মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পলাতক, কারাগারে নির্দোষ দিনমজুর

১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক রোহিঙ্গা নিজের পরিচয় গোপন করে এক বাংলাদেশির নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

এ মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গত ২৪ জুন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

পরে গ্রেপ্তার দিনমজুর সোনা মিয়া আদালতকে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন। আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে ৫ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়।

এতে বলা হয়, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় মো. রমজান। তিনি নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেসময় কারাগারে থাকা ব্যক্তি সোনা মিয়া ছিলেন না।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এ ঘটনায় করা মামলায় ‘সোনা মিয়াকে’ দ্বিতীয় আসামি করা হয়। সেখানে তার বাবার নাম মৃত নজির আহম্মদ ও ঠিকানা কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়া ও রামুর গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহমুদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা সঠিক কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। জামিনে মুক্তি পেলে আসামি পালিয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কায় তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়েছিল।

মানস বড়ুয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, গ্রেপ্তারের পর আসামির পরিচয় যাচাই করতে কক্সবাজার সদর থানায় বলা হয়েছিল। থানা থেকে জানানো হয়, দেওয়া পরিচয়টি সঠিক নয়। এমনকি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও গ্রেপ্তার ব্যক্তি তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেননি।

‘এ অবস্থায় অভিযোগপত্রে আমি উল্লেখ করেছিলাম, আসামির নাম ও ঠিকানা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করেছিলাম’, বলেন তিনি।

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়া পরিচয়ে থাকা রমজান জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তিনি আর আদালতে হাজির হননি।’

২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর আদালত এ মামলায় সোনা মিয়াসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেন।

পরে ২৪ জুন র‍্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠান। পরে তিনি আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি এ মামলার আসামি নন। তাকে কখনো ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং তিনি এ মামলায় কারাগারেও যাননি। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।

৫ জুলাই জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ জানায়, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি আসলে রমজান। সেসময় তার বয়স ছিল ২৫ বছর, আর সোনা মিয়ার বয়স ছিল ৩৪ বছর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান একটি ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় একটি রোহিঙ্গা শিবিরে একসঙ্গে থাকতেন। পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় একই কক্ষে থাকতেন তারা। এই পরিচয়ের সূত্রে রমজান সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদে থাকা তথ্য জানতে পারেন এবং তা ব্যবহার করে তার পরিচয় ধারণ করেন।

ওসি মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, এ মামলায় গ্রেপ্তার আরেক আসামি ও সোনা মিয়া দুজনেই পালিয়ে যাওয়া ওই ব্যক্তিকে রমজান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, রমজান কুতুপালংয়ে বসবাসকারী পুরোনো রোহিঙ্গা।

কারা কর্তৃপক্ষের রাখা দুই সময়ের নথিতেও অসঙ্গতি পেয়েছে পুলিশ।

২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নথিতে তাকে মৃত নজির আহম্মদের ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। নথিতে তার উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি এবং বয়স ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়। তার শনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে দুই গাল ও ডান হাতে ক্ষতচিহ্নের কথা উল্লেখ ছিল।

অন্যদিকে, গত ২৪ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার নথিতে বয়স ৩৪ বছর উল্লেখ করা হয়। তার বাবার নামও মৃত নজির আহম্মদ হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। নথিতে তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি উল্লেখ করা হয়েছে। শনাক্তকারী চিহ্ন হিসেবে তার ডান হাত, পেটের বাঁ পাশ ও পিঠের মাঝখানে তিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলা কারাগারে রাখা নথিতেও দেখা যায়, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ছবি, শনাক্তকারী চিহ্ন ও আঙুলের ছাপ সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার সঙ্গে মেলেনি।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান ডেইলি স্টারকে বলেন, তদন্তের শুরু থেকে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার গুরুতর গাফিলতি ছিল।

তিনি বলেন, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে যে জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করা হয়েছিল, তাতে কোনো ছবি ছিল না। সেটি যথাযথভাবে যাচাই করা পুলিশের দায়িত্ব ছিল।

আবদুল মান্নান আরও বলেন, আসামির দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে পরিচয় যাচাইও করেনি পুলিশ।

‘অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন সনদ যথাযথভাবে যাচাই না করে অভিযোগপত্র দেওয়ায় প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। আর নির্দোষ সোনা মিয়া কারাগারে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। এটি অত্যন্ত অমানবিক। ঘটনাটি তদন্ত করা উচিত’, বলেন তিনি।

আবদুল মান্নান বলেন, আদালত কিছু শর্তসাপেক্ষে সোনা মিয়াকে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। শুক্রবার সোনা মিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সোনা মিয়ার জামিনের কাগজপত্র পেয়েছি। যাচাই-বাছাই শেষে আগামীকাল শুক্রবার তিনি মুক্তি পেতে পারেন।

সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমার স্বামী একজন পরিশ্রমী মানুষ। তিনি কখনো কোনো অপরাধ করেননি এবং কখনো কারাগারেও যাননি। কুতুবদিয়া পাড়ায় থাকার সময় রমজান নামে এক রোহিঙ্গা ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। অথচ আজ রমজানের কথিত অপরাধের কারণে আমার স্বামী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়েছেন। আমি এই সমস্যার সমাধান চাই।

তিনি বলেন, আমার স্বামীর পৈতৃক বাড়ি মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদসহ পরিবারের সদস্যরা আশ্রয়ের জন্য মহেশখালী থেকে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়ায় চলে আসেন।

জান্নাতুল বলেন, কুতুবদিয়া পাড়ায় আমার স্বামী কাজ না পাওয়ায় তিন-চার বছর আগে আমরা চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকায় চলে যাই।

তিনি আরও বলেন, তদন্তের সময় পুলিশ কখনো আমাদের বাড়িতে আসেনি। তখন তারা যদি এসে আমাদের পরিবার ও পরিচয় যাচাই করত, তাহলে সেই সময়ই বিষয়টির সমাধান হতে পারত।

Related Articles

Latest Posts