রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানের (২৪) মৃত্যুর ঘটনায় ৯ লাখ টাকার একটি আপসনামা সামনে এসেছে।
নিহতের পরিবারের সঙ্গে এই আপসনামা করা হলেও, এর মাধ্যমে ফৌজদারি মামলার আইনি পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার পর ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে আদালতে হাজির করা হলে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। তবে তাকে গাড়ির চালক হিসেবে মামলায় উল্লেখ করা হয়নি।
দুর্ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজে ওই কিশোরকে চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা যায় বলে পুলিশের ফরোয়ার্ডিং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা আপসনামায় বলা হয়েছে, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন আকাশ মারাক (৪৪) এবং কিশোরটি তার পাশের সিটে ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে করা আপসনামা কি মামলা নিষ্পত্তির জন্য যথেষ্ট? পরিবার মামলা তুলে নিতে চাইলে কী হবে? আর আপস অযোগ্য অপরাধে এমন আপসের কী আইনি প্রভাব রয়েছে?
ফৌজদারি অপরাধে আপসের আইনি বিধান এবং বাস্তব প্রয়োগের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আইনে কিছু অপরাধকে আপসযোগ্য বা কম্পাউন্ডেবল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত নিয়ম মেনে আপস করা সম্ভব। সাধারণ আঘাতের মতো কিছু মামলা চলাকালে বাদী ও বিবাদী আপস করলে আদালতের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি করা যায়।
তবে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে দাফন-কাফন, সহায়তা বা অন্য কোনো কারণে অর্থের বিনিময়ে আপসনামা করা হলেও সেটির সরাসরি আইনি ভিত্তি থাকে না।
তবে অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের বক্তব্যে বিষয়টির আরেকটি দিকও উঠে এসেছে। আইনগতভাবে আপসের সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে গুরুতর মামলায় অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা হতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থ বা প্রলোভনের মাধ্যমে নিহতের পরিবারকে রাজি করানোর পর মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদেরও প্রভাবিত করা হতে পারে। পরে তারা আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারেন বা বৈরী হয়ে যেতে পারেন। এতে মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হয়ে আসামির খালাস পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরও অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত করার প্রবণতা থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফৌজদারি মামলায় আপসের নামে অর্থ লেনদেনকে তিনি আলাদা বিষয় হিসেবে দেখেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে এ ধরনের অর্থ লেনদেন ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক বিষয়। এটিকে ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতির সরাসরি আইনি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায় না।
বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় নিহত হন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। তার বড় ভাই মুক্তাদির ইসলাম ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় মামলা করেন।
পুলিশের ভাষ্য, স্থানীয় লোকজন গাড়িতে থাকা কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।
ডেইলি স্টারের হাতে আসা আপসনামায় ৯ লাখ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ টাকা দাফন-কাফন ও আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠানের জন্য এবং ৮ লাখ টাকা নিহতের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভবিষ্যতের জন্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, অপরাধ সংগঠিত হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ধারা ৯৮ ও ধারা ১০৫, যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে দণ্ডবিধির ধারা ৩০৪বি। উল্লেখ্য, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ধারা ৩৪৫ অনুযায়ী সংগঠিত অপরাধটি আপস অযোগ্য।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যেকোনো ক্রিমিনাল কেস হচ্ছে নন-কম্পাউন্ডেবল। আর এটা যেহেতু মার্ডার কেস, এটা কম্প্রমাইজ করার কোনো সুযোগই নাই।’
ফৌজদারি মামলায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা তুলে নিতে পারবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পারবে না।’
৯ লাখ টাকা দেওয়ার ফলে ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতির সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর, ‘না, কোনো সুযোগ নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্রিমিনাল অফেন্স রাষ্ট্রের বিপক্ষে অফেন্স, এটা শুধু ব্যক্তির বিপক্ষে না।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ডেইলি স্টারকে জানান, সড়ক আইনে মামলা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। এই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ধারাগুলো আপস অযোগ্য হওয়ায় আদালত এ ধরনের আপস গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
আপসটি যদি ভয়ভীতি বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে করা হয়, তাহলে সেটিকেও প্রকৃত আপস বলা যায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফৌজদারি মামলায় নিহতের পরিবার এফআইআর করলেও মামলার বাদী রাষ্ট্র উল্লেখ করে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, পরিবার নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে চাইলেই মামলা তুলে নিতে পারে না।
তার ভাষ্য, ‘ভুক্তভোগীর পরিবার শুধু এফআইআর করে। মামলার প্রকৃত বাদী রাষ্ট্র।’
এ আপসনামাকে তিনি ‘ব্যক্তিগত সমঝোতার কাগজ’ বলে মন্তব্য করেন। ‘এর মাধ্যমে কেউ ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না,’ বলেন তিনি।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর একাদশ অধ্যায়ের ‘অপরাধ, বিচার ও দণ্ড’ অংশে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা সম্পত্তির ক্ষতির ক্ষেত্রে দণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের একটি ধারায় নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়া ও বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিংয়ের ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি হলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আদালত অর্থদণ্ডের পুরোটা বা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন।
আর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা কারও প্রাণহানি হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধকে দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক বিধানের অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে গুরুতর আহত বা মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে এগুলো আইনে নির্ধারিত দণ্ডের বিধান, এই মামলায় দেওয়া কোনো সাজা নয়।
মামলাটির বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। আর কিশোরটির ভূমিকা নিয়েও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
