দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। গত শনি-রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে ২০টিরও কম পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে পারাপার হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত জাহাজ চলাচলের তথ্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস’ সত্ত্বেও এই নৌপথে জাহাজ চলাচল নেই বললেই চলে। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়, যা সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ। এর প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া।
জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রোববার চারটি জাহাজ প্রণালিটি পার হয়েছে। শনিবার পার হয়েছে ১৩টি।
তবে কিছু জাহাজ প্রণালিটি পার হওয়ার সময় তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় সেগুলোকে ট্র্যাক করতে পারেনি কেপলার। ফলে জাহাজ চলাচলের প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার আশ্বাস পেলেও জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীদের কাছে হরমুজ দিয়ে চলাচলের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমান সময়ে ওই পথে জাহাজ চলাচলের জন্য যুদ্ধকালীন বিমার খরচও ব্যাপক বেড়েছে। ফলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিয়ে প্রণালিটি ব্যবহারে অনাগ্রহী।
শুক্রবার ১৬টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছিল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এদিন দুটি খালি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) বা অত্যন্ত উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন তেলবাহী জাহাজ ট্র্যাকিং ডিভাইস বন্ধ রেখে উপসাগরে প্রবেশ করে। এর একটি ইরাকের দিকে এবং অন্যটি বাহরাইনের দিকে যাচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনকারী একটি ভিএলসিসি হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যায়।
গত তিন দিনে আটটি উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসবাহী জাহাজ (ভেরি লার্জ গ্যাস ক্যারিয়ার) প্রণালিটি পার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে ছয়টি খালি অবস্থায় উপসাগরে প্রবেশ করে। অন্যগুলো ইরান থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে উপসাগর থেকে বের হয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২১ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সামগ্রিক জাহাজ চলাচল তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
হামলা অব্যাহত থাকায় অনেক জাহাজ প্রণালি পারাপারের পরিকল্পনা বাতিল করেছে অথবা প্রণালির উত্তরাঞ্চল দিয়ে বিকল্প পথে চলাচল করেছে।
স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত দিনের ওই সময়ে মোট ৮৯টি জাহাজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে বের হয়েছে এবং ১০৩টি জাহাজ উপসাগরে প্রবেশ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম রয়েছে। এআইএসে শনাক্ত হওয়া পারাপারের সংখ্যা সংঘাত শুরুর আগের স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কম এবং ২৪ থেকে ২৬ জুনের সর্বোচ্চ মাত্রার পর থেকে তা আরও কমছে।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট জাহাজ চলাচলের ৪৫ শতাংশই ট্যাংকার।
এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, তেলজাত পণ্য বা রাসায়নিক বহনকারী ট্যাংকার। আরও ২৪ শতাংশ ছিল এলপিজি বহনকারী জাহাজ।
৬ জুলাই থেকে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ২৩টি ঘটনা জানিয়েছে ইউকেএমটিও। এসব হামলায় বিভিন্ন জাহাজের ব্রিজ, ইঞ্জিনরুম ও কাঠামোগত অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রোববার বাব আল-মান্দেব প্রণালির বিকল্প পথ দিয়ে মোট ২৪টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। ওই পথে শনিবার ৩২টি এবং শুক্রবার ২২টি জাহাজ চলাচল করে।
তথ্যে দেখা গেছে, শনিবার দুটি ভিএলসিসি লোহিত সাগরে প্রবেশ করেছে।
এর একটি ইরাকের বসরা অঞ্চলের অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। অন্যটি খালি ছিল।
তবে হরমুজের বিকল্প পথগুলোও প্রণালিটির পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।
আইইএর হিসাবে, হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল অন্য পথে নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে যাওয়া প্রায় ২ কোটি ব্যারেল দৈনিক তেলের তুলনায় এই সক্ষমতা অনেক কম।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, এশিয়ায় এখন পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টে হালকা ও মাঝারি ধরনের জ্বালানির আমদানি সংঘাতের আগের গড়ের তুলনায় ২১ শতাংশ কমেছে। ফলে এশিয়ার বাজারে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
