বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অন্যদের দীর্ঘদিন বিনাবিচারে আটক রাখা বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
গতকাল রোববার নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পুলিশ দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে শত শত মানুষ কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই এখনো কারাগারে আছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাসিনা সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ থাকতে পারে। তবে আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের অনেকেই বয়স্ক এবং কেউ কেউ গুরুতর অসুস্থ। তারপরও তারা জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী কারাগারে মারা গেছেন। তাদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিল না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলেন, এক সরকারের পর আরেক সরকার শত শত বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কারাগারে আটকে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের কথা বলেছে। সেই সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তার উচিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘদিন ধরে এভাবে আটকে রাখা বন্ধ করা।
সংস্থাটি বলেছে, সরকার সংস্কারের বদলে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করছে। বর্তমান খসড়াটি যেভাবে আছে, সেভাবে আইনটি পাস হলে নতুন কমিশন বেআইনি বা অযৌক্তিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না।
যাদের কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, হাসিনা সরকারের সমর্থক সাবেক আইনপ্রণেতা, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে থাকা কর্মী, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকেরা।
এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ। কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যেসব মামলায় কোনো প্রমাণ পেশ করা হয়নি, সেসব মামলাতেও রাষ্ট্রপক্ষ বারবার জামিন বাতিলের আবেদন করেছে। নিম্ন আদালত ও জেলা আদালতগুলোও নিয়মিত জামিন নাকচ করেছে। আবার হাইকোর্ট জামিন দিলেও সরকার নতুন মামলা দিয়ে তা আটকে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচার শুরু হওয়ার আগে কিছু ক্ষেত্রে আটক রাখা বা শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ আছে। তবে এমন আটক রাখাটা হতে হবে ব্যতিক্রমী বিষয়, সাধারণ নিয়ম নয়। আর কাউকে আটক রাখার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বিচার শুরুর আগে কাউকে আটকে রাখার ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতার অধিকার, যতক্ষণ না অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতি এবং সবার সমান অধিকারের বিষয়গুলো মানতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠনটি বিচারক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারাগারে আটক প্রতিটি ব্যক্তির বিষয় আলাদাভাবে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। দেখতে হবে, তাদের আটক রাখা আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় কি না। যারা আটক আছেন, তাদের দ্রুত বিচার করতে হবে অথবা মুক্তি দিতে হবে।
এলাইন পিয়ারসন বলেন, যে বিচার ব্যবস্থা কোনো বিচারিক অভিযোগ ছাড়াই বয়স্ক মানুষকে কারা হেফাজতে মারা যেতে দেয়, সেই ব্যবস্থা বিচার-পূর্ব আটককে যে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে রাখার কথা, তা মানছে না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের আমলে কারাগারে হওয়া সব মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া এবং কোনো অভিযোগ ছাড়াই মানুষকে দীর্ঘদিন অযৌক্তিকভাবে আটকে রাখা বন্ধ করা।
