নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৩৫০ জন নিহত ও শত শত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নদীর ওপর থাকা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ধ্বংস হয়েছে। এখন পর্যন্ত রাসুয়াসহ নুওয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, তানাহুন, গোরখা ও নাওয়ালপারাসি ইস্টে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকস্মিক বন্যার কারণ জানতে বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এখনো কাজ করছেন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের বড় একটি ধস নদীর প্রবাহ আটকে সাময়িক একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করেছিল। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে রাসুয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় ভোতেকোশি নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আতঙ্কিত মানুষ তখন নিরাপদ জায়গায় ছুটে যেতে থাকেন।
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে বন্যা হয়েছে। তুষারধসের সম্ভাবনাও সামনে এসেছিল। তবে দিনের বেশির ভাগ সময় বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বন্যার শুরু রাসুয়াগাধি এলাকায় হলেও পরে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের নদীতীরবর্তী এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে।
রাসুয়া ও ধাদিংয়ের মধ্যবর্তী এলাকায় একাধিক সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যায়।
নুওয়াকোটের সহকারী প্রধান জেলা কর্মকর্তা কৃষ্ণ প্রসাদ হুমাগাইন কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, মানুষের স্মৃতিতে ওই এলাকায় এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।
স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফ ও পাথরের বিশাল একটি ধস নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল বলে মনে হচ্ছে। এতে সাময়িক একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল গোসাইনকুণ্ডের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
তবে এই ভূমিকম্পের কারণে তুষারধস হয়েছিল কি না, কিংবা তুষারধসে ভূমিকম্পের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
নেপালি টাইমসে সাংবাদিক কুন্দা দীক্ষিত লিখেছেন, ৭ হাজার ২৪৫ মিটার উচ্চতার লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে একটি তুষারধস হয়েছিল।
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সঙ্গেও এই পর্বতের নাম জড়িয়ে আছে। ওই সময় পর্বতের দক্ষিণ ঢালে তুষারধসে লাংটাং গ্রাম চাপা পড়ে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হন।
দীক্ষিত বলেন, লাংটাং লিরুং পুরোপুরি নেপালের ভেতরে অবস্থিত। সেখানকার তুষারধসের ধ্বংসাবশেষ নেপাল-চীন সীমান্তের লেহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। বর্ষার পানিতে সেখানে একটি সাময়িক হ্রদ তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে কাদা ও পাথরভর্তি প্রবল স্রোত ভোতেকোশি নদীর দিকে নেমে আসে।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক ও অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়স্থও মনে করছেন, তুষারধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। তবে একই সময়ে ভূমিকম্প হওয়ায় সেটি তুষারধসের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
এই অঞ্চল আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, তা আগে থেকেই জানা ছিল।
গত বছরের ৮ জুলাই ভোতেকোশি নদীতে একই ধরনের আকস্মিক পানির স্রোত দেখা গিয়েছিল। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ তখন জানিয়েছিল, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লেহেন্দে নদীতে একটি হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়ায় ওই বন্যা হয়েছিল।
সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করেও দেখা যায়, একটি হিমবাহের হ্রদ ভেঙে পানি নিচের দিকে নেমেছিল।
বিজ্ঞানীরা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের বিপজ্জনক হিমবাহের হ্রদগুলো নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তবে বুধবারের ঘটনার স্থানে বরফ ও পাথরের তুষারধস হতে পারে, এমন নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস ছিল না।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিমড এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির এক গবেষণায় নেপাল, ভারত ও তিব্বতে ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহের হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক এবং হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসবের ২১টি নেপালে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটিও বরফ ও পাথরের তুষারধসকে বন্যার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে আইসিমডের বিজ্ঞানীরা রাসুয়াগাধি সীমান্ত পারাপারের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি বড় তুষারধসের চিহ্ন পেয়েছেন। ধসের ধ্বংসাবশেষ লেহেন্দে নদীতে পড়ে কাদা ও পাথরভর্তি বন্যার সৃষ্টি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইসিমড এখন খতিয়ে দেখছে, নদীর কোনো সরু অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে পানি আটকে ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ বা ভূমিধসের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়েছিল কি না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আক্রান্ত এলাকা থেকে পাওয়া ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীতে পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। লেন্দে ভোতেকোশির একটি উপনদী।
বন্যার গতি ও শক্তিও ছিল অস্বাভাবিক। আইসিমডের তথ্য অনুযায়ী, গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই সময়ে মালেখুতে পানির উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার বাড়ে।
আইসিমডের রিমোট সেন্সিং ও জিওইনফরমেশন সহযোগী সারথক শ্রেষ্ঠ বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নেপালের অংশে হওয়া একটি তুষারধসই বন্যার প্রধান কারণ বলে মনে হচ্ছে।
ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করতে আইসিমড চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করছে। এর মধ্যে চীনা বিজ্ঞান একাডেমির অধীন চেংদু ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিও রয়েছে।
শ্রেষ্ঠ বলেন, স্যাফ্রুবেশীর ওপরে একটি তুষারধস নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ার পর বন্যা শুরু হয়েছিল বলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করছে। তবে পুরো চিত্র স্পষ্ট করতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক পর্যালোচনাতেও তুষারধসটি নেপালের অংশে ঘটেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আইসিমডের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের অংশে এত বড় বন্যা সৃষ্টির মতো কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা চীনের পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় ধরা পড়েনি।
বিজ্ঞানীরা এখনো নতুন করে বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং বুধবার বিকেলে জানিয়েছিলেন, লেন্দে নদীর প্রবাহ তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বৃহস্পতিবার অধ্যাপক কায়স্থ বলেন, শুরুতে আশঙ্কা করা হয়েছিল, উজানে আবার বড় কোনো জলাধার বা হ্রদ তৈরি হয়েছে কি না। তবে এমন হ্রদ তৈরি হয়েছে, তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আইসিমডি জানিয়েছে, মেঘের কারণে ওই এলাকার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কায়স্থ বলেন, ঝুঁকি এখনো রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহ গলে যাওয়ার পাশাপাশি বরফ ও পাথর ভেঙে তুষারধসের সম্ভাবনাও বাড়ে। তবে পরবর্তী ঘটনা ঠিক কোথায় ঘটবে, তা বলা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীরা এ কারণে হিমবাহের হ্রদ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন।
এর মধ্যেই বন্যাকবলিত এলাকার ভাটিতে আরও একটি সম্ভাব্য বিপদের কথা জানিয়েছে চীন।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের ছোচেন নদী ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় ব্যারেজ লেক বা প্রতিবন্ধক হ্রদ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। পানি হ্রদটি থেকে বের হতেও শুরু করেছিল বলে গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে ঢুকতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য বাঁধভাঙা বন্যার পরিণতি বুঝতে তারা বন্যার সিমুলেশনও চালাচ্ছে। একইসঙ্গে জরুরি সহায়তা ও উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
ফলে একটি ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলানোর মধ্যেই নতুন এই প্রতিবন্ধক হ্রদ নিয়ে আরেক দফা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
