শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, জামায়াতের উত্থান এবং বর্তমান সরকারের পাঁচ মাস নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছর পার হয়েছে। রাজপথের দাবি অনুযায়ী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন কতটা দৃশ্যমান হয়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে দীর্ঘ সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরে।
দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের বেশি সময় পর, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার এখন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার, প্রশাসনে সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক চাপ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
এর পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ভারত থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়গুলো নিয়েও রাজনীতিতে আলোচনা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন, সরকারের কার্যক্রম, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ, বিরোধী দলের রাজনীতি এবং ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দ্য ডেইলি স্টার: ১৭ বছর রাস্তায় আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর আবার জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরেছে। এখন আপনি মন্ত্রী। এই পালাবদলকে কীভাবে দেখছেন?
মির্জা ফখরুল: গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছি।
বিএনপির জন্য সরকারে আসা নতুন কিছু নয়। দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। ফ্যাসিস্ট (ফ্যাসিবাদী) হাসিনা সরকার রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ায় এই অভ্যুত্থানের আগে থেকেই আমরা দেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলাম।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে আমরা সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এখন আমাদের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং মানুষের আশু চাহিদার বিষয়গুলো একই সঙ্গে দেখতে হচ্ছে।
আমাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আমরাও সেই প্রত্যাশা পূরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এর জন্য সার্বক্ষণিক মনোযোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়, যার কারণে আমার নিজের ব্যস্ততাও অনেক বেড়ে গেছে।
দ্য ডেইলি স্টার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন?
মির্জা ফখরুল: এই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হতে পারে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ছিল।
১৫ মাস ধরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলেছে। বিএনপি, ছাত্রনেতা, জামায়াত ও অন্যান্য দল একসঙ্গে বসে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছে।
তবে কিছু লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি এবং বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সংসদের উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাবে আমরা কখনো একমত ছিলাম না এবং এ বিষয়ে আমরা ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়েছিলাম। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই আমরা গণভোটে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু গণভোটের চারটি প্রশ্নে বিষয়গুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা জুলাই সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
জুলাই সনদে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করবে। সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে সেখানে অংশ নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এই আলোচনা থেকে দূরে রয়েছে। এর বদলে তারা বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তাদের এই ভূমিকা নেতিবাচক।
বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য জামায়াতের উচিত সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে যোগ দেওয়া।
দ্য ডেইলি স্টার: বেশ কয়েকটি দলের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থান যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
মির্জা ফখরুল: কিছু মানুষের হতাশা যুক্তিসংগত। কারণ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং দুর্বল অর্থনৈতিক পরিকল্পনাসহ গভীর কিছু সংকট রেখে গেছে। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষানীতির কারণে অনেক তরুণ সাধারণ বিষয়ে ডিগ্রি নিলেও তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা নেই। ফলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
দেশের অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনার বদলে মূলত প্রকল্পভিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট, বিশেষ করে শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে।
কোনো দেশ রাতারাতি বদলায় না। পরিবর্তনের জন্য সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন। প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না। তবেই দেশ ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দিকে এগোতে পারবে। বিএনপি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
দ্য ডেইলি স্টার: অন্তর্বর্তী সরকারের সার্বিক কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মির্জা ফখরুল: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অর্জন হলো প্রয়োজনীয় সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করা এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তনের জন্য একটি দিকনির্দেশনা দেওয়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তারা বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার সব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। তাদের প্রধান সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রত্যাশা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। সরকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির স্থায়ী সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়।
দ্য ডেইলি স্টার: সম্প্রতি শেখ হাসিনা বলেছেন যে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন।
মির্জা ফখরুল: এটা আমার কাছে হাসিনার স্টান্ট পলিটিক্স মনে হয়, যেহেতু তিনি সব সময় এমন রাজনীতিই করেন। উনার দেশে ফিরে আসার পরিণতিটা যদি উনি চিন্তা করেন, তাহলে তো উনাকে আবার ভাবতে হবে। কারণ, আসার সঙ্গে সঙ্গে উনি গ্রেপ্তার হবেন। ইতিমধ্যে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা আছে। উনি আসবেন, তাকে এত সাহসী বলে আমার মনে হয় না।
কারণ, আমি বরাবরই দেখেছি, বহু আগের কথাই বলি। উনি দেশে ফিরেছেন এমন একটা সময়ে, যখন জিয়াউর রহমান সাহেব তাকে আসার সুযোগ করে দিলেন। তারপরেই, যেদিন জিয়াউর রহমান সাহেব শহীদ হলেন, ওই দিন কিন্তু উনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন। উনি ত্রিপুরার কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কেন? উনার তো ঢাকায় ফিরে এসে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কথা ছিল। আরে উনি তো তখন বড় নেত্রী, উনি তো দেখবেন যে কী হচ্ছে। পালিয়ে যাচ্ছিলেন কেন? এই পালানোর ব্যাপারটা তার বহু আগে থেকেই আছে।
দ্য ডেইলি স্টার: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এখনো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। আপনার কি মনে হয়, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?
মির্জা ফখরুল: এটা আমি বলতে পারব না। তবে ভারতের তাকে ফেরত দেওয়া উচিত। এ জন্য যে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাকে ভালো করার ক্ষেত্রে এটা একটা বড় বাধা হয়ে আছে। ফেরত দিলে তারা ভালো কাজ করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা আরও ভালো হবে।
দ্য ডেইলি স্টার: যত দিন হাসিনাকে ফেরত না দেবে, তত দিন কি সম্পর্কে একটা নেতিবাচক প্রভাব থেকেই যাবে?
মির্জা ফখরুল: একটা চাপ তো থেকেই যাচ্ছে। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি যে ক্ষতি করেছে, সেই লোকটাকে রেখে দিয়েছেন, তো ওখানে স্বভাবতই আমাদের তো একটা সমস্যা তৈরি হয়। আর ওখান থেকে বসে তিনি সমানে রাজনীতি করছেন। এতে একটা সমস্যা তৈরি হয়।
দ্য ডেইলি স্টার: একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আপনার কি মনে হয়, ১০ বছর পর আওয়ামী লীগের অবস্থান কোথায় থাকতে পারে?
মির্জা ফখরুল: আওয়ামী লীগের মূল জায়গাগুলোতেই আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে আগে মানুষের ধারণা ছিল যে এটি একটা লড়াকু পার্টি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা একটা দল। কিন্তু গত ১৫ বছরে তারা সেটা প্রমাণ করতে পারেনি। বরং আমাদের আগের কথাগুলোই প্রমাণ করেছে যে আওয়ামী লীগ হচ্ছে একটি গণতন্ত্রবিরোধী দল। তারা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। তারা একদলীয় শাসন করতে চায়। এটা মানুষ এখন বিশ্বাস করে। কারণ মানুষ অতীতটাকে এ ক্ষেত্রে মিলিয়ে দেখেছে।
আরেকটা হয়েছে যে তৃণমূল পর্যন্ত তাদের নেতা-কর্মীরা এমন অত্যাচার-নির্যাতন করেছে, যা মানুষ এখনো ভুলতে বা সহ্য করতে পারে না…আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে…এটা মানুষ সহ্য করতে পারে না। আমার এলাকায় তো আওয়ামী লীগ প্রধান এলাকা। কিন্তু এখন ওখানেই সাধারণ মানুষ এটা চায় না যে আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসুক বা ক্ষমতায় যাক। তারা বিএনপির সমালোচনা করবে, জামায়াতের সমালোচনা করবে ঠিকই আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে তারা ঘৃণা করে। এই ঘৃণাটা আওয়ামী লীগ নিজেই তৈরি করেছে।
নির্বাচনগুলো ঠিকমতো না করা, রাজনীতি ভুল করা…গায়ের জোরে কি মানুষের মন জয় করা যায়? চিন্তা করতে পারেন? লক্ষ লক্ষ মানুষ শিশু-বৃদ্ধ সবাই নেমে এসেছে রাস্তায়। এটা অভূতপূর্ব। একটা মাত্র কারণ যে, তারা চেয়েছিল যে না, এখানে আমরা হাসিনাকে দেখতে চাই না। আমরা আওয়ামী লীগকে দেখতে চাই না।
সুতরাং যারা প্রচার করে যে হাসিনা ফিরে আসবে, আওয়ামী লীগ আবার আসবে…আওয়ামী লীগ কোনো দিন আর উঠতে পারবে না। যতক্ষণ না তারা তাদের পুরো বিষয়টি পরিবর্তন করে। এখনো আওয়ামী লীগ ধমকিয়ে কথা বলে, মেরে ফেলব বলে।
দ্য ডেইলি স্টার: এবারের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের ফল দলটির ইতিহাসে অন্যতম সেরা। জামায়াতের এই উত্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আগামী নির্বাচনগুলোতে দলটির প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করেন কি?
মির্জা ফখরুল: এটা আমারও একটা উদ্বেগের কারণ। আওয়ামী লীগের ভুল রাজনীতির কারণে…রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করতে না দেওয়া, অত্যাচার-নির্যাতন করার ফলেই কিন্তু এই ডানপন্থীদের উত্থানটা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি আওয়ামী লীগ রাখত তাহলে, আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারতাম, জামায়াতও যদি ঠিকমতো কাজ করতে পারত, তাহলে কিন্তু আজকে এই উত্থানটা হতো না।
এটা কিন্তু গণতন্ত্রের বিচ্যুতির কারণেই হয়েছে। গত বছরগুলোতে যে ঘাটতি ছিল, তারই পরিণতি এটা।
এখানে আরেকটা ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের একটা বড় অংশ জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। আমাদের স্টাডিও তাই বলে। এটাও একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে যে এবারের নির্বাচনে নতুন একটা ঘটনা ঘটেছে। এবার সনাতন ধর্মের মানুষেরা কিন্তু বিএনপিকে অনেক বেশি ভোট দিয়েছে। কারণটা হচ্ছে, বিএনপি একটা মধ্যপন্থী উদার রাজনীতিকে রিপ্রেজেন্ট করে। যখন তুলনার সময় এসেছে, তখন তারা অবশ্যই বিএনপিকে সমর্থন করেছে।
দ্য ডেইলি স্টার: বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মির্জা ফখরুল: এখন পর্যন্ত জামায়াত কিন্তু নেতিবাচক কিছু করেনি। তবে সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে তাদের ভূমিকাটা আমি মনে করি ইতিবাচক হচ্ছে না। তাদের উচিত সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতে আসা এবং এখানে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোকে নির্ধারণ করা, যেগুলোতে সমস্যা আছে। এই একটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে তারা ইতিবাচক ভূমিকাই রেখেছে।
দ্য ডেইলি স্টার: ৫ মাসের বেশি পার হওয়া বিএনপি সরকারের মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?
মির্জা ফখরুল: আমি তো মনে করি এটা অনেক বড় সাফল্য। পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় জিনিস হয়েছে, সেটা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ইশতেহারে যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ করার চেষ্টা করছি।
ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, খাল খনন কর্মসূচি, কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। দুস্থ খেলোয়াড়দের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মধ্য দিয়ে মেধা অন্বেষণের (ট্যালেন্ট হান্টিং) একটা কাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নকলটা প্রায় বন্ধ হয়েছে। এটা একটা বড় অর্জন। ভালোভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানোর আবার নতুন করে চেষ্টা করা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও সেই পরিবর্তন এসেছে।
মিডিয়া এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোথাও থেকেও কোনো ফোন আসে না। কোনো চাপ নেই। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। অন্যদিকে একটা বাজেট হয়েছে, অর্থনীতিকে আবার সচল করা, অর্থনীতিকে ঠিক জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা, মানুষের চাপ কমানো—এসব কাজ শুরু হয়েছে। আমি মনে করি যে এই পাঁচ মাসে সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টার: গত ৫ মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্টি আছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নিয়ে মানুষের প্রশ্ন আছে।
মির্জা ফখরুল: একটি দেশে রাতারাতি সব ঠিক হয়ে যাবে, এটা হয় না। আমেরিকার হিসাব নিয়ে দেখেন, সেখানেও প্রতি মুহূর্তে অপরাধ হচ্ছে। ইউরোপেও তাই হয়। এটা একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে না।
এই ব্যাপারে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে রাজনৈতিকভাবে কোনো প্রাধান্য বা আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কি না। অনেকগুলো ক্ষেত্রে দলীয় লোকজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং রাতারাতি ঠিক হয়ে যাবে এমন মনে করার কোনো কারণ তো নেই।
তারপর পুলিশ বিভাগ সম্পূর্ণ দলীয়করণ হয়ে গিয়েছিল। সেটাকে আবার ঠিক করে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে যতটা সম্ভব। যারা সরাসরি হত্যাযজ্ঞে যুক্ত ছিল, তাদেরকে বাদ দিয়ে আবার ভালো পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। নতুন করে অফিসার নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সুতরাং কাজ চলছে, কিন্তু রাতারাতি এটা সম্ভব না।
দ্য ডেইলি স্টার: কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ‘আমার চার মাস মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি কিছুই বদলায়নি। যারা ঘুষ খেত, তারা একইভাবে ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। যারা ভালো কাজ আটকে দিত, একইভাবে আটকে দিচ্ছে।’ আপনার কেন এমন মনে হলো?
মির্জা ফখরুল: দুর্ভাগ্যক্রমে প্রশাসনের মধ্যে যারা আছেন, তারা অনেকেই এখনো বদলাননি। আগের মতোই তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন…আগের সরকারের সঙ্গে যারা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এখন এসে এই সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন অনেক ক্ষেত্রে। তারাই সমস্যাগুলো তৈরি করছেন।
এই ক্ষেত্রে যারা ভালো কাজ করেন, তারা সব সময় সেই সুবিধাটা পান না। কারণ আমরা পুরোনো পদ্ধতিটাকে পরিবর্তন করতে পারিনি। তবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আসবে।
দ্য ডেইলি স্টার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। তিনি দীর্ঘ সময় অফিস করছেন, ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন এবং তার নিরাপত্তাবহরও ছোট করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অন্যদেরও এসব অনুসরণ করতে উৎসাহিত করছেন। মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা কি প্রধানমন্ত্রীর এই দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করছেন?
মির্জা ফখরুল: মন্ত্রিসভার যারা সদস্য এরাই কি দেশটাকে চালান? তারা নীতি (পলিসি) দেন। তারা কাজ করার চেষ্টা করেন, তারা তো মাঠে কাজ করেন না। বেসামরিক আমলাদের অনেক বেশি ধরতে হবে। তাদেরকেই মাঠে কাজটা করতে হবে সবচেয়ে বেশি।
মন্ত্রিসভার সবাই খুবই সক্রিয়। প্রত্যেকবার দেখবেন আমাদের মন্ত্রীরা ছুটির দিন রাতেই এলাকায় চলে যান। তারপর সকালে এসে মিটিং করেন। সারা দিন কাজ করেন। সচিবালয়ে যেহেতু অনেকক্ষণ কাজ করেন প্রধানমন্ত্রী, সে কারণেও মন্ত্রীদের আসা-যাওয়া থাকে। ফলে কাজ সবাই করছেন।
দ্য ডেইলি স্টার: সম্প্রতি বেশ কয়েকটি নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা দেখেছি। ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপির বিভিন্ন পদে থাকা নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে, নাকি দলীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে?
মির্জা ফখরুল: যোগ্যতা আছে বলেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একটি লোক বিএনপি করে বলে তার জন্য পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না? এটা তো হতে পারে না, একে গণতন্ত্রও বলে না।
আমেরিকার গণতন্ত্রে বা প্রেসিডেন্টশাসিত সরকারে যখন প্রেসিডেন্ট আসেন, তখন তিনি তার দলের লোকজনদের নিয়েই প্রশাসনকে সাজান। এটাই তাদের প্রথা ও ঐতিহ্য। এখানে দলের লোক হলেই সে গভর্নর হতে পারবে না, দলের লোক হলে সে কোনো চেয়ারম্যান হতে পারবে না—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যদি যোগ্যতা থাকে অবশ্যই যাবে। যোগ্যতা আছে বলেই তো দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ব্যক্তি হতেই পারে। কিন্তু তার যদি যোগ্যতা থাকে, তার যদি মেধা থাকে, তার স্বচ্ছতা থাকে, তার সততা থাকে, তাহলে কেন নিয়োগ পাবে না?
গভর্নর সম্পর্কে এখন সবাই বলবে…ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করে দেখেন তিনি কতটা কার্যকর। তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছ, সৎ এবং সৃজনশীল একজন মানুষ। এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থাগুলো তিনি আসার পর নিয়েছেন, সেগুলো কিন্তু অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই কাজ করছে।
এখানে কিছু রাজনৈতিক ও মেধাবী লোক লাগবে। চিন্তাশীল লোক লাগবে। আপনি শুধু ওই আমলা দিয়ে কাজ করতে চাইলে কোনো কিছু অর্জন করতে পারবেন না। সেখানে রাজনীতি অবশ্যই থাকতে হবে।
আইয়ুব খানও বহু কাজ করেছিলেন। এরশাদও বহু কাজ করেছিলেন। হাসিনাও বেশ কয়েকটা কাজ করে গেছেন। কিন্তু রাজনীতিটা তারা করতে পারেননি। সেখানে এই যে প্রতিষ্ঠানগুলো, এখানে যদি রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা কাজ করে, স্বচ্ছতা থাকে, সততা থাকে, যোগ্যতা থাকে, তাহলে কেন নিয়োগ হবে না?
দ্য ডেইলি স্টার: দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় কি মনে হয়, একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করাই বিএনপি সরকারের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে?
মির্জা ফখরুল: নির্বাচন অবশ্যই খুব শান্তিপূর্ণ হবে। মাঠে যা দেখি, তাতে নির্বাচন খুব শান্তিপূর্ণ হবে। গতবার তো অনেকে ধারণা করেছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হয়তো রক্তপাত হবে। হয়েছে? হয়নি তো। এবারও দেখবেন অত্যন্ত সুন্দর নির্বাচন হবে।
দ্য ডেইলি স্টার: আওয়ামী লীগ স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে?
মির্জা ফখরুল: এটা বলতে পারব না। কারণ, ওই রকম তো নিয়মই নেই। দল হিসেবে অংশগ্রহণ করার নিয়মই নেই। আইনে এখনো এমন বিধান নেই।
দ্য ডেইলি স্টার: বিএনপি কি চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে?
মির্জা ফখরুল: এগুলো আপনাদের ভুল ধারণা। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে শুধু কোনো এক পক্ষের দিকে যাওয়াটা সম্ভবই না। সব দিক হিসাব করেই চলতে হবে। কাউকেই শত্রু বানানো যাবে না, কাউকেও অবজ্ঞা করা যাবে না। সবাইকে বন্ধু করেই চলতে হবে।
দ্য ডেইলি স্টার: সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে বাধা ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। দলটি এসব ঘটনার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা আছে বলে মনে হয়?
মির্জা ফখরুল: দুই-একটা ঘটনা ঘটেছে এটা আমি অস্বীকার করব না। অবশ্যই দু-একটা ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এটা দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত নয় যে তাদেরকে বাধা দিতে হবে। বরং আমাদের কথা হচ্ছে যে, যার যার কাজ তাকে করতে দাও। কোথাও যদি ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে ওইটা স্থানীয়ভাবে ওইখানকার সমস্যা। এটি জাতীয় কোনো সমস্যা নয়।
