৪৮ বছরে বিএনপি: ক্ষমতায় এসে ঘর গোছাতেই হিমশিম, তৃণমূলে বাড়ছে অস্থিরতা

দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিএনপি এখনো নিজের দল গোছাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার দলটি তার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে পারেনি তারা। এমনকি দলের কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলও সম্পন্ন হয়নি। কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের বড় অংশ এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত।

অন্যদিকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বেশিরভাগ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর ঠিক আগে তৃণমূলে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নানা বিতর্ক সামলে দলকে সুসংগঠিত রাখাই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট ও নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দল শক্তিশালী করার দিকে বিএনপির সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, বিরোধীরা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছে। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপিকে মাঠে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের বড় অংশ এখন সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মেতে উঠেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মতো নানা অভিযোগ।

এছাড়া, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাত্র সাত সপ্তাহ আগে দলের মূল কাণ্ডারি খালেদা জিয়ার প্রয়াণ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা ও নতুন করে সংগঠিত করার প্রচেষ্টাকে আরও দুর্বল করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বিএনপি বড় সমস্যায় পড়তে পারে।

তিনি বলেন, দল ও সরকারের মধ্যে যখন অতিরিক্ত মেলবন্ধন তৈরি হয়, তখন সরকারের সুযোগ-সুবিধা (জনগণের অর্থ, চাকরি ও বিভিন্ন সেবা) নাগরিকদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, কাউন্সিল না হওয়ায় দলের অনেক নেতা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এটা তাদের মধ্যে উপেক্ষিত বা কোণঠাসা হওয়ার অনুভূতি তৈরি করছে। দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতাও এ কথা স্বীকার করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম। রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করা, গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দিকনির্দেশনা দেওয়াই এই কমিটির কাজ।

কমিটির ১৮ সদস্যের বেশির ভাগই এখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন। সম্প্রতি আরও তিনজন যুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি বেড়েছে। কমিটির মাত্র পাঁচজন এখনো সরকারের বাইরে আছেন। তাদের একজন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন।

সরকারের দায়িত্বে থাকা নেতাদের মধ্যে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পাঁচজন মন্ত্রী ও দুজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। আরও দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার পর দলের পদ ছেড়েছেন। তাদের একজন রাষ্ট্রপতি এবং অন্যজন স্পিকার হয়েছেন। সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে মাত্র চারটি।

দলের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন সভাপতি হয়েছেন। আর রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপির আরও অনেক নেতা সরকারের বিভিন্ন পদে যোগ দিয়েছেন। জুন ও জুলাই মাসে দলের বর্তমান ও সাবেক ১৭ নেতাকে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, দলের নেতারা দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, নির্বাচনের পর দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন। দলকে নতুন করে গোছাতে আমাদের কিছুটা সময় লাগছে।

বিএনপি সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করেছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা। কাউন্সিলের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটি নির্বাচন বা অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব কমিটির মেয়াদও তিন বছর।

দলের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক, আইনি ও সাংগঠনিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কাজে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে।

বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও প্রায় একই—১১টি কমিটির মধ্যে নয়টির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপরও কয়েকটি পুরোনো কমিটি দিয়েই চলছে। অনেক সংগঠনের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে।

হাসানুজ্জামান বলেন, তৃণমূল শক্তিশালী করতে না পারলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, কাউন্সিল ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় জায়গা করে নিতে পারেন না।

তার মতে, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিকে সরকারের কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে হবে এবং সরকারের উদ্যোগগুলোকে সমর্থন দিতে হবে।

প্রায় এক দশক আগে বিএনপির গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

একজন নেতা একাধিক পদে থাকলে অন্যদের সুযোগ কমে যায়। এতে দলের ভেতরে প্রতিযোগিতা দুর্বল হয় এবং নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথও বন্ধ হয়ে যায়, বলেন হাসানুজ্জামান।

তৃণমূলেও বিএনপি এখন নানা সমস্যার মুখোমুখি। দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। কোথাও কোথাও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাতও হচ্ছে। এসব ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে এর প্রভাব সরকারের ওপর এসেও পড়বে। এতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

মার্চ ও এপ্রিল মাসে তৈরি করা পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে সারা দেশে এক হাজার ২০০ জন চাঁদাবাজিতে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত ১৯৭ জনের ১৮১ জনই বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ আরও ৩২৯ জনকে অভিযুক্ত চাঁদাবাজদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলে যুক্ত ২৭১ জনের ২১৪ জন বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দলীয় কোন্দলে বিএনপির ১৮ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট, ধর্ষণ, ভয়ভীতি দেখানো ও পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

উদাহরণ হিসেবে, মে মাসে রাজশাহীতে ৩০০ বস্তা জিরা লুটের ঘটনায় বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আগস্টে কিশোরগঞ্জে বিএনপির এক ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে ১১ বছরের বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ৩০ আগস্ট চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি, ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদে দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। একই পদে একাধিক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিটি পদে একজন করে প্রার্থী দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টার মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও বগুড়ার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে। সেখানে দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে দলের কার্যক্রম অনেকটাই কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এবং জাতীয় ও দলীয় বিভিন্ন দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

হাসানুজ্জামান বলেন, প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের ভেতরে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে এটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এক দশকের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে। এখন দলটির নেতৃত্বে তাদের ছেলে তারেক রহমান।

২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ, সব কিছু সামলে বিএনপি টিকে আছে। শেখ হাসিনার পতনের পর দলটির সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দুই রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপির প্রতিটি প্রজন্মের সামনে আলাদা দায়িত্ব ছিল। জিয়াউর রহমান দলটি গড়ে তুলেছেন, খালেদা জিয়া প্রতিকূল সময়ে সেটিকে ধরে রেখেছেন। আর তারেক রহমানকে এখন একই সঙ্গে দল ও সরকার, দুটোই সামলাতে হবে।

Related Articles

Latest Posts