ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তান ক্রিকেটের অস্থিরতা এবার মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে আরও বড় বিতর্কে। পিসিবিপ্রধান মহসিন নাকভির বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক অধিনায়ক ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান। লর্ডসে ইংল্যান্ড-পাকিস্তানের দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালে তাদের বাবাকে নিয়ে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার প্রচার ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। এমন অভিযোগের জেরে নাকভিদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন তারা।
ঘটনার সূত্রপাত লর্ডস টেস্টে। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল আথারটনের নেওয়া একটি পূর্বধারণকৃত সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে স্কাই স্পোর্টস। সেখানে ইমরানের দুই ছেলে তাদের বাবার শারীরিক অবস্থা এবং কারাগারে তার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ওই সাক্ষাৎকারে অসন্তুষ্ট ছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি সেটি সম্প্রচার না করার জন্য স্কাই স্পোর্টসকে চাপ দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত টেস্ট চলাকালেই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারিত হলে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, পিসিবি নাকি হুমকি দিয়েছিল, সাক্ষাৎকার প্রচার করা হলে পাকিস্তান দল আর মাঠে ফিরবে না।
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের হস্তক্ষেপে ম্যাচ চলতে থাকে। পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম এবং তৎকালীন প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ পরে জানান, সম্ভাব্য বয়কট নিয়ে তারা কিছুই জানতেন না। এতে ধারণা করা হয়, খেলোয়াড়দের নয়, মূলত প্রশাসনিক পর্যায়েই এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
এবার সেই ঘটনার বিষয়ে সরাসরি মুখ খুলেছেন ইমরানের দুই ছেলে। দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাসিম বলেন, ‘তারা নিজেদেরই একেবারে হাস্যকর বানিয়েছে।’
সুলাইমানও পিসিবির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সাক্ষাৎকারের পর কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সেটি তিনি অনুমান করেছিলেন। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতে পারে, তা ভাবেননি।
সুলাইমান বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলাম। কিন্তু তারা এতটা বিবেচনাহীন হবে যে মাঠে নামবে না বলে হুমকি দেবে, সেটা ভাবিনি। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কাজের পরিধির মধ্যে তো এটা পড়ে না যে, পাকিস্তানের সাবেক একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার সরিয়ে নিতে বলবে। তিনি ২২ বছর ইংল্যান্ডে বসবাস করেছেন। এটা রাজনীতি নিয়ে ছিল না; বরং ছিল মানবিক পরিস্থিতি এবং তার স্বাস্থ্যের বিষয়।’
এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহসিন নাকভি শুধু পিসিবির চেয়ারম্যান নন, তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। আর ইমরান খান ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জেতানো সাবেক অধিনায়ক, রাজনীতিতে আসার পর দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠেছেন।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
পিসিবির বিরুদ্ধে দুই ভাইয়ের ক্ষোভ অবশ্য শুধু ওই সাক্ষাৎকারে সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো সাক্ষাৎকারজুড়েই বাবার কারাবন্দি জীবন ও স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা। কাসিম এমনকি কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, ইমরানকে কারাগারের ভেতরেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কাসিম বলেন, ‘তারা স্পষ্টতই সেখানে তাকে মেরে ফেলার আশা করছে। তারা যতটা সম্ভব গোপনে তাকে চুপ করিয়ে দিতে চায় এবং ধীরে ধীরে তাকে এমনভাবে নিঃশেষ করে দিতে চায়, যেন তিনি কিছুই ছিলেন না। পাকিস্তানের এই মুহূর্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষকে নিয়ে সেটা করা অবশ্য সহজ নয়। আমরা যখনই কথা বলি, তাদের কৌশল হলো সবকিছুকে ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে দেওয়া, এরপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা, যাতে তার টিকে থাকাটাই আরও কঠিন হয়ে যায়।’
তবে কাসিমের এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষও এর আগে ইমরানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে, তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তবু বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি তথ্যকে বিশ্বাস করতে পারছে না পরিবার। সুলাইমান বলেন, ‘আমরা যে উদ্বেগজনক তত্ত্বটি শুনছি, তা হলো, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তার অসুস্থতার খবর একটু একটু করে প্রকাশ করছে এবং এমন ভান করছে যে তারা তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। আসলে আরও খারাপ কিছু ঘটার জন্য তারা হয়তো পরিস্থিতি তৈরি করছে। এরপর তারা হাত ধুয়ে বলতে পারবে, “তিনি তো একজন বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন, মারা গেছেন। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।”’
চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন
ইমরানের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাও দুই ভাইয়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সেখানে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
এই ঘটনা নিয়ে কাসিম বলেন, ‘পুরো বিষয়টাই ছিল একটা সাজানো নাটক এবং আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই রহস্যজনক। শিফার চিকিৎসকেরা সেখানে আমাদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন, যিনি নিজেও চিকিৎসক। যাদের বুক করা হয়েছিল, যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সবকিছুই উপেক্ষা করা হয়েছে।’
সুলাইমানের কাছেও ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো মনে হয়েছে। তার ভাষায়, ‘মনে হয়েছে এটা ছিল এক ধরনের ধোঁকা। তারা আসলে শিফার দিকে একটি গাড়িবহর পাঠিয়েছিল, যেন সেটি সবাইকে বিভ্রান্ত করার জন্য। অথচ তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পিআইএমএসে, যেখানে এর আগেও তাকে বেশ কয়েকবার নেওয়া হয়েছে।’
পরিবারকে সরাসরি তথ্য না দেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন সুলাইমান, ‘এর কোনোটিরই প্রমাণ তারা আমাদের দেয়নি। সবই সরকারি সূত্রের কাছ থেকে শোনা কথা। কোনো স্বচ্ছতা নেই, কাউকে তার কাছে যেতে দিতে চায় না। তাহলে আমরা কীভাবে এসব বিশ্বাস করব? আমাদের কাছে সর্বশেষ যাচাইযোগ্য তথ্য এসেছিল ছয় মাস আগে, যখন তিনি নিজেই তার চোখের সমস্যা এবং সেটির অবহেলার কথা জানিয়েছিলেন।’
