বৈশ্বিক জেন্ডার সমতা সূচকে বাংলাদেশের বড় পতন হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশের সামগ্রিক জেন্ডার প্যারিটি স্কোর গত বছরের ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৭১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের ২৪তম স্থান থেকে একলাফে ৫৫ ধাপ পিছিয়ে ৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের ২০তম ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ প্রকাশ করে। চারটি মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি করা হয়—অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অর্জন, স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কাল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।
৫৫ ধাপ পেছালেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখনো শীর্ষে অবস্থান করছে। মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এই সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের এই পতনকে অন্যান্য দেশের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, কারণ এই র্যাঙ্কিং আপেক্ষিক। তিনি বলেন, ‘২০২৫ ও ২০২৬—উভয় বছরের সূচকে থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ তাদের স্কোরে উন্নতি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, গুয়াতেমালা ৮১তম থেকে ৫০তম স্থানে উঠে এসেছে। তাই বাংলাদেশের ৫৫ ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ অবনতির পাশাপাশি অন্যান্য দেশের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও কাজ করেছে।’
দুর্বল খাত অর্থনীতি
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান দেখা গেছে ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ’ সূচকে। এই খাতে স্কোর গত বছরের ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। এর ফলে ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ গত বছরের ১৪১তম স্থান থেকে পিছিয়ে ১৪২তম স্থানে নেমে গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে যেখানে পুরুষেরা বছরে গড়ে ১২ হাজার ৪৪০ ডলার আয় করেন, সেখানে নারীদের গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৬৭০ ডলার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। ২০০৬ সালে আয়ের সমতা ছিল ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এ বছর ১৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে।
শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক পর্যায়ে নারীদের হার মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে এই হার ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
ড. নাজনীন বলেন, ‘বাংলাদেশ নারীদের শিক্ষায় সফলতা পেয়েছে, কিন্তু আমাদের অর্থনীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেই মানবসম্পদকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না। এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে জেন্ডার বৈষম্য দূর করা শুধু সমতার জন্যই নয়, বরং উৎপাদনশীলতা, কাঠামোগত রূপান্তর এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।’
নারীরা এগিয়ে শিক্ষায়
জেন্ডার বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে শিক্ষায়। এ বছর ‘শিক্ষায় অর্জন’ সূচকে বাংলাদেশ রেকর্ড ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়ের অনুপাত সমান হলেও উচ্চশিক্ষা ও সাক্ষরতার হারে এখনো কিছুটা বৈষম্য রয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষায় নারীদের ভর্তির হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং পুরুষদের ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। নারীদের সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের হার ৮১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বড় পতনের কারণ
বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থানে বড় পতনের মূল কারণ ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ সূচকে অবনতি। গত বছর এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৭২ দশমিক ১ শতাংশ, যা এ বছর একলাফে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে এই সূচকে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান তৃতীয় থেকে ১২তম স্থানে নেমে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদে নারীদের আসন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এযাবৎকালের সর্বনিম্ন স্কোর। এ কারণে এই সূচকে বাংলাদেশ ১৩৯তম স্থানে নেমে গেছে।
তবে মন্ত্রিসভায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব বর্তমানে ১৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। সম্প্রতি কিছুটা অবনতি হলেও গত দুই দশকে মন্ত্রিসভায় জেন্ডার সমতা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ২০০৬ সালে এই স্কোর ছিল মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা এখন ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য খাতে পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত
‘স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কাল’ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৬ সালে ৯৬.০ শতাংশ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তালিকায় ১২০তম স্থানে রয়েছে, গত বছর যা ছিল ১২৩তম।
এই স্কোরের পেছনে বড় কারণ সুস্থ আয়ুষ্কালে সমতা (৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ)। নারীদের ক্ষেত্রে সুস্থ আয়ুষ্কাল গড়ে ৬৩ বছর এবং পুরুষদের ৬৩ দশমিক ১৪ বছর। জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতও প্রায় সমতার কাছাকাছি রয়েছে।
তবে মাতৃমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যানে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১১৫ জন এবং মাত্র ৫৯ শতাংশ সন্তান প্রসব দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। মোট প্রজনন হার নারীপ্রতি ২ দশমিক ১৪ জন। এ ছাড়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হন।
শীর্ষে আইসল্যান্ড, তলানিতে চাদ
বিশ্বের সবচেয়ে সমতাপূর্ণ দেশ হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। এরপরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নামিবিয়া ও যুক্তরাজ্য।
তালিকার একেবারে তলানিতে রয়েছে আফ্রিকার দেশ চাদ, যারা মাত্র ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ বৈষম্য দূর করতে পেরেছে। চাদের ঠিক ওপরেই রয়েছে ইরান ও পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূচকটি চালুর পর থেকে বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য এখন সবচেয়ে কম। বিশ্বব্যাপী ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ বৈষম্য দূর হয়েছে। তবে উন্নতির এই গতি খুবই ধীর। এই হারে চলতে থাকলে পৃথিবীতে নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতা অর্জন করতে আরও অন্তত ১২০ বছর সময় লাগবে।
