ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলায় ব্যবহৃত কামিকাজে ড্রোনের উৎপাদন বাড়াতে কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে রাশিয়া।
রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের একটি পরিকল্পনা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম পলিটিকো।
পলিটিকোর হাতে আসা নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার তাতারস্তানে রোসাটমের আলাবুগা-ভলোকনো কারখানা সম্প্রসারণ করা হবে। এতে ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে অতিরিক্ত ৫০০ টন সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী অ্যারোস্পেস কার্বন ফাইবার তৈরি করা যাবে। ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে এই হালকা ও শক্ত উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।
এক বিশেষজ্ঞের হিসাবে, এই বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা বছরে আরও ২৮ হাজার অস্ত্রবাহী ড্রোন তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। এতে এ ধরনের ড্রোনের বর্তমান উৎপাদন ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
পলিটিকো জানায়, চলতি মাসে পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে হামলাসহ ইউক্রেনে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত অনেক ড্রোনও একই ধরনের।
ইউক্রেনের হিসাবে, রাশিয়া বর্তমানে বছরে ৩৬ হাজারের বেশি ‘গেরান’ কামিকাজে ড্রোন তৈরি করতে পারে।
পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনা রাশিয়ার যুদ্ধে অস্ত্রবাহী ড্রোনের ওপর বাড়তি নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরে। এসব ড্রোন এখন ইউক্রেনের পাশাপাশি ইউরোপের অন্য দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ।
আলাবুগা-ভলোকনো কারখানা এবং রোসাটমের উন্নত উপকরণ বিভাগ উমাটেক্স যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
পলিটিকো এর আগে রোসাটমের অভ্যন্তরীণ শিপিং ও কাস্টমস নথির ভিত্তিতে জানিয়েছিল, চলতি বছরের শুরুতে কারখানাটি চীনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪৬ টন কার্বন ফাইবার তৈরির রাসায়নিক পেয়েছিল।
রোসাটম পলিটিকোকে বলেছে, প্রতিষ্ঠানটি ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা ‘পুরোপুরি মেনে’ পরিচালিত হয়।
ওয়াশিংটনে থাকা চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, রাশিয়ার ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তারা জানে না। তবে তারা বলেছে, আইন অনুযায়ী দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
পলিটিকো জানায়, রাশিয়ার বিভিন্ন সূত্র থেকে কারখানাটির সম্প্রসারণ, নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছে ইউক্রেন সরকারের ঘনিষ্ঠ কিয়েভভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টার।
তবে রোসাটম এসব নথি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়না নথিগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলো আসল বলে নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউক্রেন সরকারের এক কর্মকর্তাও পলিটিকোকে নথিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
মে মাসে রুশ সরকার আলাবুগা-ভলোকনো কারখানায় নতুন একটি উৎপাদন লাইন তৈরির জন্য রোসাটমের পরিকল্পনা অনুমোদন করে। সরকারি অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, নতুন লাইনটি বছরে ৫০০ টন পর্যন্ত কার্বন ফাইবার তৈরি করতে পারবে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবিতে বর্তমান কার্বন ফাইবার কারখানার পাশে সম্প্রসারণের জন্য জমি পরিষ্কার করতে দেখা গেছে।
ইউক্রেনিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টারের ছবিতেও প্রকল্পের কাজ এগোনোর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট আগস্টে ওই এলাকার স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করেন।
তিনি পলিটিকোকে বলেন, নতুন কারখানার ভিত্তি তৈরির কাজ চলছে। ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ শেষ করতে হলে নির্মাণকাজ দ্রুত এগোতে হবে।
সেন্টার ফর অ্যা নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক ও সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের কার্যালয়ের উপদেষ্টা স্টেসি পেটিজন বলেন, ড্রোনের মাধ্যমে রাশিয়া ইউক্রেনের গভীরে ব্যাপক হামলা চালাতে পারছে।
একইসঙ্গে এসব হামলা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। তার মতে, এটি রাশিয়ার জন্য ‘খুব কার্যকর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার’।
ইউক্রেনিয়ান সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন সেন্টারের প্রধান সেরহি কুজান বলেন, এই সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, পুরো ইউরোপের জন্য উদ্বেগের।
তিনি বলেন, ‘আলাবুগা ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণকে শুধু ইউক্রেনীয় ফ্রন্টের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে পুরো ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত।’
চীন থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে রাশিয়া দেশে কার্বন ফাইবার উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এ বছরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় ‘আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে চায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোসাটমের নথি অনুযায়ী, আলাবুগা-ভলোকনো কারখানা এই উদ্যোগে ভূমিকা রাখবে। কারখানাটি সম্প্রসারণের অন্যতম কারণ হলো ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের আমদানি প্রতিস্থাপন’। আরেকটি কারণ হলো বিমান ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মতো কৌশলগত খাতে কার্বন ফাইবারের চাহিদা পূরণ।
অলব্রাইটের হিসাবে, কারখানাটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে ২৮ হাজার শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। রাশিয়ার গেরান-২ ড্রোন ইরানের শাহেদ ড্রোনের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
অলব্রাইট বলেন, ‘কার্বন ফাইবার ছাড়া তারা ড্রোন তৈরি করতে পারে না।’
ড্রোনের ওজন কম রাখতে এর বিকল্প ব্যবহার করাও রাশিয়ার জন্য কঠিন। ড্রোনের ডানা, জ্বালানি ট্যাংক ও ইঞ্জিনের মতো অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্ত করতে কার্বন ফাইবার ব্যবহার করা হয়।
তার মতে, রাশিয়া প্রতিরক্ষা খাতের সব প্রয়োজন মেটানোর মতো পলিঅ্যাক্রিলোনাইট্রাইল টো বা ‘প্যান-প্রিকারসর’ পাচ্ছে না। উচ্চমানের কার্বন ফাইবার তৈরিতে ব্যবহৃত এই উপাদানের আমদানিনির্ভরতা কমাতেই কারখানাটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোসাটমের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনায় আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি নতুন ‘আধুনিক প্যান প্ল্যান্ট’ তৈরির কথা বলা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, এর প্রধান পণ্য হবে ‘ইউএমটি৪২এস-৩কে গ্রেডের কার্বন ফাইবার’। এটি অ্যারোস্পেস শিল্পে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হবে।
নথির মেটাডেটা অনুযায়ী, গত বছরের শেষ দিকে রোসাটমের উন্নত উপকরণ বিভাগ উমাটেক্সের এক কর্মী এটি তৈরি করেছিলেন।
আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি ড্রোন ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে রাশিয়ার হামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কুজান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ সীমিত করা, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা এবং এই কমপ্লেক্সের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়াকে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় অংশীদারদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার ‘হাইব্রিড আগ্রাসন’ সরাসরি উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া যাচাই করতেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। রুশ ড্রোনের পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
রাশিয়া গেরান ড্রোনের নকশায় এখন জেট ইঞ্জিনও যুক্ত করেছে। এতে ড্রোনগুলো আরও দূরে ও দ্রুত আঘাত হানতে পারছে।
কুজানের সতর্কবার্তা, আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তৈরি ড্রোন ভবিষ্যতে ইউরোপে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটনে রাশিয়ার দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার মধ্যেও ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের কোনো লক্ষণ না থাকা এবং ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে রাশিয়ার হামলা বাড়ার মধ্যে নিউইয়র্কে এ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন বসছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ গত সপ্তাহে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা আবার শুরু করতে প্রস্তুত মস্কো।
তবে কার্বন ফাইবার কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর ল্যাভরভের বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সিএসআইএসের ইউরোপ, রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক নিকোলাস ফেন্টন।
পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে সেপ্টেম্বরে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ড্রোন হামলা এবং ইউরোপে নাশকতাসহ বিভিন্ন ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ ঘটনা রাশিয়ার সংঘাত বাড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে মনে করেন ফেন্টন।
তিনি বলেন, ইউক্রেন নিয়ে কোনো কূটনৈতিক সমাধান হলেও ন্যাটো বা ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক অবস্থান কমবে বলে তারা মনে করেন না। পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাতে রাশিয়ার বর্তমান নেতৃত্ব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ হিসেবে বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে মস্কো ও কিয়েভে পাঠান। পরে উইটকফ অনলাইনে লেখেন, ওই সফরে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সময় নির্ধারণসহ ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে।
তবে মার্কিন দূতেরা মস্কো ছাড়ার এক দিন পর রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কিয়েভে পাঁচজন নিহত হন। এরপরও ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় রাশিয়ার ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ফেন্টন বলেন, ‘রাশিয়া আকাশযুদ্ধে গতি অর্জন করছে, এসব ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে এবং উৎপাদনও বাড়াচ্ছে। সামনে কী আসতে পারে, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে।’
