গত মাসের ভয়াবহ বন্যায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরতে একটি গবেষণার উল্লেখ করে জাতিসংঘের তহবিল থেকে প্রায় দুই কোটি ডলার বা প্রায় ২৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা চাইবে নেপাল।
নেপাল জাতিসংঘের ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ থেকে এই অর্থ চাইবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দিতে গত বছর তহবিলটি চালু করা হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ চাইতে নেপালি কর্তৃপক্ষ গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের একটি প্রতিবেদনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত এই দুর্যোগে নেপালে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ছয় হাজার ১৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, গত মাসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত করা পাথর ও বরফ ধসে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল।
গবেষণার সহলেখক ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিদ ড. ফ্রিডেরিকে অটো বিবিসিকে বলেন, ‘এই দুর্যোগে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
বিবিসি জানায়, বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের শহর ও গ্রামগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজারো ঘরবাড়ি ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়।
বন্যার পর নেপালের নেতারা জানিয়েছেন, দেশটি পুনর্গঠনে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বা ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।
বিজ্ঞানীদের মতে, নেপালের হিমালয় অঞ্চলে লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে পাথরের দেয়াল ও হিমবাহের বরফ ধসে বন্যার সৃষ্টি হয়।
গবেষণায় দুর্যোগটিকে একটি ‘যৌগিক ঘটনা’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে এই দুর্যোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ছিল তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি গলে যাওয়া এবং আগে থেকেই থাকা ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই এলাকায় জুলাই ও আগস্টের তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। একই সময়ে ওই অঞ্চলের হিমবাহগুলো বছরে প্রায় আধা মিটার করে পাতলা হচ্ছিল। এতে পুরোনো ফাটলগুলো আরও দুর্বল হয়ে পাহাড় ও হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে ভারী তুষারপাতের কারণে এ বছরের শুরুতে বিপুল পরিমাণ বরফ গলে পানি তৈরি হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনই এই দুর্যোগের একমাত্র কারণ নয়। তবে আগে থেকেই থাকা ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার সঙ্গে এটি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করেছে।
জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলার তহবিল থেকে অর্থ পেতে হলে দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হয়। এজন্য নেপালের কর্মকর্তারা স্যাটেলাইট ও ড্রোনের ছবি এবং প্রাথমিক প্রতিবেদন সংগ্রহ করছিলেন।
নেপালের কৃষি, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মহেশ্বর ধাকাল বিবিসিকে বলেন, ‘এই দুর্যোগে জলবায়ুর কী ভূমিকা ছিল, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরায় প্রতিবেদনটি আমাদের দাবির মূল ভিত্তি হবে।’
নেপাল সরকার বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশটির অবদান খুবই কম। তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে বালেন্দ্র শাহ আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন। সেখানে তিনি সাম্প্রতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়েও কথা বলবেন।
