রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদ সদস্যরা ভোট দিচ্ছেন। ফল আগে থেকেই প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় এই নির্বাচনে কোনো টানটান উত্তেজনা নেই, বরং এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। উন্মুক্ত ভোটিং ব্যবস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি স্রেফ একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

ফখরুলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন অলি আহমদ, যিনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।

মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপির ২৪৭ জন এবং বিরোধী জোটের ৯০ জন। অবশিষ্ট সংসদ সদস্যরা অন্যান্য দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নির্বাচন কমিশন আজকের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

গতকাল নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা আশা করি এই ঐতিহাসিক নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সিইসি এই নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করছেন।

১৯৯১ সালের পর এটিই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে সংসদে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। সংসদ সদস্যরা স্বাক্ষরিত ব্যালট পেপারে তাদের পছন্দের প্রার্থী বাছাই করার আগে প্রত্যেক প্রার্থীর প্রস্তাবক ও সমর্থকদের নাম ঘোষণা করা হবে।

স্পিকারসহ প্রতিটি সংসদ সদস্যের একটি করে ভোট রয়েছে। ভোটের সংখ্যা সমান হলে লটারির মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে।

সিইসি জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফলাফল সন্ধ্যায় ঘোষণা করা হবে এবং এদিনই সরকারি গেজেট প্রকাশিত হবে।

সাবেক রাষ্ট্রপতিরা

বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সরকারের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি করা হয়, যা ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছিল। সে সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

তখন থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ণকালীন, ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে মোট ১৯ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবদুল হামিদ, যিনি এক দশক এই পদে ছিলেন।

বেশ কয়েকজন নেতা একাধিকবার পূর্ণকালীন বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন: শেখ মুজিবুর রহমান, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মোহাম্মদুল্লাহ, জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। তাদের মধ্যে সাত্তার, জিয়া এবং এরশাদ সরাসরি ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অন্যদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমদ, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরী, আবদুর রহমান বিশ্বাস, অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান এবং মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ভারপ্রাপ্ত বা পূর্ণকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ২৪ জুলাই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার এই মেয়াদ ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ মোহাম্মদুল্লাহ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যা ছিল দেশের প্রথম প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাহাবুদ্দিন আহমদ, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ ও মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সবাই পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন।

রাষ্ট্রপতির কার্যাবলী

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আলংকারিক। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন।

রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তার অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল, বিচারক, নির্বাচন কমিশনার, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান ও ভেঙে দেওয়া, সংসদের অধিবেশন না থাকলে অধ্যাদেশ জারি করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের শপথ পাঠ করান।

এর বাইরে রাষ্ট্রপতি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বা আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, উপাচার্যদের নিয়োগ দেন এবং সমাবর্তনে ডিগ্রি দেন।

Related Articles

Latest Posts