চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আজ সোমবার শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের নোবেল মৌসুম। ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন নিয়ে গবেষণা এবারের নোবেল পুরস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছে এএফপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ছয়টি বিভাগে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান, বুধবার রসায়ন, বৃহস্পতিবার সাহিত্য, শুক্রবার শান্তি এবং ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।
আজ বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। নোবেল পুরস্কার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ বছর এমন গবেষণা পুরস্কৃত হতে পারে, যা ওজন কমানোর ওষুধ ‘ওজেম্পিক’ ও ‘মাউনজারো’ তৈরির পথ সুগম করেছে।
ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্ল্যারিভেটের গবেষণা বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ডেভিড পেন্ডলবেরি এএফপিকে বলেন, ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিভিন্ন গবেষণা এবার নোবেল পেতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে শরীরের মাইক্রোবায়োম নিয়ে গবেষণা, তৃপ্তি ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী লেপটিন ও ঘ্রেলিন হরমোনের আবিষ্কার এবং খাবার গ্রহণের পর অন্ত্র থেকে নিঃসৃত ‘গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১’ বা জিএলপি-১ হরমোন নিয়ে গবেষণা। ওজেম্পিকের মতো ওষুধ জিএলপি-১-এর কার্যক্রম অনুকরণ করে।
পেন্ডলবেরির মতে, এসব গবেষণার যেকোনো একটির স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। তবে তিনি জিএলপি-১ গবেষণাকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখছেন। কারণ হিসেবে তিনি এর ‘বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চিকিৎসাগত প্রভাবের’ কথা উল্লেখ করেন।
এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের মধ্যে কানাডার হরমোন বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল ড্রাকার, ডেনমার্কের চিকিৎসক ইয়েন্স জুল হোলস্ট এবং যুগোস্লাভিয়ায় জন্ম নেওয়া মার্কিন রসায়নবিদ স্বেতলানা মোইসভের নাম নিয়মিত আলোচনায় আসছে।
ত্বকের পুনর্জন্ম নাকি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল অন্য কোনো ক্ষেত্রেও যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুইডেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসআরের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদক আনিকা ওস্টমানের মতে, ত্বক কীভাবে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং ক্ষত সারিয়ে তোলে—এ নিয়ে স্টেম সেল গবেষণাও পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন কোষবিজ্ঞানী এলেইন ফুকস ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফিওনা ওয়াটকে অগ্রগণ্য গবেষক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
আরেকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হলো ‘অপটিক্যাল কোহেরেন্স টমোগ্রাফি’ নামের নতুন একটি ইমেজিং প্রযুক্তি। আলো প্রতিফলনের মাধ্যমে শরীরের টিস্যুর উচ্চ-রেজল্যুশনের ক্রস-সেকশনাল ছবি তৈরি করে এই অ-আক্রমণাত্মক প্রযুক্তি। বিশেষ করে চোখের রেটিনা ও অপটিক নার্ভ পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে এটি ব্যবহৃত হয়।
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় ‘অ্যাডহিশন রিসেপ্টর’ নিয়েও গবেষণা নোবেলের জন্য বিবেচিত হতে পারে। মার্কিন ইমিউনোলজিস্ট টিমোথি স্প্রিংগার এসব রিসেপ্টর শনাক্ত করেন।
এসব রিসেপ্টর রোগ প্রতিরোধকারী কোষকে রক্তনালির সঙ্গে যুক্ত হতে এবং আক্রান্ত টিস্যুতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। প্রদাহজনিত ও অটোইমিউন রোগের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণাতেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া স্তন ক্যানসার নিয়ে গবেষণা কিংবা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সহায়ক ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির গবেষণাও এবার নোবেল পেতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
সাহিত্যে নারী লেখক?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান ও বুধবার রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হবে। বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম।
সাহিত্যে গত বছর হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই নোবেল পাওয়ার পর এবার কোনো নারী লেখককে পুরস্কৃত করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ।
সাহিত্য সমালোচক লিনা কালমটেগ এএফপিকে বলেন, আর্জেন্টিনার লেখক সামান্তা শেভলিন সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন।
এ ছাড়া অ্যান্টিগুয়া-আমেরিকান লেখক জামাইকা কিনকেইড, চীনা লেখক ক্যান শুয়ে, অস্ট্রেলিয়ার জেরাল্ড মারনেন ও অ্যালেক্সিস রাইট, যুক্তরাষ্ট্রের টমাস পিনচন এবং মেক্সিকোর ক্রিস্তিনা রিভেরা গারসার নামও আলোচনায় রয়েছে।
শান্তিতে কার হাতে নোবেল?
এবার সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুক্রবার ঘোষিত হতে যাওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার। নোবেলের একমাত্র পুরস্কার হিসেবে এটি নরওয়ের রাজধানী অসলোতে দেওয়া হয়।
গত বছর ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এ কারণে এবার তুলনামূলকভাবে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে—এমন কোনো প্রার্থীকে বেছে নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাচাদো তার পাওয়া নোবেল পদক ট্রাম্পকে উপহার দেন। এবারও ট্রাম্প পুরস্কারের দিকে নজর রাখবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্তিয়ান বের্গ হার্পভিকেন এএফপিকে বলেন, এই পুরস্কারকে ঘিরে সবসময়ই ব্যাপক তদবির থাকে এবং কখনো কখনো কমিটির ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টাও হয়। তবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিটি অভ্যস্ত।
এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবার সঙ্গে যৌথভাবে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর নাম রয়েছে। রাশিয়ার দখল করা অঞ্চল থেকে বেআইনিভাবে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন কুলেবা।
সুদানে যুদ্ধ ও ক্ষুধার দ্বৈত সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবীদের বিশাল নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর যাওয়ার পর সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ বা সিপিজেকেও নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে ২০২৬ সালের নোবেল মৌসুম।
