ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের, প্রভাব পড়তে পারে চীনের ওপরও

নতুন করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিচ্ছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিলে শুধু ইরান নয়, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীনও প্রভাবিত হতে পারে। 

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এমনটা জানানো হয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এখন দুই দেশের মধ্যে সরাসরি লড়াই হচ্ছে না। তবে শান্তি আলোচনাও চলছে না।

এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান হুমকি দিয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো তেলবাহী জাহাজ এই সরু জলপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাতে হামলা চালানো হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ ঘোষণার কথা রয়েছে।

একই সঙ্গে চীনকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হবে।

বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সমুদ্রপথে যে তেল রপ্তানি করে, তার ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। তবে বেইজিং দুই পক্ষকেই কূটনৈতিক সমাধানের পথে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার নতুন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের প্রতিটি স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এ ধরনের ‘গৌণ নিষেধাজ্ঞার’ আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, ইরানকে যে কোনো ধরনের সহায়তা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশকে অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন এখন সংঘাতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

ইরান সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়। কিন্তু আমার মতে, তারা সঠিক চুক্তির জন্য এখনো প্রস্তুত নয়।’

ইরানের বন্দরগুলোতে দেশটির জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শত শত জাহাজে থাকা হাজার হাজার নাবিক সেখানে আটকা পড়েছেন।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। এর কোনোটিই বড় তেলবাহী জাহাজ ছিল না। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী কোনো জাহাজও ওই পথ দিয়ে যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, গত সাত দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা করেছে।

যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতিদিন ব্যবহৃত প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের একটি এই প্রণালি দিয়ে যেত।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতাও অনেক কমে গেছে।

তবে ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা রয়েছে। এসব ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দিতে পারে তেহরান। আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের ওপরও হামলা চালাতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এখনো সব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

এর মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা। আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইরানিদের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

২০২৫ সাল থেকে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের ইরানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো পরিষ্কার নয়।

যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ১৬৮ জন স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৭৫০ জনের বেশি সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ১৮ জন।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি শুক্রবার সামরিক জবাবের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের যে কোনো হুমকির জবাব দেওয়া হবে। সেই জবাব হবে ‘কঠোর, শাস্তিমূলক ও ধ্বংসাত্মক’।

তবে একই সময়ে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

ইরানের সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এখনই যুদ্ধ শেষ করা ভালো। কারণ এই মুহূর্তে ইরান শক্তিশালী অবস্থানে আছে। মর্যাদা নিয়েই যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব।

পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, বিশ্ব ইরানের বিজয় স্বীকার করছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে, এ কারণে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফও যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে চাপের কথা স্বীকার করেছেন।

বৃহস্পতিবার ইরান ও ইরাকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচকও কালিবাফ।

ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সামরিক শক্তি যতই থাকুক, মানুষ না খেয়ে থাকলে কোনো দেশ টিকে থাকতে পারে না।

তার মতে, অর্থের লেনদেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। এগুলো ছাড়া শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে একটি দেশ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

 

 

 

Related Articles

Latest Posts