সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। এতে মানহানিকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ‘অপমান’ ও ‘বুলিং’-এর জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে অনলাইনে কী বলা বা প্রকাশ করা যাবে, আর কী করলে শাস্তি হবে, সেই পরিধি আরও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত এসব সংশোধন কার্যকর হলে অনলাইনে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত ও কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) বিধিনিষেধের দিকে আবারও ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। ওই আইনটি মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন ধারার কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে গত রাতে সংশোধনীর খসড়াটি প্রকাশ করা হয়েছে।
বর্তমান আইনটি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ভিত্তিতে প্রণীত। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়। পরে ৩০ জুন সংসদে এর একটি সংশোধনী পাস হয়।
আইনটি কার্যকর হওয়ার পরপরই আবারও এসব নতুন সংশোধনের প্রস্তাব আনা হলো।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, মানহানির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগী কোনো নারী বা শিশু হলে এ শাস্তির পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে।
‘অপমান’ ও ‘বুলিং’-এর ক্ষেত্রেও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
যৌন হয়রানি, যৌন হয়রানির মাধ্যমে অর্থ বা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা, শিশু যৌন নির্যাতন, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং অশ্লীল হিসেবে বিবেচিত কোনো কনটেন্ট প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত মানহানির ধারা ডিএসএতেও ছিল। তবে নতুন আইনে এর সর্বোচ্চ শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। ডিএসএতে মানহানির জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ‘ডিজিটাল মানহানি’ বলতে এমন তথ্য, উপাত্ত, বক্তব্য, অডিও, ভিডিও, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিকস বোঝানো হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তির সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো বা প্রকাশ করা হয়।
এসব উপাদান মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ বা সম্পাদনা করা হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি, সম্পাদনা বা পরিবর্তন করা কনটেন্টও এর আওতায় পড়বে।
‘অপমান’ বলতে এমন কথা, আচরণ, প্রকাশনা, অঙ্গভঙ্গি বা কাজকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান ক্ষুণ্ন করা হয়। এর ফলে অন্যদের কাছে ওই ব্যক্তিকে অপমানিত, তুচ্ছ, নিন্দনীয় বা অসম্মানজনক হিসেবে তুলে ধরা হয়, অথবা তার সামাজিক অবস্থান ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘বুলিং’ বলতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত ও বারবার করা এমন আচরণ বা কাজকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে নিজের ক্ষমতা, প্রভাব বা আধিপত্য ব্যবহার করে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা হয়। এ ধরনের আচরণ শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক, ডিজিটাল বা অন্য কোনো মাধ্যমে হতে পারে। এর ফলে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি, কষ্ট, ভয় দেখানো, সামাজিকভাবে বাদ দেওয়া, বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব তৈরি হতে পারে।
এদিকে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব বা ভুয়া খবর ছড়ানোও অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ডিএসএতে আলাদাভাবে ভুয়া খবর ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘গুজব’ বলতে এমন কোনো ভিত্তিহীন বা যাচাই না করা তথ্য, খবর বা দাবিকে বোঝাবে, যা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করার আশঙ্কা রাখে।
একইভাবে ‘ভুয়া খবর’ বলতে এমন মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করা, প্রতারণা করা বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা ছড়ানো হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনের আওতাভুক্ত বেশ কিছু অপরাধ ভ্রাম্যমাণ আদালতে (মোবাইল কোর্ট) বিচারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট প্রকাশ, অপমান ও বুলিংয়ের মতো অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত শাস্তি দিতে পারবে। তবে ভুক্তভোগী নারী বা শিশু হলে ওই অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে করতে হবে।
গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর পাশাপাশি হ্যাকিং, সাইবার সন্ত্রাস, ডিজিটাল চুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় অবৈধ প্রবেশের মতো অপরাধের বিচারও সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে।
অন্যদিকে সাইবার প্রতারণা, ম্যালওয়্যার ছড়ানো, তথ্য চুরি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর শারীরিক ক্ষতি করার মতো অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের।
আরেকটি প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্লক করার জন্য অনুরোধ জানানোর ক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
বর্তমান আইনে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মহাপরিচালকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) কোনো কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ করতে পারে।
বর্তমানে কোনো কনটেন্ট দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে তা ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কিংবা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে সহিংসতায় উসকানি দেয় এমন কনটেন্ট এবং বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেওয়া কনটেন্টও ব্লক করা যায়।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার অনুমোদিত অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীকেও কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ জানানোর ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।
কোনো কনটেন্ট ব্লক করার কারণ ও সুযোগও বাড়ানো হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো অপরাধ বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর শুধু তখনই নয়, এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ থাকলেও কনটেন্ট ব্লক করা যাবে।
বর্তমান কারণগুলোর পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানহানিকর এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবমাননাকর কনটেন্টও ব্লক করা যাবে।
বর্তমান সাইবার নিরাপত্তা আইনে কোনো কনটেন্ট ব্লক করা হলে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আরেকটি প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই আইনের অধীনে অপরাধ করলে তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। প্রয়োজনে ওই কোম্পানির কার্যক্রমও স্থগিত করা যাবে। বর্তমান আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট বলেছে, এসব সংশোধনী অনলাইনে মুক্ত মতপ্রকাশের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বাড়াবে।
এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু করে পরপর বিভিন্ন সরকারের আমলে যে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে, এসব সংশোধনী তারই ধারাবাহিকতা।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ও ‘গুজব’-এর মতো অস্পষ্ট এবং ব্যক্তিভেদে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এমন ধারণা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা, ব্যঙ্গ, জনস্বার্থে সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো বৈধ মতপ্রকাশও অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, এসব অপরাধের জন্য বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে। এতে আইনটি অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রয়োগ করার বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বলেছেন, প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন ২০২৬ ডিজিটাল পরিসরে শালীন পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। এটি সাইবার বুলিং থেকে নারী ও তরুণদের সুরক্ষা দিতে এবং আইনের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও চরিত্রহনন বা আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার এক বিষয় নয়।
