শতাংশ রোগী ডিইএনভি-৩-এ আক্রান্ত। বাকি ছয়জন বা ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ আক্রান্ত ছিলেন ডিইএনভি-২-এ।
অন্যদিকে, গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২, হার ছিল ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর ছিল ডিইএনভি-৩ (৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ), ডিইএনভি-১ (৮ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং ডিইএনভি-৪ (৬ দশমিক ৩ শতাংশ)। দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী।
ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। প্রতিটি সেরোটাইপের আবার একাধিক জিনগত ধরন (জিনোটাইপ) আছে।
অতীতে বড় বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ডিইএনভি-২-এর সম্পর্ক পাওয়া গেলেও রোগ কতটা গুরুতর হবে, তা শুধু সেরোটাইপের ওপর নির্ভর করে না।
ডা. জাকী বলেন, কোনো একটি সেরোটাইপকে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি ভয়ঙ্কর বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, শুধু সেরোটাইপের কারণে ডেঙ্গু বেশি গুরুতর হয়, এমন বলা যাবে না। রোগের তীব্রতা নির্ভর করে ভাইরাসের ধরন, রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং তার আগে থেকে থাকা অন্যান্য রোগের ওপর।
তিনি আরও বলেন, দেশের সব এলাকায় একই সেরোটাইপ পাওয়া যায় না। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের হাসপাতাল থেকে পাওয়া নমুনা আর পার্বত্য অঞ্চল বা গ্রামীণ এলাকা থেকে সংগ্রহ করা নমুনার মধ্যে পার্থক্য আছে।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে পরিস্থিতি একরকম না। শহরে একটা সেরোটাইপ বেশি থাকতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য দিয়ে পুরো দেশের চিত্র বোঝানো ঠিক হবে না।
আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, যাদের আগে ডেঙ্গু হয়েছে, তারা আবার অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমসহ গুরুতর জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। যাদের কিডনি, লিভারের রোগ, ক্যানসার বা অন্য কোনো সক্রিয় অসুস্থতা রয়েছে, তারা যেকোনো সেরোটাইপে আক্রান্ত হলেও গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকেন। এটি প্রথম সংক্রমণ নাকি দ্বিতীয় সংক্রমণ, তা-ও একমাত্র বিবেচ্য নয়।
ডা. জাকী বলেন, জনসচেতনতামূলক প্রচারে কোনো একটি সেরোটাইপকে বেশি ভয়ঙ্কর হিসেবে তুলে ধরা ঠিক না। এর বদলে আবার সংক্রমণ এবং আগে থেকে থাকা রোগের ঝুঁকির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬ হাজার ৬৮৪ জন।
এদিকে চিকিৎসকেরা বলছেন, গত দুই সপ্তাহে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নজমুল আহসান বলেন, রোগী বাড়ায় হাসপাতালটিতে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিটি ভর্তি চক্রে এখন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক জরিপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ মৌসুমে ডিইএনভি-২ ও ডিইএনভি-৩—দুই ধরনের ভাইরাসই ছড়াচ্ছে। তবে ডিইএনভি-৩-এর উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, চারটি সেরোটাইপের মধ্যে ডিইএনভি-২ ও ডিইএনভি-৩ তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করতে পারে।
তবে তিনি বলেন, আগে একবার ডেঙ্গু হওয়া কোনো ব্যক্তি যদি পরে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হন, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তিনি জানান, অনেক রোগী খুব দ্রুত শকে চলে যাচ্ছেন। তবে এখন চিকিৎসকেরা গুরুতর ডেঙ্গু সামলানোর ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ।
তিনি বলেন, আমরা এমন রোগী দেখছি, যাদের অবস্থা খুব দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হয়েছে। ফলে অধিকাংশ রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন।
নজমুল আহসান বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর সঙ্গে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগী অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। কিছু রোগীর হৃদ্যন্ত্রজনিত জটিলতাও হচ্ছে। ডেঙ্গুর কারণে হেপাটাইটিস হলে শুধু স্বাভাবিক নিয়মে শরীরে তরল দেওয়াই যথেষ্ট নয়।
তার ভাষায়, ডেঙ্গুর কারণে যদি হেপাটাইটিস হয় এবং লিভারের এনজাইমের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাহলে চিকিৎসার ধরন বদলাতে হয়। এসব রোগীকে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় এবং সাধারণ ডেঙ্গু চিকিৎসার পাশাপাশি অতিরিক্ত ওষুধও দিতে হয়।
তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যু এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
