এআই দৌড়ে টিকতে যে কৌশল হাতে নিয়েছে গুগল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে একসময় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিলেও আবারও পিছিয়ে পড়েছে গুগলের জেমিনাই। কোডিংসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে জেমিনাইয়ের সক্ষমতা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কম এবং নতুন ফ্ল্যাগশিপ মডেল প্রকাশের সময়ও অন্তত দুই মাস পিছিয়ে গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

মূলত এআই নিয়ে হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে ‘গুগল ডিপমাইন্ডের’ শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে গুগল। গুগল ডিপমাইন্ড হলো গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান।

গত নভেম্বরে গুগলের জেমিনাই মডেল অল্প সময়ের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গেলেও অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের নতুন ভার্সন আসার পর আবারও পিছিয়ে পড়ে। আগস্টে জেমিনাইয়ের নতুন ফ্ল্যাগশিপ সংস্করণ প্রকাশের কথা থাকলেও এই উদ্যোগটি অন্তত দুই মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় গুগল।

পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা যায়, কোডিংয়ের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জেমিনাইয়ের সক্ষমতা তখনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে।

গত নভেম্বরে জেমিনাই ৩ প্রকাশের মাধ্যমে গুগল এআই প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ব্যবধান কমালেও দ্রুত আবার পিছিয়ে পড়ে।

চারটি সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যার কারণেই গুগল আবার পিছিয়ে পড়েছে।

কম্পিউটিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং জেমিনাইয়ের বিভিন্ন প্রকল্পপ্রধানদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে কোডিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম নজর দেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে, গুগলের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। ছোটখাটো সিদ্ধান্তগুলোও অনেকের হাত ঘুরে আসে। যার ফলে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় নতুন ভার্সন প্রকাশে বরাবরই ধীরগতি দেখিয়েছে গুগলের জেমিনাই।

৫ আগস্ট গুগলের এআই গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘গুগল ডিপমাইন্ডের’ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ডেমিস হাসাবিসের জায়গায় তার সহকারী কোরে কাভুকচুওগলুকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

হাসাবিসকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা থেকে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

একই সময়ে জেমিনাইয়ের দুই মূল প্রযুক্তিগত সহনেতা পদত্যাগ করে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন।

গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ৬ আগস্ট টাউন হল কর্মীসভায় জানানো হয়, ডিপমাইন্ডের কিছু দলকে সরিয়ে গুগলের মূল করপোরেট কাঠামোর অধীনে নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ডিপমাইন্ডের স্বায়ত্তশাসন আরও কমে গেছে।

২০১৪ সালে লন্ডনভিত্তিক এই এআই গবেষণাগারটি কিনে নেওয়ার পর থেকেই গুগল ধীরে ধীরে এর স্বাধীনতা কমিয়ে আসছে। গুগল চায় এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের অন্যান্য পণ্যকে আরও উন্নত করতে এবং মুনাফা বাড়াতে।

হাসাবিসের নেতৃত্বে গুগল ডিপমাইন্ড প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বিস্তৃত পরিসরে এআই গবেষণা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জেমিনাই মডেল তৈরি করেছে, যা গুগলের ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ২০২৩ সালে জেমিনাই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর কিছুদিন পরই হাসাবিস ওই এআই প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থাপনা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসেন এবং তার সহযোগীদের হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

হাসাবিস এআই কীভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটাতে এবং সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে, সে বিষয়ে কাজ করেছেন ও বক্তব্য দিয়েছেন।

চেয়ারম্যান হিসেবে তার নতুন দায়িত্বের মূল বিষয় হবে এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।

২০২৫ সালে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই ডিপমাইন্ডের তৎকালীন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কোরে কাভুকচুওগলুকে বাড়তি দায়িত্ব দেন। তিনি তাকে গুগলের চিফ এআই আর্কিটেক্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

গুগলের বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে জেমিনাইকে যুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।

চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এরপরের কয়েক মাসে ডিপমাইন্ডের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তার প্রভাব কমতে থাকে এবং কাভুকচুওগলু জেমিনাইয়ের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

এবার কাভুকচুওগলুর কর্তৃত্বের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।

গত সপ্তাহে গুগলের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, এখন থেকে ডিপমাইন্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কাভুকচুওগলুর হাতেই থাকবে।

বছরের পর বছর মানুষকে বিনামূল্যে সার্চ ইঞ্জিন সেবা দিয়ে গেছে গুগল।

এখনো তাদের বেশিরভাগ পণ্যই সাধারণ ইউজাররা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন। এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে তোলা ও এর মুনাফা বাড়াতে কাভুকচুওগলুর মতো কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

ডিপমাইন্ডের দায়িত্ব পাওয়ার আগে থেকেই তিনি গুগলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে মনোযোগী একজন কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।

গুগলের এআই খাতে রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস গুগল ক্লাউড। ডিপমাইন্ডের পক্ষ থেকে তিনিই গুগল ক্লাউড বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

প্রযুক্তি জগতে কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনকে তেমন সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি। তবে এবার সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।

সের্গেই ব্রিন এআই বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের জেমিনাই মডেলের উন্নয়নে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অ্যানথ্রপিক তাদের শক্তিশালী ক্লড মিথোস মডেলের প্রিভিউ প্রকাশ করে প্রতিযোগীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে গত এপ্রিল মাসে শত শত কর্মীর উপস্থিতিতে টাউন হল বৈঠকে বক্তব্য দেন ব্রিন।

এ সময় গুগল ডিপমাইন্ডকে আরও দ্রুত কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

গুগলে ৫২ বছর বয়সী ব্রিনের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাহী পদ নেই। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি এআই মডেল প্রশিক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগে প্রভাব রাখছেন।

গত কয়েক মাস ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের বলে আসছেন, এআই প্রযুক্তির অগ্রভাগে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তাদের ব্যবধান কমাতে হবে।

গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্রিনের যে প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে তিনি রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্টের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের পরও সর্বস্তরের কর্মীদের ওই বৈঠকে ডিপমাইন্ডের স্বাধীন সত্তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সামনে আসে। কর্মীদের ধারণা, আগামীতে দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের জন্যও গুগলের করপোরেট অফিসের ওপর নির্ভর করতে হবে তাদের।

এ প্রসঙ্গে হাসাবিস ও কাভুকচুওগলু কর্মীদের জানান, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে না এমন বিভাগগুলোকে ডিপমাইন্ড থেকে সরিয়ে গুগলের করপোরেট কাঠামোর অধীনে নেওয়া হচ্ছে।

কাভুকচুওগলু ছাড়া জেমিনাইয়ের মূল প্রযুক্তিগত সহনেতা জেফ ডিন ও ওরিওল ভিনিয়ালসসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা গত সপ্তাহের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে গুগল ছেড়ে গেছেন।

এসব কর্মকর্তার অধীনে কাজ করা কর্মীদের জেমিনাই প্রশিক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—এমন গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা ছিল।

তাদের চলে যাওয়ার পর ওই দল ও প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুগল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পরিকল্পনা জানায়নি। এতে কেউ কেউ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন যে বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ডিপমাইন্ডের যে সুরক্ষা ছিল, তা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ আগামীতে স্বাধীন এআই গবেষণার বদলে ডিপমাইন্ডকে শুধু লাভজনক প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হতে পারে।

কাভুকচুওগলুর অন্যতম দায়িত্ব ছিল গুগলের বিভিন্ন পণ্যে জেমিনাইকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।

পিচাইসহ গুগলের শীর্ষ কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বলেছেন, ভিডিও তৈরির মতো কিছু ক্ষেত্রে তারা এআই প্রযুক্তির অগ্রভাগে রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়লেও অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরে ফেলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গুগলের ক্লাউড বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশা করছেন, কাভুকচুওগলুর নিয়োগের ফলে টেনসর প্রসেসিং ইউনিট বা টিপিইউ নামে পরিচিত সীমিত সরবরাহের এআই চিপ বণ্টন নিয়ে ডিপমাইন্ডের সঙ্গে বিদ্যমান টানাপোড়েন কমে আসবে।

এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে গুগল।

তবে গত মাসে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপকালে পিচাই বলেন, মডেল প্রশিক্ষণ এবং ভোক্তা ও ব্যবসায়িক পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় টিপিইউ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা কমাতে গুগল তার অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণ করে যাবে।

প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, গুগল কি এআই মডেলের প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাচ্ছে? তবে জেমিনাইয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স জানতে পেরেছে, অ্যালফাবেটের বাণিজ্যিকীকরণ কৌশল এবং গত সপ্তাহের নেতৃত্ব পুনর্গঠনের সঙ্গে এআই মডেলের প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অর্জনের প্রচেষ্টার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

গুগলের এই পুনর্গঠন এমন এক সময়ে হলো, যখন ব্রিন কর্মীদের আরও সক্রিয় ও উদ্যমী করে তুলতে কাজ করছেন।

২০২২ সালে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর গুগল যখন বড় ধাক্কা খেয়েছিল, তখনও একইভাবে কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

গুগলের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণেও তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতির প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ধীরগতিতে নতুন মডেল প্রকাশ করতে হয়েছে।

গুগলের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিপমাইন্ডের দৈনন্দিন কাজ আগের মতোই থাকবে। জেমিনাইয়ের দায়িত্বও কাভুকচুওগলুর কাছেই থাকবে।

তবে সামগ্রিক বার্তাটি স্পষ্ট—প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে গুগল আরও দ্রুত এগোতে চায়, জেমিনাইয়ের পেছনে আরও বেশি সম্পদ দিতে চায় এবং এআই গবেষণাকে কোম্পানির বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চায়।
 

Related Articles

Latest Posts