নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে ১৭ বছর বয়সী স্মৃতি ওঝা বুধবার সকালে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ মাটিতে কম্পন অনুভব করে প্রথমে ভেবেছিল ভূমিকম্প।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের কথা তার মনে আছে। সেই ভূমিকম্পে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। এরপর থেকে ভাড়া বাসায় থাকে তারা। দ্রুত বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। চোখে পড়ে বিশাল বিশাল ঢেউ।
Hundreds of people are missing, including dozens of Americans, after a massive flood wiped out entire communities at the Nepal-Tibet border.
Read more: https://t.co/a3YSsIedDO pic.twitter.com/moyAEAxIZm
— ABC News (@ABC) August 27, 2026
সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘দেরি হওয়ার আগেই বাড়ির সবাই বের হয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু কিছুই বাঁচাতে পারিনি আমরা।’
ডান পা কেটে যাওয়ার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন স্মৃতি ওঝা। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল ভয়াবহ। চোখের সামনে সবকিছু ভেসে যেতে দেখেছি—এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।’
ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে আছেন। তবে তার চার আত্মীয় এখনো নিখোঁজ।
আজ বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত সাড়ে ৩০০ মানুষ মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও এক হাজারের বেশি মানুষ।
কোনো কোনো স্থানে পুরো জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যারা বেঁচে গেছেন, তাদের মনে সবচেয়ে বেশি গেঁথে আছে পানির স্রোতের ভয়াবহ শক্তি ও গতি।
তারা জানিয়েছেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কীভাবে পাথর, বালু আর ঘন কাদার প্রবল স্রোত সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নদীতীরবর্তী রাসুয়ার স্যাপরুবেশী এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়িতে দায়িত্বরত ছিলেন ৪১ বছর বয়সী রাজন খাত্রি।
বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিটের দিকে এক বন্ধু তাকে ফোন করে সতর্ক করেন। জানান, ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার স্রোত নদী ধরে নিচের দিকে আসছে।
কিন্তু রাজন ও তার সহকর্মীদের কিছু করার মতো সময় ছিল না। ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে পুলিশ ফাঁড়িতে।
স্রোতের ধাক্কায় ভবন থেকে ছিটকে পড়েন রাজন এবং জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরলে চারদিকে তাকিয়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান রাজন।
বৃহস্পতিবার সকালে তাকে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পানির প্রবল ধাক্কায় বুকে আঘাত পেয়েছেন তিনি।
Deadly flash floods leave a trail of destruction in Nepal.
Buildings and vehicles lay buried in mud after a massive flood and landslide disaster on the Nepal-Tibet border. The floods have killed at least 165 people and left more than 1,000 people missing pic.twitter.com/0AOfnUwGVj
— AFP News Agency (@AFP) August 27, 2026
নিউইয়র্ক টাইমসকে রাজন বলেন, ‘একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে ছিলাম আমি। ঢেউ আঘাত হানতেই ছিটকে বাইরে চলে যাই। কিন্তু আমরা সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা বের হতে পারেননি, সম্ভবত ভেসে গেছেন।’
রাজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই পুলিশ ফাঁড়িতে ঘটনার সময় ৭ জন কর্মরত ছিলেন। এখন পর্যন্ত রাজনসহ ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি চারজন বেঁচে আছেন কি না, তা জানা যায়নি।
রাজন আরও বলেন, ‘ঢেউগুলো কতটা বড় ছিল, তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উঁচু ভবনগুলো ঢেউয়ের নিচে তলিয়ে গেল।’
‘এই ঢেউয়ে শুধু পানি ছিল না। এর সঙ্গে ছিল বড় বড় পাথর, বালু আর ঘন কাদা,’ বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, অন্তত ১০০ বাড়ি বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে। ধ্বংস হয়েছে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কার্যালয়, স্কুল ও সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা।
কাঠমান্ডু পোস্টের সাংবাদিক অর্জুন পোরেল বুধবার সকালে কাঠমান্ডুর কান্তিপুর পাবলিকেশনস কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার স্ত্রী ফোন করে ত্রিশূলীতে বন্যার কথা জানালেও খুব একটা পাত্তা দেননি তিনি।
তারপরও স্ত্রীর কথা যাচাই করতে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট খুলে শিরোনাম দেখে ভয় পেয়ে যান অর্জুন। সোলে বাজারের সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনকে ফোন করেন তিনি।
ফোন ধরে নিরঞ্জন বলেন, ‘কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। মা-বাবা, চাচা, চাচি—কারো ফোনই বাজছে না।’
অফিসের পথে যেতে যেতে গ্রামের যত পরিচিত মানুষ ছিল সবাইকে ফোন করলেন অর্জুন। অধিকাংশই বন্ধ পেয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টে আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয় তার এই অভিজ্ঞতার কথা। ভিডিওর খণ্ডচিত্র এবং ফোনকলে তার গ্রাম সোলের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভেসে যায় তার শৈশব।
Devastating scenes from Betrawati Bazaar show homes and businesses being swept away as the powerful flash flood surged downstream from Rasuwa. Betrawati is reported to be among the worst-hit areas of Nuwakot district in central Nepal.
Video Courtesy: Nuwakot Express. pic.twitter.com/aasyc5dPPn
— Everest Today (@EverestToday) August 26, 2026
তিনি আরও লিখেছেন, কীভাবে এক এক করে নীরব হয়ে যায় ফোনগুলো।
অর্জুন লিখেছেন, ‘সোলে আমার গ্রাম। এই গ্রামের অলিগলিতে খেলেছি, মাঠে কাজ করেছি, বছরের পর বছর প্রতিদিন এই রাস্তা ধরে স্কুলে গিয়েছি। তাই এখানে কিছু ঘটলে আমি জানতাম—এমনটাই মনে হচ্ছিল।’
এক বড় ভাইয়ের স্ত্রী ফোন তার ধরে বলেন, ‘গ্রামে আর কিছুই নেই।’
অর্জুন লিখেছেন, ‘নদীর তলদেশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে সোলে বাজার। শত শত বছরেও সেখানে কখনো বন্যা পৌঁছায়নি। ৪৪ বছর বয়সে জীবনে আমি একবারও বন্যা হতে দেখিনি।’
ধীরে ধীরে অর্জুনের ফোনে ভিডিও আর ছবি আসতে শুরু করল। সেগুলো দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না অর্জুন। আবার ফোন করা শুরু করলেন তিনি।
প্রতিটি ফোনকলে পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ বর্ণনা পাচ্ছিলেন অর্জুন।
স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমি আমার নিজের পরিবারের কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না, ভাই। বেত্রাবতীর ৯০ শতাংশ বাড়ি নেই। আমার পাশে দুইজন ছেলে পা ভেঙে পড়ে আছে।’
অর্জুন লিখেছেন, ‘শুধু একটি বাজার নয়, হারিয়ে গেল একটি জনপদ। বেত্রাবতী শুধু একটি বাজার ছিল না। নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে যুদ্ধের পর এখানেই একসময় শান্তিচুক্তি হয়েছিল। এখানে রয়েছে উত্তর গঙ্গাধাম। এই পবিত্র স্থানে প্রতি বছর হাজারো মানুষ আসে। মন্দির, শান্তিচুক্তির সেই স্থান, তীর্থস্থান—সব এখন ধ্বংসস্তূপ।’
অর্জুন আরও লিখেছেন, ‘বন্যা শুধু গ্রামটিকে নেয়নি। রাসুয়া জেলা সদর দপ্তরে যাওয়ার সড়কটিও নিয়ে গেছে। আর সেই সড়কের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগের পথও শেষ। ত্রিশূলী নদীর ওপরে কোনো সেতু নেই। পুরো রাসুয়া জেলা এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।’
গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয়েছে অর্জুনকে।
তার মতে, এমন সবুজ একটি গ্রামকে কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেনি কেউ।
বারবার নিজেকে একটি প্রশ্ন করেন অর্জুন, ‘আমার গ্রামকে আবার কবে চেনা গ্রামের মতো দেখতে পাব?’
এর কোনো উত্তর কারো কাছে নেই।
