নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা আর ভূমিধসে দেড় শতাধিক প্রাণহানির সঙ্গে এখনো প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
গতকাল বুধবারের এই দুর্যোগে ওই এলাকা তছনছ হয়ে গেছে। দুর্গম হলেও এলাকাটি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল।
নেপালের পুলিশ, এখন পর্যন্ত অন্তত ২৭০ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। এ ছাড়া নিখোঁজ আছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে বড় অংশই বিদেশি পর্যটক।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। সিসিটিভি জানায়, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জনই বিদেশি নাগরিক। এখন পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিপর্যয়টি কোথায় হয়েছে?
এই বিপর্যয় নেপাল-তিব্বত পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে নেপালের রাসুয়া জেলায় সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলাটি তিব্বত সীমান্তঘেঁষা।
শুরুতে হিমবাহে ধসের পর লেন্দে খোলা নদীতে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এরপর এই পানি ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। খবরে বলা হয়, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর একটি পয়েন্টে পানির স্তর ৯ মিটার বেড়ে যায়।
রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাপরু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভাটির দিকে বন্যার পানি নেপালের নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার কিছু অংশে পৌঁছে যায়, যার ফলে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সীমান্তের ওপারে তিব্বতের কিছু অংশও এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তিব্বত-নেপালের গিরং স্থলবন্দরে কাদা-মাটির স্রোত আছড়ে পড়ে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কেন এই বন্যা
মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) শুরুতে নেপালের কাঠমান্ডু থেকে ৬৬ কিলোমিটার উত্তরে একটি ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের খবর দিয়েছিল। কিন্তু পরে তারা জানায়, আসলে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। যা ঘটেছিল তা হলো একটি ‘হিমবাহ ধস’।
এদিকে কাঠমান্ডুভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা আইসিআইএমওডি এবং নেপাল ও চীনের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞানীরা তদন্ত করে দেখছেন, কোনো উচ্চভূমি থেকে শুরু হওয়া বরফ ও পাথরের ধস এই বন্যার কারণ কি না।
হিমালয় পর্বতমালা দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশজুড়ে বিস্তৃত, যেখানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এবং বিশাল সব হিমবাহ রয়েছে।
হিমালয়ের খাড়া পাহাড় ও নিচের ঘন বসতিপূর্ণ এলাকাগুলো বন্যা ও ভূমিধসের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, ফলে বর্ষার সময় অতিবৃষ্টি এবং হিমবাহ গলে যাওয়ার মতো ঘটনা এখন আরও ঘনঘন ঘটছে।
এই পানি কতদূর গড়াতে পারে?
ত্রিশুলী হলো নেপালের গণ্ডকী অববাহিকার একটি নদী। এই অববাহিকায় দেবঘাটের দক্ষিণে যেখানে কালী গণ্ডকী এবং ত্রিশূলী মিলিত হয়েছে, সেখানে নদীটিকে সপ্ত গণ্ডকী বা নারায়ণী বলা হয়।
এই নারায়ণী নদীই বিহারের বাল্মীকি নগরের কাছে ‘গণ্ডক’ নামে ভারতে প্রবেশ করেছে। আর এই গণ্ডক নদী রাজ্যটির হাজিপুর ও সোনপুরের কাছে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
নেপাল থেকে ভাটির দিকে প্রবাহিত নদীগুলোতে পানির স্তর বৃদ্ধির আশঙ্কায় ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশ কর্তৃপক্ষ নজরদারি জোরদার করেছে।
বিহারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ সতর্ক করেছে যে গণ্ডক নদীতে তিন মিটার পর্যন্ত উচ্চতার বন্যার ঢেউ প্রবেশ পারে এবং নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোর কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিহারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছে, নেপালে হঠাৎ বন্যা হওয়ায় গণ্ডক নদীতে যেকোনো সময় অনেক বেশি পানি চলে আসতে পারে। তাই তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে।
নেপাল থেকে আসা পানির স্রোত ভারতে ঢুকলে শুরুতে পড়বে পশ্চিম চম্পারণ জেলা। এ ছাড়া পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সরণ, মুজাফফরপুর ও বৈশালী জেলাকেও বাড়তি সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
বিহারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সন্তোষ কুমার জানিয়েছেন, বন্যার যেকোনো ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের পুরো টিম পুরোপুরি প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থায় আছে।
বেতিয়া, গোপালগঞ্জ ও মুজাফফরপুরে উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া রাজ্য উদ্ধারকারী দলও বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে আগে থেকেই মোতায়েন আছে।
এদিকে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকারও মহারাজগঞ্জ ও কুশিনগর জেলাকে সতর্ক করেছে। এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নেপালে ভয়াবহ বন্যার কারণে উত্তরপ্রদেশের সীমান্তবর্তী মহারাজগঞ্জ ও কুশিনগর জেলায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
