‘এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাও, না হলে যেখানে পাব সেখানে গুলি’

চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবিতে এক প্রবাসীর বাড়িতে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা।

ওই এলাকার রুনা টাওয়ারের মালিক হাজী ইউসুফের ছেলে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী মো. শওকতকে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চায় দুর্বৃত্ত।

এর একদিন পর গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মুরাদপুরের হামজারবাগ লেনে ৫ নম্বর রোডের রুনা টাওয়ারের বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোস্তাফা স্বপন দ্য ডেইলি স্টারকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড লিস্টের আসামি সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে এ ধরনের ঘটনায় আবারও আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকায়।

এর আগে, গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে অফিসে হামলা ও লুটপাট করা হয়।

এ ঘটনার আগে ডিডিএনের মালিককে ফোন করে এককালীন এক কোটি টাকা এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ডেভিড ইমন। পরে গত ৩০ জুলাই ভারতে পালানোর সময় ইমনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গতকালের গুলির বিষয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী মো. শওকত দুই ভাই ইউসুফ ও রাশেদসহ ভবনটিতে বসবাস করেন। ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এছাড়া বাসার মূল গেটের লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাও নষ্ট ছিল।

ডিসি হাসান মোস্তফা বলেন, ‘একটি বিদেশি নম্বর থেকে শওকতের কাছে ভয়েস মেসেজ দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভবনটির নিচে ২৫-৩০ বছর বয়সী দুজন লোক যান। বাড়ির মালিকের কথা জিজ্ঞাসা করেন দারোয়ানকে।’

‘এরপর বাড়ির গেট লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়েন তারা। এরপর সেখান থেকে হেঁটে গলি থেকে বের হয়ে যান। ঘটনার পর আমরা সেখানে গিয়েছি। কারা এর পেছনে দায়ী সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় বিদ্যুৎ ছিল না। গেটের সিসিটিভিও নষ্ট,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘গুলির ধরন দেখে মনে হয়েছে সেগুলো পিস্তলের গুলি।’

দুই মিনিটের ভয়েস মেসেজে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বলেন, ‘শওকত ভাই, সালাম। তোমার ফুল ফ্যামিলির ব্যাকগ্রাউন্ড, বোনকে কোথায় বিয়ে দিছ, কোথায় কোথায় বিল্ডিং আছে, কোনটার কাজ চলে, ছেলে-মেয়ে কোথায় পড়ে, সব বৃত্তান্ত বড় ভাইয়ের কাছে আছে।’

‘বড় ভাই বলেছে ৫০ লাখ টাকা দিতে। একেবারে সেইফে, স্বাধীনভাবে থাকবা। না হলে প্রত্যেক জায়গায় ঘটনা ঘটবে। তোমাকে ফোন দিচ্ছে, রিসিভ করছ না। সুন্দর মতো এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাই দেবে। এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না জানালে আর যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দাও রাস্তাঘাটে তোমার বাবা, ভাই আর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ঘটনা হবে কিন্তু। আর যদি ছেলেদের পাঠানো লাগে তাহলে ৫০ লাখের এক টাকাও কম হবে না। যদি কিছু স্যাক্রিফাইস চাও তাহলে ভাইয়ের নম্বর নিয়ে কথা বলো। ভাইয়ের নম্বর ম্যানেজ করো না হলে আমাকে বলো আমি দিচ্ছি। এক ঘণ্টা পর আর ফোন করব না। ছেলেদেরকে বলব গুলি করতে। এবার যার গায়ে লাগুক, যেখানে লাগুক,’ মেসেজে বলা হয়।

আরেকটি ভয়েস মেসেজে বলা হয়, ‘আর যদি ছেলেদের পাঠানো লাগে, ঘটনা ঘটানো লাগে তাহলে ৫০ লাখের জায়গায় এক কোটি হবে। ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলো। না হলে কিন্তু শুরু হবে খেলা। তোমার বাবাকে বললাম না, সে হার্টের রোগী। তোমরা নিজেরা আলোচনা কর।’

এই ঘটনা জানতে শওকতকে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ভবনে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।

কে বা কারা এই হুমকি দিতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি হাসান মোস্তফা বলেন, ‘আগের বড় সাজ্জাদ গ্রুপের মতোই একই কায়দায় হুমকি এসেছে, ধরন একই। বিদেশি নম্বরের মতো মনে হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে চাই। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’

‘তাদের আমরা মামলা করতে বলেছি’, যোগ করেন তিনি।

ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলম দাবি করেছিলেন, বড় সাজ্জাদের গ্রুপের অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম শুটার রায়হান আলম।

এর আগে, গত ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে দুই দফা চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের মালিক মুজিবুর রহমানের বাড়িতেও হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। সেই ঘটনায়ও বড় সাজ্জাদের নাম আসে।

 

Related Articles

Latest Posts