বন্যা, জলাবদ্ধতা, কৃষি উপকরণের সংকট আর খাদ্যের বাড়তি দামের চাপে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবার এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। এসব পরিবারের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জন্য আগামী নভেম্বর পর্যন্ত জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘জরুরি কৃষি সহায়তা পর্যবেক্ষণ’-এর ১৪তম ধাপে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০১৫ সালের নভেম্বরের তুলনায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ বেড়েছে। পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহে এফএও এক মাস ধরে দেশের ৬৪ জেলার ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের কাছ থেকে টেলিফোনে তথ্য নেয়।
২৫ আগস্ট প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সহায়তার প্রাক্কলন দুইভাবে করা হয়েছে—পরিবারের সংখ্যার বিচারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শতাংশের বিচারে। ফলে কোন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি খারাপ, তা দুই হিসাবের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন দেখা গেছে।
মোট কতটি পরিবার সহায়তা চায়, সেই হিসাবে দেশের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে এমন পরিবারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে রংপুর, ঢাকা ও রাজশাহী।
এসব বিভাগে কৃষকের সংখ্যা বেশি। তাই মোট কৃষি পরিবারের তুলনায় সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারের হার কম হলেও সংখ্যার হিসাবে তা বেশি হয়।
তবে মোট কৃষি পরিবারের কত শতাংশ সহায়তার প্রয়োজন, সেই হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর। এই বিভাগগুলো তুলনামূলক ছোট হলেও সেখানে কৃষি পরিবারের বড় একটি অংশ এখন সহায়তার প্রয়োজন বোধ করছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, উভয় বিচারে রংপুর বিভাগই সবচেয়ে সংকটাপন্ন অঞ্চলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী অববাহিকা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। বর্ষা বাড়ার সঙ্গে এসব এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যাও তীব্র হয়েছে।
জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারগুলোর বড় অংশই দরিদ্র ও ছোট কৃষক পরিবার। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, এসব পরিবারের ৫৭ শতাংশ এক হেক্টরের কম জমিতে চাষ করে। আর ৬০ শতাংশ পরিবার সবচেয়ে কম সম্পদশালী শ্রেণির।
এসব পরিবারের অনেকে দিনমজুর হিসেবে কৃষিকাজ করেন। কেউ কৃষির বাইরে দিনমজুরি করেন। আবার কেউ অল্প পুঁজি নিয়ে ছোটখাটো কাজ করেন। তাই কৃষিতে নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ তাদের হাতে কম। কোনো বিপদ এলে তা সামাল দেওয়ার সামর্থ্যও সীমিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন প্রায় ৮৪ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। আর ১৬ শতাংশ পরিবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়েছে। আগের প্রতিবেদনের তুলনায় এই হার বেড়েছে ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
আর্থিক সংকটের চিত্রও বেশ স্পষ্ট। ৬৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা বাকিতে খাবার কিনছে। ৬৬ শতাংশ পরিবার চিকিৎসাবাবদ ব্যয় কমিয়েছে। আর ৩০ শতাংশ পরিবার কৃষির উপকরণ কেনার খরচ কমিয়েছে।
ফসল উৎপাদনকারীরা বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন। ফসলেও বাড়ছে রোগবালাই। বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত এফএওর আগের প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ফসলে রোগের কথা বলা পরিবারের হার বেড়েছে ৩০ শতাংশীয় পয়েন্ট।
সার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার কথা বলা পরিবারের হার বেড়েছে ১৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। ফসল বিক্রির সমস্যাও প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
আগের প্রতিবেদনে ৯ শতাংশ কৃষক ফসল বিক্রি করতে সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। এবার সেই হার বেড়ে হয়েছে ৩০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ কম দাম। জরুরি সহায়তার ক্ষেত্রে কৃষি উপকরণই এখন সবচেয়ে বড় চাহিদা। সহায়তা প্রয়োজন এমন ৭২ শতাংশ পরিবার কৃষি উপকরণ চেয়েছে।
তবে নগদ অর্থের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত নভেম্বরের তুলনায় নগদ সহায়তা চাওয়া পরিবারের হার বেড়েছে ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার ৫৭ শতাংশ পরিবার নগদ সহায়তা চেয়েছে।
এফএওর মতে, বর্ষার বন্যা, খাদ্যের উচ্চ মূল্য এবং পরিবারের আয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবেই নগদ অর্থের চাহিদা বেড়েছে।
এছাড়া ৫১ শতাংশ পরিবার গবাদিপশুর খাবার এবং ৩৩ শতাংশ পরিবার পশুর চিকিৎসাসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এফএও বলেছে, আমন চাষের আগে কৃষকদের জন্য সময়মতো একটি সমন্বিত সহায়তা প্যাকেজ দেওয়া দরকার। এতে কৃষি উপকরণ, নগদ অর্থ, গবাদিপশুর চিকিৎসা এবং পানি ব্যবস্থাপনার সহায়তা থাকতে হবে।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাব বলছে, গত ৭ থেকে ১৯ জুলাইয়ের ভারী বৃষ্টিতে দেশের ৪৩ জেলার ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ১ লাখ ৩৪ হাজার টনের বেশি ফসল নষ্ট হয়েছে। এসব ফসলের মূল্য প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ মোট চাষের জমির প্রায় ৩ শতাংশ। দেশে মোট ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে চাষাবাদ হয়।
এফএওর প্রতিবেদনের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা এবং দেশের কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানোর উপযোগী করতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা ও ফসলের জন্য সরকার বীজ, চারা ও ত্রাণসামগ্রী দিয়েছে। এছাড়া বীজ উৎপাদনের জন্য বিকল্প জমির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, হাওর এলাকার কৃষকদের আগাম বন্যায় ক্ষতি কমাতে নতুন একটি ধানের জাত ব্রি ধান ১১৮ চালু করা হয়েছে।
এই জাতের ধান প্রচলিত জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে কাটা যায়। ফলে আগাম বন্যার আগেই কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারবেন।
সরকার গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও কাঁচা মরিচের উৎপাদন বাড়ানোরও উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য প্রণোদনা দেওয়া এবং এসব ফসলের চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া এসব ও অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত ও রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সরকার।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকের ক্ষতি কমানো, তাদের আয় বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের বাজারকে আরও শক্তিশালী করা।
এফএওর প্রতিবেদনকে শুধু মানবিক সংকটের চিত্র হিসেবে দেখছেন না সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী।
তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন একই সঙ্গে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কৃষিতে সরকারের ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
তিনি বলেন, যেসব কৃষকের নিজের জমি নেই বা আর্থিক সঞ্চয় নেই, তাদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কৃষি সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। সরকারকেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
