ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের মো. মনিরুজ্জামান জামাদ্দারের বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। কিন্তু খুলনা নগরীতে পড়াশোনার সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো তার চোখেমুখে অন্যরকম আনন্দ ফুটে ওঠে।
১৯৮৩ সালে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন খুলনা সিটি কলেজে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ২১ কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাকে যেতে হতো নগরীতে। পরে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন খুলনা কমার্স কলেজে। সেশনজটের কারণে অনার্স শেষ করতে সময় লেগে যায় ১৯৯৩-৯৪ সাল পর্যন্ত।
এই দীর্ঘ সময় তার যাতায়াতের প্রধান ভরসা ছিল টাউন সার্ভিস—খুলনার সেই সময়ের গণপরিবহন ব্যবস্থা।
দ্য ডেইলি স্টারকে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ফুলতলা থেকে রূপসা রুটে টাউন সার্ভিস চলত। প্রায় পাঁচ মিনিট পরপর গাড়ি ছাড়ত।’
তার ভাষ্য, ফুলতলা থেকে রূপসা ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় ২১-২২টি স্টপেজে বাস থামত। যাত্রী উঠত, নামত। কখনো জরুরি প্রয়োজনে কেউ রাস্তার পাশে হাত তুললে দুই স্টপেজের মাঝখান থেকেও বাস থামিয়ে তাকে তুলে নেওয়া হতো।
‘আমরা মজা করে বাসগুলোকে বলতাম মুড়ির টিন! প্রথমদিকে শিক্ষার্থীদের ভাড়া ছিল এক টাকা। পরে অনার্সে পড়ার সময় দুই টাকা করে ভাড়া দিতাম। ফুলতলা থেকে শান্তিরাম মোড় বা রয়েল মোড় পর্যন্ত এই ভাড়াতেই যাতায়াত করতাম,’ বলেন তিনি।
মনিরুজ্জামানের কাছে টাউন সার্ভিস শুধু একটি পরিবহন ছিল না। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ছিল স্বস্তি ও নির্ভরতার জায়গা। বাসে ভিড় হতো। বসার জায়গা নিয়ে ঝগড়া হতো। দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্যও অনেক সময় ঠেলাঠেলি করতে হতো। কখনো পকেটমারের হাতে পকেট খালি হতো।
স্মৃতিচারণ করে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সেই ঐতিহ্য, সেই ভালোবাসা এখনকার শিক্ষার্থীরা পাবে কোথায়? দলবদ্ধ হয়ে যাতায়াত করার একটা আলাদা আনন্দ ছিল। আমরাও সেটা উপভোগ করেছি।’
পড়াশোনা শেষ করে একসময় মনিরুজ্জামান নিজেও দুই সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে পরিবহন ব্যবসায় নামেন। তাদের গাড়ির নম্বর ছিল ২৭০। তখনকার প্রচলিত রীতিতে তারা গাড়িটিকে বলতেন ‘দুই সত্তর’। ‘ফজরের নামাজের পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টাউন সার্ভিস চলত’, বলেন তিনি।
মনিরুজ্জামানের মতো শত শত শিক্ষার্থী তখন ফুলতলা স্ট্যান্ড থেকে টাউন সার্ভিসে করে খুলনা বিএল কলেজ, খুলনা কমার্স কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, খুলনা প্রকৌশল কলেজসহ—বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)—বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতেন। শুধু ফুলতলা নয়, যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, নড়াইল সদরসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষও এই পরিবহনের ওপর নির্ভর করতেন। অন্যদিকে বাগেরহাটের ফকিরহাট, মোল্লাহাট, রামপাল ও মোংলার মানুষ রূপসা হয়ে খুলনা নগরী ও ফুলতলার দিকে যাতায়াত করতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই টাউন সার্ভিস হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে শহরের মানুষের সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অন্যতম এই অবলম্বন। লাখো মানুষের এই নগরীতে আজ একটিও নিয়মিত গণপরিবহন নেই।
সর্বশেষ বিডিএস জরিপ মোতাবেক, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ লাখ। কিন্তু, এই সংখ্যা নগরীর বসবাসরত মানুষের প্রকৃত প্রতিফলন নয়। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার জানান, খুলনা নগরীতে বসবাস করেন প্রায় ১৮ লাখ মানুষ।
তার ভাষ্য, ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় যারা বসবাস করেন, তাদের একটি বড় অংশই এই এলাকার ভোটার নয় কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসকারী নন। তারা জীবিকার তাগিদে এখানে থাকেন। ফলে, অনেক পরিসংখ্যানেই তাদের প্রকৃত সংখ্যা উঠে আসে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশনের প্রতিটি কাজেই বর্তমানে এই নগরীর জনসংখ্যা ১৮ লাখ প্রাক্কলন করেই কাজ করছি।’
খুলনা নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে এখন স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারকে নির্ভর করতে হয় সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য ছোট যানবাহনের ওপর। ফলে যাতায়াতের খরচ বেড়েছে। অনেকের জন্য শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া রীতিমতো বাড়তি আর্থিক বোঝা।
সম্প্রতি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও প্রাপ্যতার অভাবের অজুহাতে আবারো বেড়েছে এসব যানবাহনের ভাড়া। ফলে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের গণপরিবহনের দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।
খুলনা পলিটেকনিক কলেজের শিক্ষার্থী দীপা ব্যানার্জি বলেন, ‘ফুলতলা থেকে খুলনা নগরীতে বাস সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীরা চরম বিপদে আছে। এত টাকা দিয়ে যাতায়াত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। নগর পরিবহনের বিকল্প তো কিছু গড়ে উঠলো না।’
তার ভাষ্য, ফুলতলা থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব প্রায় ২৩ কিলোমিটার। আর রূপসা খেয়াঘাট প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। ‘আমাদের সিনিয়ররা ১০ বছর আগেও এই পথে টাউন সার্ভিসে ১৫ টাকা ভাড়া দিতেন। এখন বেশি হলে ২৫-৩০ টাকা ভাড়া হওয়ার কথা। অথচ সিএনজিতে ফুলতলা থেকে রূপসা যেতে ৭০ টাকা দিতে হয়।’
গত ৫ এপ্রিল থেকে দৌলতপুর-খুলনা বেবিট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার ড্রাইভার ইউনিয়ন ফুলতলা থেকে খুলনা রুটে ভাড়া বাড়িয়েছে। স্টেশনপ্রতি পাঁচ টাকা করে ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি গাড়িতে উঠলেই যাত্রীপ্রতি নূন্যতম ১০ টাকা দিতে হচ্ছে। বর্তমানে ফুলতলা থেকে ডাকবাংলা পর্যন্ত ভাড়া ৬০ টাকা এবং ফুলতলা থেকে রূপসা পর্যন্ত ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খুলনা-যশোর মহাসড়কের এই রুটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২৫০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। অথচ একসময় একই পথে মানুষ অনেক কম ভাড়ায় টাউন সার্ভিসে যাতায়াত করত।
একসময় ছিল ৬০ বাস
খুলনা নগরীতে গণপরিবহনের এই সংকট নতুন নয়। ২০০৫ সালে নগরীতে গণপরিবহন হিসেবে প্রায় ৬০টি বাস চলাচল করত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কমতে কমতে ২০১৭ সালে দাঁড়ায় মাত্র পাঁচটিতে। ২০১৮ সাল নাগাদ এর মধ্যে মাত্র একটি বাস চলাচল করত। এরপর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে নগরবাসী, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ সাশ্রয়ী গণপরিবহন থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হন।
গত কয়েক বছরে খুলনার পরিবহন ব্যবস্থা মূলত ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, এসব যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণে অনেক সময় চালক বা মালিক সংগঠনের প্রভাব থাকে। ফলে যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়া মেনে নেওয়া ছাড়া কার্যত কোনো বিকল্প থাকে না।
খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে মোট সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৪০ কিলোমিটার। রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরে গড়ে ওঠা খুলনা একটি দীর্ঘায়ত শহর। উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত নগরের মানুষের চলাচলের প্রধান একটি রুট ফুলতলা-রূপসা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে যশোর-খুলনা মহাসড়কের এই পথটুকু ব্যবহার করেন।
খুলনার পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, নব্বইয়ের দশকেও রূপসা থেকে ফুলতলা এবং রূপসা থেকে শাহপুর পর্যন্ত অর্ধশতাধিক গণপরিবহন চলাচল করত। তখন যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। ফলে সাধারণ মানুষের অন্যতম ভরসা ছিল টাউন সার্ভিস। বিত্তবানরা তখন বেবিট্যাক্সিতে চলাচল করত।
পরবর্তীতে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একইসঙ্গে টাউন সার্ভিসের বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যবস্থায় নানা সমস্যা তৈরি হয়। ২০০৫ সাল থেকে নগর পরিবহন বন্ধ হতে শুরু করে। ফলে, বাধ্য হয়ে মানুষকে বেশি ভাড়ার ছোট যানবাহনগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
বারবার উদ্যোগ, বারবার ব্যর্থতা
গণপরিবহন সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনোটিই টেকসই হয়নি। ২০১৬ সালের ১১ জুন পাঁচটি দোতলা বাস চালু করেছিল বিআরটিসি। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই সেই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৯ সালে নগরবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা মোটর বাস মালিক সমিতির উদ্যোগে চারটি গণপরিবহন চালু করা হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০২২ সালের আগস্টে আবারও ছয়টি বাস রাস্তায় নামানো হয়। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই নানা সংকটে সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়।
খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি, লেখক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী মনে করেন, একটি শহরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে মানুষের সহজ, নিরাপদ ও কম খরচে চলাচলের ব্যবস্থা থাকা। ‘দুঃখের বিষয়, ১৮ লাখ মানুষের এই শহরে একটি গণপরিবহনও নেই। নিম্ন আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ তাহলে কীভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করবে?’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, অতি দ্রুত সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর একসঙ্গে বসে গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ নিক।’
গৌরাঙ্গ নন্দী আরও বলেন, গণপরিবহন সংকটের মধ্যে সরকারের ইলেকট্রিক বাস চালুর চিন্তা ইতিবাচক। তবে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না থেকে খুলনাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও এ ধরনের বাস চালু করা যেতে পারে।
‘সরকার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে ইতিবাচক ফল পেলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব উদ্যোগে এ ধরনের বাস চালু করতে পারে। তবে সবার আগে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে’, বলেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
গত ১৭ বছরে খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগর পরিবহন পুনরায় চালুর বিষয়ে বহুবার আলোচনা হলেও বাস্তবে এ খাতের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রাজনৈতিক।
তিনি বলেন, ‘খুলনা সিটির একটি বড় অংশ খুলনা-৩ (দৌলতপুর-খালিশপুর) আসনের অন্তর্ভুক্ত। ওই আসনে পতিত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী বেবিট্যাক্সি, সিএনজি ও অটোরিকশা শ্রমিক সংগঠনগুলোর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও উপদেষ্টা ছিলেন। তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সিটি বাস পরিচালনাকারীদের পক্ষে এসব পরিবহন গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা বা একই রুটে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এই নেটওয়ার্কের চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা পরিবহন মালিকদের ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অন্য নেতারাও এ বিষয়ে কার্যত নীরব ছিলেন। সিটি করপোরেশন নগর পরিবহন চালুর আগ্রহ দেখালেও রাজনৈতিক বিবেচনায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই খুলনায় সিটি বাস সেবা পুনরায় চালু না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।’
‘বাস চালাতে চাইলে লোকসান হবে’
খুলনা জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গাফফার বিশ্বাস বেশ কয়েকটি টাউন সার্ভিস বাসের মালিক ছিলেন। তিনি জানান, নগরীর বয়রা, নতুন রাস্তার মোড়, দৌলতপুর, ফুলবাড়ীগেট ও শিরোমণিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘টাউন সার্ভিস বাসগুলো এসব এলাকা থেকে যাত্রী তোলার চেষ্টা করলে অটোরিকশা চালকদের বাধার মুখে পড়তে হতো। অনেক সময় এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা, এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এই ধারাবাহিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বাস চালানোর অনুকূল পরিবেশ ছিল না। ফলে একে একে বাস অপারেটররা সেবা পরিচালনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে এতগুলো গাড়ি চলত, এখন কেন চলে না? এই প্রশ্নটাই ভালো করে বিশ্লেষণ করা দরকার। গাড়ি মালিকরা তো পথে গাড়ি চালাতে চান। তারা বিনিয়োগ করা টাকা তুলে আনতে চান। কিন্তু এই রুটে গাড়ি চালিয়ে তাদের লোকসানের শেষ নেই, বিপদেরও শেষ নেই।’
একই রুটে অটোরিকশা চলাচল করায় টাউন সার্ভিস পর্যাপ্ত যাত্রী পায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের নীতির কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরকার যদি এই রুটকে নগর পরিবহনের উপযোগী করে নীতি তৈরি করত, যেমন: ইজিবাইক-মাহেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখত, তাহলে নগর পরিবহন টিকে থাকত। আমরা এখনো চাই, এই রুটসহ নগরের আরও কয়েকটি পথে টাউন সার্ভিস চলুক।’
এবার ছোট বাসের চিন্তা
দীর্ঘদিনের এই সংকটের মধ্যে খুলনা সিটি করপোরেশন আবারও গণপরিবহন চালুর কথা বলছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরবাসীর যানজট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে গণপরিবহন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হবে।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য নগর পরিবহন একটি স্বস্তিদায়ক ও সাশ্রয়ী বাহন। তাই সার্বিক বিবেচনায় এবার বড় বাসের পরিবর্তে ছোট বাস বা কোনো ধরনের মডিফাইড যানবাহন চালু করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।’
কিন্তু, সেখানেও থেকে যায় একটি প্রশ্ন। এ উদ্যোগও কি আগের উদ্যোগগুলোর মতো কিছুদিন পর থেমে যাবে?
মনিরুজ্জামান জামাদ্দারদের প্রজন্ম হয়তো এখনো এক টাকার টাউন সার্ভিসের স্মৃতি মনে করে। তাদের কাছে সেই বাস শুধু ‘মুড়ির টিন’ নয়, ছিল শিক্ষাজীবনের সঙ্গী, কর্মজীবনের ভরসা, শহরের সঙ্গে গ্রামের মানুষের যোগাযোগের সেতু। আজকের শিক্ষার্থীদের কাছে সেই স্মৃতি নেই। আছে কেবল বাড়তি ভাড়ার চাপ।
