সন্তান জন্মের পর থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর পেছনে প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা) সরকারি সহায়তা দেওয়ার নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সিঙ্গাপুর সরকার।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবারগুলোর সন্তান পালনের আর্থিক চাপ কমানো এবং শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করতে নতুন ‘এসজি চাইল্ড সাপোর্ট প্যাকেজ’ চালু করছে সরকার।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং ২৩ আগস্ট জাতীয় দিবসের সমাবেশে এই প্যাকেজ ঘোষণা করেন।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই সহায়তা প্যাকেজের মূল্য ৬২ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা)। এর সঙ্গে নবজাতকের জন্য বিদ্যমান ৫ হাজার ডলারের (প্রায় ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা) চিকিৎসা অনুদান এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বার্ষিক শিক্ষার অবদান যোগ করলে একটি শিশু ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ডলারের সরকারি সহায়তা পাবে।
বর্তমানে জন্মক্রম অনুযায়ী একটি শিশু ২৭ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার (২৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা থেকে ৫৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা) পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পায়। নতুন ব্যবস্থায় জন্মক্রমের পার্থক্য থাকবে না। সব শিশুই একই ধরনের সহায়তার আওতায় আসবে।
নতুন প্যাকেজে মূলত পাঁচ ধরনের সহায়তা থাকবে বলে জানিয়েছে স্ট্রেইট টাইমস।
এর মধ্যে রয়েছে ১০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারের (প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা) ‘বেবি গিফট’, ৩২ হাজার ডলারের (প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা) ‘চাইল্ড ক্রেডিট’, ৫ হাজার ডলারের (প্রায় ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা) চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকাউন্টের (সিডিএ) প্রথম ধাপের অনুদান, সরকারের পক্ষ থেকে আরও ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত সহায়তা এবং ১৭ বছর বয়সে পোস্ট-সেকেন্ডারি এডুকেশন অ্যাকাউন্টে (পিএসইএ) ১০ হাজার ডলার যোগ করা।
‘বেবি গিফট’ হিসেবে দেওয়া ১০ হাজার ডলার শিশুর জন্মের পর ১২ মাসের মধ্যে দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য, শিশুর জন্মের পর প্রথম দিকের বেশি খরচের সময়ে পরিবারগুলোকে সহায়তা করা।
অন্যদিকে, ‘চাইল্ড ক্রেডিটের’ মাধ্যমে একটি শিশু এক বছর বয়স থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি বছর ২ হাজার ডলার করে পাবে।
এই সহায়তা বর্তমান ‘লার্জ ফ্যামিলি লাইফএসজি ক্রেডিটের’ পরিবর্তে চালু হবে। বর্তমানে তৃতীয় ও পরবর্তী সন্তানদের জন্য ছয় বছর পর্যন্ত বছরে ১ হাজার ডলার করে সহায়তা দেওয়া হয়। নতুন ব্যবস্থায় এই অর্থ দ্বিগুণ হবে এবং সব শিশুই এর আওতায় আসবে।
দ্য স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুর সরকার মনে করছে, বর্তমান শিশু সহায়তা ব্যবস্থায় অনেকগুলো আলাদা প্রকল্প থাকায় বিষয়টি পরিবারগুলোর জন্য জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং বলেন, সরকার শুধু বিদ্যমান প্রকল্পে পরিবর্তন আনতে চায় না, বরং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পুরো পদ্ধতিতেই বড় পরিবর্তন আনতে চায়।
তার মতে, সন্তান লালন-পালনের পুরো সময়ে পরিবারকে সহায়তা দেওয়া দরকার। কারণ, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার ওপর।
তিনি বলেন, পরিবারকে শক্তিশালী করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে ৩ লাখ ৮০ হাজার পরিবারের ৬ লাখ ১০ হাজারের বেশি শিশু নতুন এই সহায়তা প্যাকেজের আওতায় আসবে।
২০২৬ সালে জন্ম নেওয়া শিশুরা যেমন এই সুবিধা পাবে, তেমনি বর্তমানে এক থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরাও বয়স অনুযায়ী সহায়তা পাবে।
বিদ্যমান সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর জন্য নতুন ব্যবস্থায় যাওয়ার আলাদা প্রক্রিয়াও রাখা হবে।
সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন ধরে কম জন্মহার একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ ও কর্মজীবনের চাপকে অনেক পরিবার বড় বাধা হিসেবে দেখছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন সময়ে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। নতুন প্যাকেজের মাধ্যমে সেই সহায়তাকে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি করা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য, শিশুদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমানো।
নতুন প্যাকেজে নগদ সহায়তার পাশাপাশি শিশুদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও বিকাশের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় শিশুর জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন ধাপে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে পরিবারগুলো শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারবে।
স্ট্রেইট টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুর সরকার এই উদ্যোগকে শুধু পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির অংশ হিসেবেও দেখছে।
নতুন এই প্যাকেজের মাধ্যমে সরকার বার্তা দিতে চাইছে, সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রয়েছে।
