টেলিভিশন নাটকেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান

এটিএম শামসুজ্জামান মানেই ঢাকাই সিনেমার শক্তিমান অভিনেতা। বিশেষ করে নেতিবাচক ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল। অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করে পেয়েছেন বিপুল জনপ্রিয়তা। একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাসহ জীবদ্দশায় অর্জন করেছেন বহু স্বীকৃতি।

তবে রুপালি পর্দার বাইরেও তার অভিনয়ের বিস্তৃত জগৎ ছিল। টেলিভিশন নাটকে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পেয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা। কখনো কৌতুক, কখনো নেতিবাচক চরিত্র, আবার কখনো একেবারে সাধারণ মানুষের ভূমিকায় তার অভিনয় হয়ে উঠেছিল নাটকের অন্যতম আকর্ষণ।

এটিএম শামসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য কিছু নাটক ও চরিত্রের কথা জেনে নিন।

সেলিম আল দীন ও মাসুম রেজার রচনায় এবং সালাহউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় নির্মিত ‘রঙের মানুষ’ ছিল তুমুল জনপ্রিয় একটি ধারাবাহিক। নাটকটিতে বোস্তানী শাহ চরিত্রে অভিনয় করেন এটিএম শামসুজ্জামান। চরিত্রটির সংলাপ, অভিনয় ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য দর্শকের মনে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, নাটকের নামের পাশাপাশি বোস্তানী শাহকেও দীর্ঘদিন মনে রেখেছেন দর্শক।

মাসুম রেজার রচনা ও সালাহউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় ‘ভবের হাট’ ছিল আরেকটি দর্শকপ্রিয় ধারাবাহিক। এই নাটকে এটিএম শামসুজ্জামান ও হুমায়ুন ফরীদিকে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়। এটিএম শামসুজ্জামান মারেম খান চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনয় নাটকটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল।

মীর সাব্বির পরিচালিত দীর্ঘ ধারাবাহিক ‘নোয়াশাল’-এ এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয় প্রশংসিত হয়। নাটকটির বিশেষত্ব ছিল নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা ও সেখানকার জীবনযাত্রার উপস্থাপন। এটিএম শামসুজ্জামান আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ বলে চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন।

‘নৈবচ নৈবচ’ ছিল এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয়জীবনের অন্যতম আলোচিত নাটক। একজন আদর্শ শিক্ষকের জীবনের সুখ-দুঃখ, হতাশা ও বেদনার গল্প উঠে এসেছে এতে। শিক্ষকের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেন তিনি। বিশেষ করে ছাত্রের কাছে শিক্ষকের অপমানের দৃশ্যটি দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছিল।

নাটকটির মূল গল্প এটিএম শামসুজ্জামানের কাছ থেকে নেওয়া। চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন ফ্লোরা সরকার এবং পরিচালনা করেছেন সালাহউদ্দিন লাভলু।

সালাহউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় এবং বৃন্দাবন দাশের রচনায় ‘শীলবাড়ি’ নির্মিত হয় গ্রামের দরিদ্র শীল সম্প্রদায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে। এটিএম শামসুজ্জামান এতে উপেন শীল চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটির মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও আবেগকে তিনি সাবলীলভাবে তুলে ধরেন। তার বড় ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেন বৃন্দাবন দাশ এবং ছোট ছেলের চরিত্রে ছিলেন চঞ্চল চৌধুরী।

‘নাপিত’ নাটকে গাছপ্রেমী এক গ্রামবাসীর চরিত্রে অভিনয় করেন এটিএম শামসুজ্জামান। গাছ কাটার বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী অবস্থান চরিত্রটিকে আলাদা করে তুলেছিল। নাটকের একটি সংলাপ ‘এই গাছ আমি কাটতে দিমু না’, সে সময় দর্শকদের মধ্যে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে।

‘এই যে দুনিয়া’ নাটকে এটিএম শামসুজ্জামানকে দেখা যায় কৃপণ এক চরিত্রে। নাটকটিতে আরও অভিনয় করেন ঈশিতা ও টনি ডায়েস। ভিন্ন ধরনের এই চরিত্রেও তার স্বাভাবিক অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পায়।

হাস্যরসনির্ভর নাটক ‘প্রেম পিরিতি’-তে নিজের অভিনয়প্রতিভার আরেকটি দিক দেখিয়েছেন এটিএম শামসুজ্জামান। নাটকটিতে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ছিল অন্যতম আকর্ষণ। তার অভিনয় নাটকটিকে দর্শকের কাছে উপভোগ্য করে তোলে।

এক ঘণ্টার নাটক ‘গরুচোর’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন এটিএম শামসুজ্জামান। গরুচোর চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়। চরিত্রের মধ্যে হাস্যরস ও অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা নাটকটিকে আলাদা করে তুলেছিল।

‘ঘরকুটুম’ নাটকটিও এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয়জীবনে উল্লেখযোগ্য। নাটকটির মাধ্যমে তিনি আবারও দেখিয়েছেন, চরিত্রের ধরন যতই বদলাক, অভিনয়ের নিজস্ব শক্তি দিয়ে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা তার ছিল।

‘ঢোলের বাদ্যি’ ও ‘পণ্ডিতের মেলা’-সহ আরও বহু নাটকে অভিনয় করেছেন এটিএম শামসুজ্জামান। চরিত্রের বৈচিত্র্য ছিল তার অভিনয়ের অন্যতম শক্তি। একই সঙ্গে দর্শককে হাসানো, কাঁদানো কিংবা কোনো সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন।

এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয়জীবন কেবল সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। টেলিভিশন নাটকেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। বোস্তানী শাহ, মারেম খান, উপেন শীল কিংবা আদর্শ শিক্ষক—প্রতিটি চরিত্রে তিনি আলাদা করে নিজেকে মেলে ধরেছেন।

তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রকে নিজের মতো করে জীবন্ত করে তোলা। তাই রুপালি পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দাতেও এটিএম শামসুজ্জামান হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের প্রিয় এক অভিনয়শিল্পী। তার অভিনীত নাটক ও চরিত্রগুলো বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর ছিল প্রয়াত এই অভিনেতার জন্মদিন।

Related Articles

Latest Posts