ফোন চুরি বা হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে যা করা জরুরি

মোবাইল ফোন এখন আর শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যক্তিগত ছবি, অফিসের নথিসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই এখন একটি ফোনের ভেতরে থাকে।

তাই ফোন চুরি বা হারিয়ে গেলে প্রথম চিন্তা শুধু নতুন ফোন কেনার খরচ হওয়া উচিত নয়। বরং সবচেয়ে জরুরি হলো, ফোনের ভেতরে থাকা তথ্য ও আর্থিক অ্যাকাউন্টগুলো কত দ্রুত সুরক্ষিত করা যায়।

এ ক্ষেত্রে প্রথম ৩০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

প্রথমেই অন্য কারও ফোন থেকে নিজের নম্বরে কল দিন।

ফোনটি হয়তো চুরি হয়নি, কাছাকাছি কোথাও পড়ে গেছে। কোনো সৎ ব্যক্তি পেয়ে থাকলে ফোন ধরতে পারেন।

কিন্তু ফোনটি কোথায় আছে নিশ্চিত না হয়ে একা সেখানে ছুটে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে অবস্থান যদি অপরিচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা দেখায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

এরপর যত দ্রুত সম্ভব ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগলের ‘ফাইন্ড হাব’ ব্যবহার করে হারানো ফোন খোঁজা, লক করা এবং প্রয়োজনে দূর থেকে ডেটা মুছে ফেলা যায়।

অন্য ফোন বা কম্পিউটার থেকে নিজের গুগল অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করে ফাইন্ড হাবে গেলে ফোনটির বর্তমান অথবা সাম্প্রতিক অবস্থান দেখা যেতে পারে।

সেখান থেকে ফোনে শব্দ বাজানো এবং ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ (হারিয়ে গেছে বলে চিহ্নিত করা) ব্যবহার করে ডিভাইসটি লক করার সুযোগ আছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ফাইন্ড হাব চালু থাকলে ফোনের সাম্প্রতিক এনক্রিপ্টেড অবস্থানও কাজে লাগতে পারে, এবং সমর্থিত ডিভাইস অফলাইনে থাকলেও ফাইন্ড হাব নেটওয়ার্ক সেটি খুঁজতে সহায়তা করতে পারে।

ফোনে আগে থেকেই পিন, প্যাটার্ন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা থাকলে নিরাপত্তা আরও বাড়ে।

আইফোন হারিয়ে গেলে অন্য ডিভাইস থেকে আইক্লাউডের ‘ফাইন্ড ডিভাইসেস’ ব্যবহার করে সেটিকে ‘মার্ক অ্যাজ লস্ট’ করা যায়।

লস্ট মোড চালু করলে ফোনটি পাসকোড দিয়ে লক হয়ে যায়। ফলে অন্য কেউ ফোন হাতে পেলেও সহজে সেটিতে প্রবেশ করতে পারে না।

অ্যাপলের তথ্যমতে, আইক্লাউডের ফাইন্ড ডিভাইসেসে প্রবেশ করতে হারানো ফোনে পাঠানো যাচাইকরণ কোড-ও প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বস্ত আইফোনটিই চুরি হলেও দ্রুত লস্ট মোড চালু করার সুযোগ থাকে।

আইফোনে ‘স্টোলেন ডিভাইস প্রোটেকশন’ আগে থেকে চালু থাকলে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হয়। এই সুবিধা চালু থাকলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ফেস আইডি বা টাচ আইডি প্রয়োজন হতে পারে।

ফোন চুরির পর সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো সিম কার্ড সাময়িকভাবে ব্লক করা।

কারণ আপনার নম্বরে আসতে পারে ওটিপি, ব্যাংকের যাচাইকরণ কোড, পাসওয়ার্ড রিসেট কোড, বিভিন্ন অ্যাপের লগইন কোড এবং গুরুত্বপূর্ণ খুদে বার্তা।

চোর ফোন আনলক করতে না পারলেও যদি কোনোভাবে সিম অন্য ফোনে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে আপনার নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট দখলের চেষ্টা করতে পারে।

তাই অন্য নম্বর থেকে নিজের মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করে সিম ব্লক করার ব্যবস্থা নিন। পরে পরিচয় যাচাই করে একই নম্বরের নতুন সিম নেওয়া যাবে।

ফোনে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা কোনো ব্যাংকের অ্যাপ থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বিশেষ করে ফোনটি যদি আনলক অবস্থায় চুরি হয়, অথবা চোর আপনার পিন বা স্ক্রিন লক জানে—তাহলে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক।

নিজ নিজ ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিজস্ব হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে প্রয়োজন হলে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ব্লক বা সুরক্ষিত করুন।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোও পরীক্ষা করুন। সন্দেহজনক কোনো লেনদেন দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জানান।

স্মার্টফোনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর একটি হলো গুগল অ্যাকাউন্ট বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট।

কারণ এই একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই অনেক সময় ইমেইল, ছবি, ফোন নম্বরের তালিকা, ক্লাউড ব্যাকআপ এবং অন্য অনেক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট করা সম্ভব।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।

ফোনটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চললে সঙ্গে সঙ্গে মূল গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট থেকে ডিভাইসটি সরিয়ে ফেলবেন না।

বিশেষ করে আইফোনের ক্ষেত্রে অ্যাপল সরাসরি সতর্ক করেছে, ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে চুরি হওয়া ডিভাইস সরিয়ে দিলে ‘অ্যাক্টিভেশন লক’ উঠে যেতে পারে, এতে চোরের জন্য ফোনটি পুনরায় ব্যবহার বা বিক্রি করা সহজ হয়ে যেতে পারে।

বরং প্রথমে লস্ট মোড বা মার্ক অ্যাজ লস্ট চালু করুন।

এরপর অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংস পরীক্ষা করুন। অচেনা লগইন বা পরিবর্তন দেখতে পেলে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং অন্য অচেনা ডিভাইসের সেশন বন্ধ করুন।

ফোনের মধ্যে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল কিংবা অফিসের স্ল্যাক বা টিমস অ্যাকাউন্ট লগইন করা থাকতে পারে।

অন্য ডিভাইস থেকে এসব অ্যাকাউন্টে ঢুকে সক্রিয় সেশন পরীক্ষা করুন।

সন্দেহ থাকলে চুরি হওয়া ডিভাইস থেকে সেশন লগআউট করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

ইমেইল অ্যাকাউন্টকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ অধিকাংশ অনলাইন অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট লিংক ইমেইলেই আসে।

অর্থাৎ চোর ইমেইলে প্রবেশ করতে পারলে একে একে অন্যান্য অ্যাকাউন্টেও প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর থাকে। দুই সিমের ফোনে সাধারণত দুটি আইএমইআই থাকতে পারে।

আইএমইআই পাওয়া যেতে পারে ফোনের বাক্সে, ক্রয়ের রসিদে, গুগল ফাইন্ড হাবে অথবা আগে সংরক্ষণ করে রাখা তথ্য থেকে।

গুগলের ফাইন্ড হাব থেকেও হারানো অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের আইএমইআই দেখা যায়।

নিকটস্থ থানায় অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করার সময় আইএমইআই, ফোনের মডেল, রং, মোবাইল নম্বর এবং ঘটনার সময়-স্থান সঙ্গে রাখা ভালো।

অ্যান্ড্রয়েড এবং আইফোন—দুটিতেই দূর থেকে ফোনের ডেটা মুছে ফেলার ব্যবস্থা আছে।

কিন্তু এটি প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নয়।

প্রথমে ফোন খুঁজে বের করা ও লক করার চেষ্টা করুন। ফোন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম এবং ভেতরের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হলে দূর থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে।

অ্যান্ড্রয়েডের ক্ষেত্রে গুগল সতর্ক করেছে, দূর থেকে মুছে ফেলার পর ডিভাইসটির অবস্থান আর ফাইন্ড হাবে পাওয়া যাবে না।

আইফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। অ্যাপল জানিয়েছে, আইওএস ১৫ বা পরবর্তী সংস্করণের সমর্থিত ডিভাইস মুছে ফেলার পরও ফাইন্ড মাই দিয়ে অবস্থান শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে ডিভাইসটি ফাইন্ড মাই থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ তাতে অ্যাক্টিভেশন লক বন্ধ হয়ে যায়।

তাই ‘মুছে ফেলা’ এবং ‘অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা’—দুটি এক জিনিস নয়।

ফোন আনলক অবস্থায় চুরি হলে ঝুঁকি অনেক বেশি

চুরির সময় ফোনটি যদি লক করা থাকে এবং শক্তিশালী পিন বা বায়োমেট্রিক সুরক্ষা থাকে, তাহলে কিছুটা সময় পাওয়া যায়।

কিন্তু ফোনটি যদি ব্যবহার করার সময় হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আলাদা।

চোর তখন সরাসরি খুদে বার্তা পড়তে, ইমেইল খুলতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে এবং কিছু আর্থিক অ্যাপে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় সিম, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করার কাজগুলো আরও দ্রুত করতে হবে।

চোরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে নতুন প্রতারণার শিকার হবেন না

ফোন চুরির কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর আরেক ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

কেউ ফোন করে বলতে পারে, ‘আপনার ফোনটি পেয়েছি।’ তারপর ওটিপি, অ্যাপল আইডির পাসওয়ার্ড, গুগলের পাসওয়ার্ড কিংবা কোনো যাচাইকরণ কোড চাইতে পারে।

কখনো আবার খুদে বার্তা বা ইমেইলে ভুয়া ফাইন্ড মাই বা গুগল লগইন পাতার লিংক পাঠানো হয়। সেখানে লগইন করলে আপনার আসল পাসওয়ার্ড প্রতারকের কাছে চলে যেতে পারে।

তাই ফোন ফিরে পাওয়ার নাম করে কেউ ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড চাইলে কখনোই দেবেন না।

ফোন চুরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি রাখা বেশি কার্যকর।

প্রথমত, ফোনে শক্তিশালী পিন বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। শুধু সহজ প্যাটার্ন বা ১২৩৪ ধরনের পিন এড়িয়ে চলুন।

দ্বিতীয়ত, অ্যান্ড্রয়েডে ফাইন্ড হাব এবং আইফোনে ফাইন্ড মাই চালু রাখুন। গুগল নিজেও হারানোর আগেই অবস্থান ও ফাইন্ড হাব সক্রিয় আছে কি না পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (দুই স্তরের যাচাইকরণ) চালু করুন এবং ব্যাকআপ কোড নিরাপদ জায়গায় রাখুন।

চতুর্থত, ফোনের আইএমইআই নম্বর আলাদা জায়গায় লিখে রাখুন।

পঞ্চমত, গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির নিয়মিত ক্লাউড ব্যাকআপ রাখুন। তাহলে নিরাপত্তার স্বার্থে ফোন দূর থেকে মুছে ফেলতে হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারানোর ভয় কম থাকবে।

একটি স্মার্টফোন হারানোর ক্ষতি হয়তো কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু ফোনে থাকা ইমেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ও অফিসের নথি অন্য কারও হাতে গেলে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বড় হতে পারে।

তাই ফোন চুরির পর প্রথম কাজ নতুন ফোনের দাম নিয়ে চিন্তা করা নয়।

প্রথম কাজ হলো, চুরি হওয়া ফোনটিকে দ্রুত ডিজিটাল জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

কারণ আজকের দিনে চোর শুধু আপনার ফোনটি হাতে পায় না, সুযোগ পেলে আপনার পুরো ডিজিটাল পরিচয়ের দরজাটিও তার হাতে চলে যেতে পারে।

Related Articles

Latest Posts