পবিত্র নগরী মক্কার দিকে আঘাত হানতে যাওয়ার পথে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব। দেশটির নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযোগ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ড্রোনটি মক্কার দিকে পাঠিয়েছিল। তবে হুতিরা এই অভিযোগকে ‘পুরোনো মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আজ বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে—সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, মক্কার দক্ষিণে হুতিদের একটি ড্রোন শনাক্ত করে তা ভূপাতিত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, পবিত্র নগরী ও মুসল্লিদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘রেড লাইন’।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘দুই পবিত্র মসজিদ ও মুসল্লিদের নিরাপত্তা একটি রেড লাইন। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে জোটের যৌথ বাহিনী দ্বিধা করবে না।’
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ বলেন, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ‘পুরোনো মিথ্যা’। এর আগেও এমন অভিযোগ তোলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘মক্কাকে লক্ষ্য করার দাবি একটি পুরোনো মিথ্যা, যা এর আগেও তোলা হয়েছে এবং তারা এখন আর কাউকে বোকা বানাতে পারে না।’
ওআইসির নিন্দা
আল জাজিরা বলছে, সৌদি আরবের অভিযোগের পর মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। মুসলিমপ্রধান ৫৭ দেশের এই জোট ঘটনাটিকে ‘জঘন্য’ হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পবিত্র স্থান ও মুসল্লিদের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ওআইসি। একইসঙ্গে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ধারাবাহিক হামলারও নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল মঙ্গলবার সৌদি আরব মক্কা ও ইয়েমেন সীমান্তবর্তী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ শুরুর পর মক্কায় এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম সতর্কতা।
এর এক দিন আগে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় ১৩ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের উদ্বেগ
এদিকে হুতিদের হামলা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তান উদ্বেগ জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন।
পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমদ বলেন, ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা, সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও লোহিত সাগর উপকূলে সাম্প্রতিক সামরিক উপস্থিতি সংঘাতকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে’ নিয়ে গেছে।
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের সব ধরনের হামলার ‘তীব্র নিন্দা’ করেন তিনি।
আসিম ইফতিখার আরও বলেন, উত্তেজনা কমাতে এবং অঞ্চলটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান সর্বোচ্চ পর্যায়ে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাবে।
তুরস্কের মুখে ‘কুলুপ’
মক্কার দিকে ড্রোন উড়ে আসার ঘটনায় পাকিস্তান মিত্র সৌদি আরবের পাশে অবস্থান নিলেও এখন পর্যন্ত তুরস্কের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে নিজেদের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে গত ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদি আরবে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি। তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পদক্ষেপের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে জানায় দেশটি।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলেও তুরস্ক এখনো মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার সৌদি অভিযোগ বা হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।
লোহিত সাগরে আবারও উত্তেজনা
হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতায় শুধু সৌদি আরব নয়, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরো অংশ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে। এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিয়েছে। তবে তাদের দাবি, বাব আল-মান্দেবে নৌ চলাচলের জন্য কোনো হুমকি নেই, শুধু সৌদি জাহাজগুলো এর আওতার বাইরে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—হামলা হলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। লোহিত সাগর দিয়ে সুয়েজ খালের হয়ে ভূমধ্যসাগর যাওয়া যায়। ফলে এই পথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে মিসরের পাশাপাশি ইউরোপের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে এর পরিণতি ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কাতার।
মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতা
সৌদি আরবে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দেশটিতে থাকা বা ভ্রমণ করতে যাওয়া মার্কিন নাগরিকদের জন্যও সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মক্কা ও সৌদি আরবের অন্যান্য এলাকায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে রিয়াদের সতর্কতার পর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস নাগরিকদের সৌদি আরব ভ্রমণ ‘পুনর্বিবেচনা’ করার পরামর্শ দিয়েছে।
সতর্কতায় ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে মার্কিন স্বার্থে হামলা, সশস্ত্র সংঘাত ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সৌদি আরব থেকে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইনের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে মার্কিন নাগরিকদের ইয়েমেন সীমান্তে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে সন্ত্রাসবাদের হুমকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ইয়েমেন সংঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর
ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাত ২০২২ সালের পর অনেকটা স্থবির ছিল। তবে গত জুলাইয়ে আবার বড় আকারে সংঘর্ষ শুরু হয়। উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে।
জাতিসংঘের তথ্য বলছে—চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে নতুন করে সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে প্রায় ৮২ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।
ইয়েমেনের জাতিসংঘ প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল-সাদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইয়েমেনিরা দেশের প্রতিটি অংশে ‘জাতীয় প্রতিষ্ঠান’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে।
অন্যদিকে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরব প্রতিবেশী ইয়েমেনে ৫২টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
এসব হামলায় স্কুল ও সেতুসহ বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
