দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় অনেকটা আলংকারিক পদ হলেও সম্মান এবং আনুষ্ঠানিকতায় রাষ্ট্রপতির অবস্থান অনন্য, সবার উপরে। রাষ্ট্রীয় এবং সরকাররিভাবে যত কার্যক্রম সম্পন্ন হয় তার সবই হয় ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গবভনের দরবার হলে তার শপথ অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে।
নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বরণ করতে বিশাল প্রস্তুতি নেয় সরকার। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তত ২৫টি ধাপে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র সাত থেকে আট মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই অনুষ্ঠানটি আয়োজনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রায় মাস খানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। আর এতে সহযোগিতা করে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত দুজন অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের।
তাদের একজন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়, আপনারা টিভিতে দেখেন কত সহজ-সুন্দর অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে সরকারের কয়েকটি দপ্তরকে রাত-দিন কাজ করতে হয়।’
‘রাষ্ট্রের অন্য কোনো একক পদে শপথের এত বড় আঙ্গিকে অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় না। সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর শপথের পরপরই মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নেন। তাই রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানটি ইউনিক, যেখানে শুধু তিনিই শপথ নেন’, বলেন ওই অফিসার।
তবে এবার রাষ্ট্রপতির শপথের পরপরই মন্ত্রিসভার দু-একজন সদস্য শপথ নিতে পারেন বলে বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে।
শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই শপথ অনুষ্ঠানের তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি সার্বিক কার্যক্রমের দেখভালের দায়িত্বে থাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তবে জ্যেষ্ঠ একজন অফিসারকে প্রধান করে সাব কমিটি করে দেওয়া হয়। সেই কমিটি আমন্ত্রিতদের তালিকা, আমন্ত্রণপত্র ছাপা, অতিথিদের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেওয়ার, অতি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিরা আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন কি না, তা যাচাই করার মতো কাজগুলো সম্পন্ন করে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিদেশি দূতসহ সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ অফিসারদের হাতে হাতে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছাতে হয়।
শপথ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশ কোনটি— জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত ছিলেন এমন এক সাবেক সচিব জানান, ‘মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিদেশি অতিথি এবং সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়। তাদের প্রটোকল রক্ষা করে আমন্ত্রণ জানানো, অনুষ্ঠানস্থলে সুশৃঙ্খলভাবে বসানো এবং আপ্যায়ন ব্যবস্থার বিষয়টি সবচেয়ে জটিল কাজ।’
‘অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিপুল সংখ্যক আগ্রহীদের মধ্য থেকে কতজনকে দাওয়াত দেওয়া হবে তা নিয়ে ব্যাপক চাপে থাকতে হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের শীর্ষ নেতারা তাদের অনুসারীদের নিয়ে বঙ্গভবনে আসতে চান। এই বিষয়টা সামলানো অনেক কঠিন হয় যায়।’
আরেক অফিসার জানান, ‘আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার স্থান নির্ধারণ করা থাকলেও অনেকে সেটা মানতে চান না। বঙ্গভবনে উচ্চপর্যায়ের অফিসার ও রাজনীতিকরাই আমন্ত্রিত থাকেন, তারা সেই নিয়ম ঠিক মতো মানতে না চাইলে কিছু বলা যায় না, শপথের দিনে সেটাও বড় চ্যালেঞ্জ।’
বিদ্যমান আসন বিন্যাস অনুযায়ী, বর্তমানে বঙ্গভবনের দরবার হলে ৭০০ জনের মতো বসার ব্যবস্থা থাকলেও এবার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কার্ড ছাপানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বাড়তি লোকদের বসার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট অফিসাররা জানিয়েছেন, দরবার হলের ভেতরে চাপাপাপি করে ৮৫০ জনের বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদের জন্য বারান্দাসহ মাঠের প্যান্ডেলে এলইডি স্ক্রিন দেওয়া হবে, যেন সবাই শপথ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন।
শপথের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আমন্ত্রিত সবার জন্য আয়োজিত আপ্যায়নপর্ব শুরু হয়। দরবার হলের বারান্দা এবং মাঠে প্যান্ডেলে আমন্ত্রিত অতিথিরা আপ্যায়িত হন।
