এক মায়ের উপহার, আরেক শিশুর বেঁচে থাকা

মায়ের বুকের দুধ কেবল শিশুর খাবার নয়। এটি নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও জীবনের প্রথম আশ্রয়। জন্মের পর একটি নবজাতক যখন প্রথমবার মায়ের বুকের দুধ পান করে, তখন সে কেবল ক্ষুধা মেটায় না, বরং মায়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য বন্ধন। তবে সব শিশুর ভাগ্যে সেই আশ্রয় জোটে না।

ঈদুল আজহার পরদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন নাহিদের মা নাসিমা ইসলাম। তীব্র বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচাতে পারেননি।

মাত্র ১৮ দিন বয়সে নাহিদ ইসলাম হারায় তার মাকে। পৃথিবী সম্পর্কে কিছু বোঝার আগেই হারিয়ে গেছে তার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। আর শোকের ভার সামলানোর আগেই পরিবারের সামনে হাজির হয় আরও কঠিন বাস্তবতা, নবজাতকের খাবারের ব্যবস্থা করা। শুরুতে ফর্মুলা দুধ দেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের দ্রুত বুকের দুধের ব্যবস্থা করতে বলেন।

চিকিৎসকেরা জানালেন, জীবনের প্রথম কয়েক মাস বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যার মা নেই, সে কোথায় পাবে?
এরপর শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন, পরিচিতদের কাছে অনুরোধ, এক দাতার কাছ থেকে আরেক দাতার কাছে ছুটে বেড়ানো। কেউ কয়েক দিন সাহায্য করেছেন, কেউ কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই স্থায়ী ছিল না।

নাহিদের খালাতো বোন সামিয়া আক্তার বলেন, প্রতিদিনই তাদের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতো। পরবর্তী দাতার খোঁজ করতে হতো।

ঠিক এমন সময় খুঁজে পান মিল্কশেয়ার নামের একটি নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এখন দুই মাসের বেশি বয়সী নাহিদ দিনে দাতা মায়েদের বুকের দুধ পান করে, আর রাতে প্রয়োজন হলে ফর্মুলা দুধ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য নবজাতক নানা কারণে মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়। কেউ সময়ের আগেই জন্ম নেয়, কেউ নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকে, আবার কারও মা অসুস্থ হয়ে পড়েন বা মৃত্যুবরণ করেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মাতৃত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. রওনক জাহান বলেন, অপরিণত বা গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের ক্ষেত্রে বুকের দুধই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর খাবার। কিন্তু বাংলাদেশে কার্যকর মানবদুগ্ধ ব্যাংক না থাকায় চিকিৎসকদেরও প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয়।

অন্যদিকে অনেক মায়ের শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দুধ তৈরি হয়। তেমনই একজন মা শর্মীলি খান ইতি। ২৬ বছর বয়সী ইতি দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর নিয়মিত দুধ সংরক্ষণ করছিলেন। ফ্রিজ ভর্তি হয়ে গেলেও তার শিশু বোতলে রাখা সেই দুধ খেতে চাইত না।

তখন তিনি ভাবেন, যে দুধ তার সন্তানের প্রয়োজন নেই, তা হয়তো কোনো মা-হারা বা অসুস্থ শিশুর জীবন বাঁচাতে পারবে।
এই ভাবনা থেকেই ইতি নাহিদের জন্য প্রথমে ২১ ব্যাগ বুকের দুধ দান করেন। পরে আরও ১৫ ব্যাগ দেন। বর্তমানে তিনি মিল্কশেয়ারের মাধ্যমে দুটি শিশুকে নিয়মিত দুধ দান করছেন।

মিল্কশেয়ার চালু হয়েছে চলতি বছর। প্রতিষ্ঠাতা জান্নাতুল ফেরদৌসী নিজেও একজন নতুন মা।

জান্নাতুল ফেরদৌসী জানান, তাদের লক্ষ্য বুকের দুধ দানকারী মা ও প্রয়োজন থাকা পরিবারের মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ তৈরি করা। তবে এটি কোনো মানবদুগ্ধ ব্যাংক নয়। তাই দুধ সংগ্রহ, পরীক্ষা বা সংরক্ষণের মতো কাজ তারা করে না।

অ্যাপটিতে দাতা মায়েরা চাইলে নিজেদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট আপলোড করতে পারেন। গ্রহীতা পরিবার সেই রিপোর্ট চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখে নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দাতা মায়ের দুধ নবজাতকের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। তবে তার আগে নিশ্চিত হতে হবে, দাতা মা এইচআইভি, হেপাটাইটিস বা হারপিসের মতো সংক্রমণে আক্রান্ত নন। একই সঙ্গে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় পরিচ্ছন্নতা এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব বিষয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত পরিবারগুলোকেই নিতে হয়।

নাহিদের পরিবার যেমন বরফভর্তি বিশেষ কুলার ব্যাগ নিয়ে অনেক সময় সাত ঘণ্টা পর্যন্ত ভ্রমণ করে হিমায়িত বুকের দুধ সংগ্রহ করেছে। একবারে তারা সাধারণত প্রায় দুই সপ্তাহের প্রয়োজনীয় দুধ নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুধ-আত্মীয়তা।

ইসলামী বিধান অনুযায়ী, কোনো শিশু যদি অন্য একজন নারীর বুকের দুধ পান করে, তাহলে সেই নারী শিশুটির ‘দুধমা’ হয়ে যান। একই সঙ্গে তার সন্তানরা ওই শিশুর ‘দুধ-ভাই’ বা ‘দুধ-বোন’ হিসেবে গণ্য হয়। ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ থাকে না।
এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছে মিল্কশেয়ার। অ্যাপটিতে দাতা মা, গ্রহীতা পরিবার এবং দুধ পান করা শিশুর পরিচয় সংরক্ষণ করা হয়। পরিচয় গোপন রেখে দুধ আদান-প্রদানের সুযোগ নেই।

ফেরদৌসী জানান, সম্ভব হলে ছেলে শিশুর জন্য ছেলে সন্তানের মা এবং মেয়ে শিশুর জন্য মেয়ে সন্তানের মাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি দুই পরিবারকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেও উৎসাহ দেওয়া হয়।

ভবিষ্যতে এই সম্পর্কের তথ্য হালনাগাদ রাখতে প্রতি বছর দাতা ও গ্রহীতা পরিবারের তথ্য নবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে মিল্কশেয়ারের। একই সঙ্গে যেসব পরিবার বুকের দুধ ভাগাভাগির মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে, তাদের নিয়ে নিয়মিত মিলনমেলার আয়োজন করারও পরিকল্পনা রয়েছে, যেন এই বিশেষ আত্মীয়তার বন্ধন দীর্ঘদিন অটুট থাকে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, বুকের দুধ দানের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, বুকের দুধ দান বা গ্রহণের বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে বা পরিচয় গোপন রেখে করা উচিত নয়। ভবিষ্যতে যেন কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা সংশয় তৈরি না হয়, সেজন্য দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের পরিচয় এবং দুগ্ধ-সম্পর্কের (milk-kinship) তথ্য অত্যন্ত স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট উপায়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের কঠোর তত্ত্বাবধানে ও একটি শরিয়াহ কমিটির নজরদারিতে পরিচালিত কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ব্যবস্থা পরিচালনা করলে তা আরও নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য হবে। শুধু মুখে মুখে এই সম্পর্কের কথা জানিয়ে রাখলেই হবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলো এসব তথ্য ভুলে যেতে পারে।

এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছে মিল্কশেয়ার। অ্যাপটিতে ইতোমধ্যে ইসলামি স্কলারদের বিভিন্ন মতামত যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি লিখিত ফতোয়া সংগ্রহের কাজ চলছে, যেন পুরো কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও শরিয়াহসম্মতভাবে পরিচালনা করা যায়।

ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক রয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। দাতা মায়েদের ফোন নম্বর সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় না। ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিরা দেখতে পারেন। 

বর্তমানে মিল্কশেয়ারে নিবন্ধিত ব্যবহারকারী ২৭৬ জন। তাদের মধ্যে ৬৩ জন দাতা মা, ১৪৮টি গ্রহীতা পরিবার। বর্তমানে ১২টি পরিবার অ্যাপটির মাধ্যমে দাতা মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছে।

সংখ্যাটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু নাহিদের মতো একটি শিশুর কাছে এই প্ল্যাটফর্মের অর্থ পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।
সে আর কখনো নিজের মায়ের বুকের দুধ পাবে না। তবু প্রতি কয়েক সপ্তাহ পরপর আরেকজন মায়ের ভালোবাসা তার কাছে পৌঁছে যায়। সেই দুধ কেবল তার শরীরকে পুষ্টি দেয় না, অচেনা দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলে।

আসলে মাতৃত্ব কখনো কখনো নিজের সন্তানের সীমানা পেরিয়ে আরেকটি শিশুর জীবনকে আগলে রাখা। এটাই মাতৃত্বের সৌন্দর্য।

Related Articles

Latest Posts