ভোরের আলো ফুটতেই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড় পাহাড়পুরের ওঁরাও গ্রামে শুরু হয়ে যায় দিনের ব্যস্ততা। কেউ ছুটছেন ধানখেতে, কেউ অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজে। উঠানে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি গরু-ছাগলের দেখাশোনা করছেন নারীরা। শিশুদের কেউ স্কুলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে কাজে যাচ্ছে।
এই গ্রামের প্রবীণদের আড্ডায় এখনো কুরুখ ভাষার শব্দ শোনা গেলেও নতুন প্রজন্মের মুখে তা ক্রমশই বিরল।
জমি হারিয়ে জীবিকার ধরন বদলে যাওয়া, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকটের সঙ্গে বাংলা ভাষার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে উত্তরাঞ্চলের ওঁরাও জনগোষ্ঠীকে এখন করতে হচ্ছে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখার কঠিন লড়াই।
বড় পাহাড়পুরের ওঁরাও গ্রামটিতে বর্তমানে ৩৩টি পরিবারের ১৫২ জন মানুষের বাস। কয়েক বছর আগেও প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই কিছু না কিছু আবাদি জমি ছিল। এখন মাত্র তিনটি পরিবারের হাতে আবাদি জমি রয়েছে, তাও আগের তুলনায় অনেক কম। ফলে গ্রামের অধিকাংশ পরিবার কৃষিশ্রমিক হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ বাসিন্দা ৮২ বছর বয়সী বুধু কুজুর। স্ত্রী রুবনি ক্যারকাটাকে (৭৫) নিয়ে এখনো তিনি মাঠে কাজ করেন। তাদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তারা আলাদা সংসারে থাকেন।
বুধু কুজুরের ভাষ্য, প্রায় ৫০ বছর আগে বড় পাহাড়পুর ছিল মূলত ওঁরাও অধ্যুষিত গ্রাম। গ্রামের অধিকাংশ জমির মালিকও ছিলেন ওঁরাওরা। সময়ের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে বসতি গড়েন। অনেক ওঁরাও পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে জমি বিক্রি করে দেয়।
‘আমি পৈতৃক সূত্রে ৩০ বিঘা জমি পেয়েছিলাম। এখন শুধু বসতভিটার পাঁচ শতাংশ জমি আছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে কম দামে আবাদি জমি বিক্রি করতে হয়েছে জানিয়ে বুধু জানান, জমি-সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার খরচ জোগাতেও তাকে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। একসময় সব আবাদি জমি হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
বুধু বলেন ‘আমরা জমি হারিয়েছি। ধীরে ধীরে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। কুরুখ আমাদের মায়ের ভাষা। এ ভাষায় কথা বললে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।’
তার আক্ষেপ—৪০ বছরের বেশি বয়সী ওঁরাওরা একত্রিত হলে এখনো কুরুখ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেই ভাষা বুঝতে বা বলতে পারে না।
‘আমরা বয়স্করা যখন কুরুখ ভাষায় কথা বলি, এ যুগের ছেলে-মেয়েরা শুধু তাকিয়ে থাকে। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে যতটুকু পারি বাঁচিয়ে রেখেছি। আমাদের মৃত্যুর পর হয়তো ভাষা আর সংস্কৃতি—দুটোই হারিয়ে যাবে,’ বলেন বুধু।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আদিবাসী পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ওঁরাও জনসংখ্যা ৮৫ হাজার ৮৪৬। এর মধ্যে পুরুষ ৪২ হাজার ৪৯৫ এবং নারী ৪৩ হাজার ৩৫১ জন।
উত্তরাঞ্চলে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসছে ওঁরাও জনগোষ্ঠী। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসতি রয়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজ তাদের প্রধান জীবিকা হলেও জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন অনেক পরিবার দিনমজুরি, নির্মাণশ্রমিক, ইটভাটায় ও মৌসুমি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল।
রংপুর ওঁরাও আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ভিক্টর কুজুর বলেন, ‘ওঁরাওদের আদি নিবাস বর্তমান ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় ও এর আশপাশের এলাকায়। ব্রিটিশ আমলে কৃষি ও শ্রমের কাজে তাদের একটি অংশ তৎকালীন বাংলার উত্তরাঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে।’
‘কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে বসবাস করলেও ওঁরাও জনগোষ্ঠীর জীবনে এখনো নানা বঞ্চনার ছাপ রয়েছে,’ বলেন তিনি।
ভিক্টরের মতে, রংপুরের পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ, পীরগাছা ও তারাগঞ্জ উপজেলায় ৩০টির বেশি ওঁরাও গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের প্রতিটিতে প্রায় ৩০ থেকে ১৫০টি পরিবার বাস করে। অনেক পরিবার জমিজমা হারিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে।
ওঁরাওদের মাতৃভাষা কুরুখ, যা দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। একসময় ওঁরাও গ্রামগুলোতে দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান ভাষা ছিল এটি। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
ভিক্টোর কুজুর বলেন, ‘অধিকাংশ শিশু বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করছে। পরিবারেও বাংলা ভাষার ব্যবহার বেড়েছে। ফলে কুরুখ ভাষা এখন অনেক পরিবারের কেবল প্রবীণদের কথোপকথনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।’
বদরগঞ্জ উপজেলার ওঁরাও গ্রামের ৭৮ বছর বয়সী বাসিন্দা নির্মল কুজুর বলেন, ‘একসময় গ্রামের অনুষ্ঠান, গান, গল্প ও লোককথা—সবকিছুই কুরুখ ভাষায় হতো। এখন অনেক তরুণ-তরুণী নিজের ভাষায় সাবলীলভাবে কথাই বলতে পারে না।’
ভূমি হারানোর সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির সংকটও গভীরভাবে যুক্ত বলে মনে করেন নির্মল।
তিনি বলেন, ‘একসময় অনেক পরিবারের চাষযোগ্য জমি ছিল। উত্তরাধিকারসূত্রে জমি ভাগ হয়ে ছোট হয়েছে। আবার বিরোধ বা অর্থনৈতিক চাপে অনেকে জমি বিক্রি করেছেন। ফলে অনেক পরিবার এখন কার্যত ভূমিহীন।’
বর্তমানে যেসব পরিবারের জমি আছে, আগামীতে সেগুলোও টিকে থাকবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নির্মল।
‘প্রতিনিয়ত আবাদি জমি কমছে। ওঁরাওদের নতুন পেশা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দক্ষতার দিকে যেতে হবে। তা না হলে, যা আছে সেটুকু জমিও থাকবে না,’ যোগ করেন তিনি।
ওঁরাও সমাজে সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষি, প্রকৃতি ও ঋতুচক্রের সম্পর্ক গভীর। সরহুল, কারাম ও সোহরাই তাদের প্রধান উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম।
উৎসবের সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নারী-পুরুষ একসঙ্গে নাচ-গান করেন। মাদলসহ বিভিন্ন দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। লোকগানে উঠে আসে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, কৃষিশ্রম, জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক সম্প্রীতির নানা গল্প।
সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি হারিয়ে না গেলেও কুরুখ ভাষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানান পীরগঞ্জের ছোট পাহাড়পুর ওঁরাও গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী সুবর্ণা কুজুর (২০)।
সুবর্ণা বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি আমরা ধরে রাখছি। কিন্তু কুরুখ ভাষা হারিয়ে ফেলছি। বাংলা ভাষার বেশি চর্চার কারণে আমরা কুরুখে অভ্যস্ত হতে পারছি না।’
দাদা-দাদি ও পরিবারের প্রবীণরা কুরুখ ভাষায় কথা বললেও তরুণদের অনেকেই তা বুঝতে পারেন না বলে স্বীকার করেন এ তরুণী।
সুবর্ণার দাদা সুখেন কুজুর (৭৫) বলেন, ‘আধুনিক বিনোদন, শহরমুখী জীবন ও কর্মসংস্থানের কারণে তরুণদের অনেকেই আগের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন না। একসময় আমাদের জাঁকজমকপূর্ণ সংস্কৃতি ছিল। আগের দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। সেই দিনের কথা মনে হলে চোখে পানি আসে।’
ওঁরাও জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার আগের তুলনায় বাড়লেও অর্থনৈতিক সংকট এখনো অনেক শিশুর শিক্ষাজীবনের পথে তীব্র বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ছোট পাহাড়পুর গ্রামের ১৩ বছর বয়সী স্মৃতি কুজুর সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বড় ভাই আপন কুজুর স্নাতক পড়ছেন। তাদের বাবা সুধীর কুজুর ও মা রাধা রানী ক্যারকাটা কৃষিশ্রমিক। পরিবারের নিজস্ব কোনো আবাদি জমি নেই। রয়েছে বসতভিটার মাত্র চার শতাংশ জমি।
‘খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করছি। আমার দাদাও মাঝে মাঝে খেতে কাজ করেন। পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই। জানি না কতদূর পড়তে পারব,’ বলেন স্মৃতি।
আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও অধিকার নিয়ে সুইস চার্চের অর্থায়নে কাজ করছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা হেকস বাংলাদেশ।
সংস্থাটির রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের রাইটস অ্যান্ড এনটাইটেলমেন্ট বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার পাপন কুমার সরকার বলেন, ‘ওঁরাও শিশুদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়লেও দারিদ্র্যের কারণে অনেকের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়।’
‘বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সমস্যা ও পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করার প্রয়োজনীয়তাও অনেক শিশুকে অল্প বয়সে শ্রমবাজারে নিয়ে যায়। উচ্চশিক্ষায় ওঁরাও শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত,’ যোগ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান পাপন। অনেক ওঁরাও গ্রাম উপজেলা সদর থেকে দূরে হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। নিরাপদ পানি, পুষ্টি ও স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে অনেক পরিবারের।
পাপন বলেন, ‘শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দিয়ে ওঁরাওসহ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা, মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা, সংস্কৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো এবং তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।’
ওঁরাওদের সংস্কৃতি বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন হেকস বাংলাদেশের পার্টনারশিপ কোঅর্ডিনেটর ও নৃবিজ্ঞানী অসিম কুমার রায়।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘তাদের ভাষা, লোকসংগীত, নৃত্য, কৃষিজ্ঞান ও সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য রক্ষা করা নয়; বরং দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের অনেক ওঁরাও গ্রামে এখনো সন্ধ্যা নামলে কোথাও কোথাও মাদলের শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে শত বছরের ইতিহাস, শ্রম, সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার গল্প।’
কিন্তু জমি হারানোর সঙ্গে যদি জীবিকার নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে আর নতুন প্রজন্মের কাছে কুরুখ ভাষা ও ঐতিহ্যের ব্যবহার কমতে থাকে, তাহলে সেই মাদলের সুরও হয়তো একদিন স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।
’ওঁরাওদের টিকে থাকার লড়াই তাই শুধু একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংগ্রামের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও পরিচয় রক্ষার লড়াই—যার সঙ্গে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের ভবিষ্যৎও গভীরভাবে জড়িত,’ বলেন অসীম রায়।
