পেছন থেকে ধেয়ে আসছিল বন্যার ঢল। সামনে দৌড়াচ্ছিল আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। প্রাণ বাঁচাতে আর কোনোকিছু না ভেবে সে জঙ্গলের একটি গাছে উঠে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশ ভেসে যায়। ঘটনাটি নেপালের রাসুয়া অঞ্চলের।
একদিন পর বৃহস্পতিবার শিশুটিকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার একটি পা ভাঙা ছিল এবং মুখেও সে আঘাত পেয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা জানত না জোয়াল বেঁচে আছে কি না।
তার মা মাতি মায়া তামাং রয়টার্সের এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে ছেলের খোঁজ পান। অবশেষে মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে শিশু জোয়ালের।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই শিশুর মা বলেন, ‘আমি চার চারটি জায়গায় খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও সন্তানদের নাম ছিল না। তখন ধরে নিয়েছিলাম যে আমার দুই ছেলেই আর বেঁচে নেই। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। আমি নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।’
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, কাঠমান্ডুর উত্তরে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা মিলিয়ে অন্তত ১৭ হাজার শিশুর ওপর বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাব পড়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, তারা নেপাল সরকারের সাথে মিলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শিশুদের শনাক্ত করা, তালিকাভুক্ত করা এবং তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছে।
যেভাবে ছেলের খোঁজ পেলেন মা
বন্যা ও পাহাড়ধসে নেপাল ও তিব্বতে এখন পর্যন্ত ৫৮৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আজ শনিবার পর্যন্ত নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই হাজারে।
এই দুর্যোগের পর অনেক খোঁজাখুঁজির পর কোনো হদিস না পেয়ে বৃহস্পতিবার তামাং রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বজ্রাচর্যের ফোন নম্বর জোগাড় করেন। সাহানা এর কয়েক ঘণ্টা আগেই পার্শ্ববর্তী নুয়াকোট জেলার একটি ছোট হাসপাতালে জোয়াল ঘালের দেখা পেয়েছিলেন।
অজ্ঞাতপরিচয় একটি শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের কোনো খোঁজ জানে না—এমন খবর শুনেই সাহানা ও রয়টার্সের একটি দল সেখানে গিয়েছিল।
উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে পাঠানোর আগে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেন সাহানা। শিশুটি ভিডিও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে রাজি হয় এই আশায় যে এর মাধ্যমে হয়তো তার পরিবারের সন্ধান মিলবে। সাহানা হাসপাতালে নিজের নম্বর রেখে এসেছিলেন এবং কয়েক ঘণ্টা পর তামাং তাকে ফোন করেন।
সাহানা তাকে জানান, জোয়াল বেঁচে আছে এবং তাকে কাঠমান্ডুতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তামাংয়ের কাছে অনেকটাই তা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল।
তামাং বলেন, ‘আপনি যখন বললেন, জোয়াল কোথায় আছে তা জানেন, তখন সেটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। আমি ওদের ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।’
তামাং এরইমধ্যে তার ছোট ছেলেকেও জীবিত খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বড় ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর আমার মনে হলো আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।’
অচেনা এক দৃশ্যপট
বুধবার সকালে ছেলেরা স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে চলে গিয়েছিল। আর তামাং বাড়িতে বসে কাপড় বুনছিলেন। এমন সময় হঠাৎ তিনি এক বিকট শব্দ শুনতে পেলেন।
এদিন লাংতাং লিরুং পর্বতচূড়ার কাছের হিমবাহের নিচের অংশটি ধসে উপত্যকার নিচে আছড়ে পড়ে ভূমিধস ও বন্যার সৃষ্টি করে। তামাং বলেন, ‘আমি দেখছিলাম চোখের সামনে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, সন্তানেরাও বুঝি ভেসে যাচ্ছে।’
তিনি সন্তানদের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গাড়ি চালিয়ে স্কুলে যেতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগে। কিন্তু তিনি জানান, চারপাশের পরিবেশ এতটাই বদলে গিয়েছিল যে চেনার কোনো উপায় ছিল না। স্কুল ভবনটিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘স্কুল কোথায় ছিল, বাজারই বা কোথায় ছিল, তা বোঝার উপায় ছিল না। চারপাশে শুধু পানি, পাথর আর কাদা।’
মুঠোয় ছিল ২০ রুপি
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে যখন রয়টার্সের প্রতিনিধিরা নুয়াকোটের ১৫ শয্যার চক্র দেব হাসপাতালে জোয়াল ঘালের দেখা পান, তখন সেখানে কেউ জানত না তার পরিবার কোথায়।
ছেলেটির ডান পা ভেঙে গিয়েছিল এবং মুখে আঁচড় ও শরীরে কালশিটে ছিল। তবে তার বাঁ হাত ১০ রুপির দুটি নোট শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছিল। কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা তাকে হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর জন্য এই দুটি নোট দিয়েছিলেন।
সে জানায়, যখন বন্যা আঘাত হানে তখন সে স্কুলে পড়ছিল। সেই মুহূর্তের স্মৃতি হাতড়ে সে বলে, হঠাৎ করে চারপাশ ‘একেবারে কুচকুচে কালো’ হয়ে গিয়েছিল। সে তার এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে জঙ্গলে চলে যায় এবং প্রাণ বাঁচাতে গাছে চড়ে।
ভয় পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে সে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, ‘না।’
ছেলের সঙ্গে মায়ের দেখা
শুক্রবার অবশেষে তামাং কাঠমান্ডুর সেই হাসপাতালে পৌঁছান যেখানে তার ছেলেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তাদের বাড়ি থেকে সেখানে পৌঁছাতে গাড়ি চালিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তামাংয়ের জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সাহানা বজ্রাচার্য।
অবশেষে মা হাসপাতালে তার ছেলের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তামাং জানান, ঘালের বাবা জাপানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন, তিনিও পথে আছেন।
বুধবারের বন্যা রাসুয়া অঞ্চলের জনজীবন তছনছ করে দিয়েছে। তবে তামাংয়ের কাছে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ও সবসময়ই খুব দুষ্টু। হাড় ভাঙা ওর জন্য এই প্রথম নয়।’
