দেশের হাজার হাজার শিল্পকারখানার খালি ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল বসাতে পারলে জাতীয় গ্রিডে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব বলে মনে করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে প্রায় ১৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অর্থায়নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলের নতুন এক মূল্যায়নে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইডকলের হিসাবে, দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যেতে পারে—এমন ১ হাজার ১৭১টি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে মোট ১ হাজার ২৬৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া আরও ৪ হাজার ৭১২টি কোম্পানি থেকে পাওয়া যেতে পারে প্রায় ২ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট।
১০ হাজারের বেশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এই সম্ভাবনার হিসাব করেছে ইডকল। এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় অংশই তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে।
ইডকলের গবেষণা বলছে, শুধু তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতেই ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এটি কাজে লাগাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা।
ইডকলের জরিপে ৯ হাজারের বেশি পোশাক, বস্ত্র ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬টি কোম্পানিকে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে ৮৭৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের বাইরে অন্যান্য শিল্পকারখানার ছাদ থেকেও আরও ৮০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি কোম্পানি এখনই প্রকল্প শুরু করতে প্রস্তুত। এসব কোম্পানিতে মোট ৩৮৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আগামী পাঁচ বছরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন অনেক বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে ইডকল। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ১২৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। ২০২৭ সালে এই পরিমাণ বেড়ে হবে ১৩৬ মেগাওয়াট। ২০২৮ সালে অর্থায়ন করা হবে ২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পে।
আর ২০২৯ ও ২০৩০ সালে প্রতি বছর প্রায় ২৩৩ মেগাওয়াট করে প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য বছরে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও বাড়বে।
২০২৬ সালে এ খাতে ৪৫০ কোটি টাকা অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে ইডকলের। পরে তা বাড়িয়ে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা করা হবে।
এখন পর্যন্ত ইডকল ৩৫২ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২৬৪ মেগাওয়াট ইতোমধ্যে উৎপাদনে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান মো. এনামুল করিম পাভেল।
দেশের বড় কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বড় পরিসরে ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়েছে। ইডকলের অর্থায়ন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হা-মীম গ্রুপ। গাজীপুরের তিনটি কারখানায় প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে।
এর ফলে ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে বলে জানান গ্রুপটির জ্বালানি বিভাগের প্রধান তানুল চক্রবর্তী। তিনি বলেন, সকালের শেষভাগ থেকে দুপুরের শুরুর দিক পর্যন্ত সৌর প্যানেলগুলোতে সবচেয়ে ভালো বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এতে হা-মীমের কার্বন নিঃসরণ কমেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতাও কমেছে।
আরেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ ইতোমধ্যে ৩৩ দশমিক ৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছে। এসব সৌর প্যানেল থেকে বছরে প্রায় ৪ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কোম্পানিটি এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ৫০ মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ওয়ালটনের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি শুধু বিদ্যুতের খরচ কমানোর জন্য নয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে এবং প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও কমবে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর কাজ দ্রুত বাড়াতে ইডকলের অর্থায়ন বড় ভূমিকা রাখছে। ইউসুফ আলী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে তাদের প্রতিষ্ঠানের কার্বন নিঃসরণও কমছে।
তাদের হিসাবে, সৌরবিদ্যুৎ থেকে বছরে প্রায় ১৯ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ এই উদ্যোগে একদিকে যেমন অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশেরও উপকার হচ্ছে।
তবে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে অর্থায়ন পাওয়া নিয়ে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিযোগও আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পোশাক কারখানার মালিক বলেন, কয়েক বছর আগে তার প্রতিষ্ঠান ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর জন্য ইডকলের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও অনেক কাগজপত্রের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা অর্থায়ন পায়নি।
সাধারণত কারখানাগুলোকে শুরুতে নিজেদের টাকা দিয়ে প্রকল্পের কাজ করতে হয়। পরে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে। ওই ব্যবসায়ী বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই কয়েক মাসের জন্য এত টাকা আটকে রাখা সম্ভব নয়।
তবে ইডকলের এনামুল এই প্রক্রিয়াকে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, ঋণ নেওয়া বা ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে যেসব সাধারণ কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, ইডকলও মূলত সেসব তথ্যই চায়।
তার ভাষ্য, অনেক গ্রাহক প্রথমবার ইডকলের সঙ্গে কাজ করেন। তাই শুরুতেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হয়।
তিনি বলেন, ইডকল সাধারণত খুব কম আবেদনই বাতিল করে। কোনো কোম্পানির কাগজপত্র দিতে আরও সময় প্রয়োজন হলে তাদের সেই সময়ও দেওয়া হয়।
ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য অপারেটিং খরচভিত্তিক বা ওপেক্স মডেলকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন তিনি। এই ব্যবস্থায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ভবনের মালিককে শুরুতে নিজের টাকা খরচ করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে হয় না।
একটি ওপেক্স প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কয়েকটি ছোট প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে সেগুলোকে একটি বড় প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে অর্থায়নের জন্য আবেদন করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রতিটি কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদা করে সব কাগজপত্র নেওয়ার বদলে ওপেক্স প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য নেয় ইডকল।
ইতোমধ্যে এই পদ্ধতিতে কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনও পেয়েছে। ইডকলের এনামুল বলেন, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পথ সহজ করতে পারে। কারণ এতে তাদের পুরো অর্থায়নের চাপ ও কাগজপত্রের ঝামেলা একা সামলাতে হয় না।
ইডকল যে সম্ভাবনার কথা বলছে, তা মোটামুটি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানাগুলোর ছাদে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ অবশ্যই আছে। কারখানাগুলোর ছাদে কতটা জায়গা আছে, ভবনগুলো কত পুরোনো এবং কোনো কোনো এলাকায় ধুলার দূষণ কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা করলেও এই সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তি পাওয়া যায়।
তার মতে, আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ইডকলের অর্থায়নের শর্ত তুলনামূলক সুবিধাজনক।
তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য এই প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। শিল্পকারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আরও বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন শুরু করলে এই প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
