সৌদি বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

সৌদি আরবে ক্রমেই বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম বড় উৎস দেশটির ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে ভ্রমণ, শ্রম অভিবাসন ও হজ-ওমরাহ মতো বিষয়গুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা তো আছেই।

রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বশেষ হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর ফলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছে।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় মোট ১২ জন নিহত এবং আরও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে রিয়াদ বিমানবন্দরে পাঁচ বার হামলা হয়েছে। এতে বিমানবন্দরের স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থগিত রাখতে হয় ফ্লাইট ওঠানামা কার্যক্রম।

শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানায়, রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট অবতরণ বন্ধ আছে। ফলে ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকা-রিয়াদ রুটে চলাচলকারী অন্যান্য এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও বিঘ্নিত হয়েছে।

রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে।

সৌদি আরব বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। অন্যদিকে, ওমরাহ পালন এবং হজের মৌসুমে বার্ষিক হজযাত্রার জন্য জেদ্দা ও মদিনা গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।

গত আগস্টে বেবিচক চেয়ারম্যানের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১১ লাখ বাংলাদেশি সরাসরি ফ্লাইট ছাড়াও সৌদি আরব ভ্রমণ করেছেন। তবে এই সংখ্যাটি কোন সময়কালের, তা উল্লেখ করা হয়নি।

দুই দেশ গত আগস্টে সাপ্তাহিক সরাসরি যাত্রীবাহী ফ্লাইটের সংখ্যা ৪৯ থেকে বাড়িয়ে ৮৪ করতে সম্মত হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে এখনই এই ফ্লাইটগুলো পরিচালিত হবে। সক্ষমতা বৃদ্ধির এই নীতিগত সিদ্ধান্তে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল সৌদি আরব। দেশটি থেকে ওই অর্থবছরে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের অর্থবছরে সংখ্যাটি ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্সের পরিমাণকে এয়ারলাইনসের আয় বলা যায় না। তবে দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ সচল রাখার সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে।

সৌদি আরবে যারা যাত্রা করেন, তাদের অনেককেই নিয়োগকর্তার বেঁধে দেওয়া শর্ত কিংবা ভিসার শর্ত মেনে চলতে হয়। পাশাপাশি, অনেকে সেখানে যাওয়ার আগে অস্থায়ী বাসস্থানের ভাড়া আগেই পরিশোধ করে থাকেন।

ফলে যাত্রায় বিলম্ব হলে বা ফ্লাইট বাতিল হলে তারা বাড়তি সমস্যায় পড়েন।

শুধু রিয়াদ নয়, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলেও নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাতে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে হামলা হয়।

জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দাম্মামও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে যাওয়ার জন্য মূলত এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেন যাত্রীরা।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো আমাদের বাহিনীর সামরিক অভিযানের ক্ষেত্র।’

তিনি উল্লেখ করেন, শুধু পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনাকে হামলার আওতার বাইরে রাখা হবে। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ শুধু রিয়াদে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

৯ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) রিয়াদে হামলার পর সৌদি আরবের আকাশসীমা নিয়ে তাদের সতর্কতার আওতা বাড়িয়েছে।

সংস্থাটি এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদি আরবের আকাশসীমার আরও কিছু অংশ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

সংশোধিত নির্দেশনায় দুটি নির্ধারিত এলাকা এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়। এর মধ্যে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি নতুন এলাকা রয়েছে।

জেদ্দা ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়নের অন্যান্য অংশে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ওপিএসগ্রুপ আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি তাদের সদস্যদের সৌদি আরবের পুরো আকাশসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

বিকল্প অবতরণের গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করার কথাও বলেছে তারা।

দ্য ডেইলি স্টার পর্যালোচনা করা ফ্লাইট-ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের হামলার আগেই বাংলাদেশ-সৌদি রুটে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন দেখা দিয়েছিল। তবে প্রতিটি ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়নি।

সৌদিয়ার ঢাকা-রিয়াদ রুটের এসভি৮০৫ ফ্লাইটটি ৮ অক্টোবর বাতিল হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

একই ফ্লাইট ৬ অক্টোবর প্রায় ছয় ঘণ্টা দেরিতে চলেছিল।

সর্বশেষ হামলা শুরুর আগে ৩ ও ৪ অক্টোবরও এক ঘণ্টার বেশি বিলম্বের তথ্য পাওয়া যায়।

ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে জেদ্দাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট গতিপথ পরিবর্তন করে মদিনায় অবতরণ করে। পরে সেটি গন্তব্যে পৌঁছায়। তবে কেন গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর সৌদিয়ার ঢাকা-জেদ্দা রুটের এসভি৮০৯ ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের ৪২ মিনিট পর ছেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রশ্ন তুলছে, বিমানবন্দরে হামলা বা আশপাশের আকাশসীমায় বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে চলাচলকারী এয়ারলাইনসগুলো কীভাবে তাদের সেবা চালু রাখবে।

চলমান পরিস্থিতিতে বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণের সুযোগ, যাত্রীদের নতুন ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দেওয়া, সাময়িক আবাসন-সহায়তা ও আকস্মিক বিঘ্নের সময় যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য প্রস্তুতি থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন হলে জ্বালানি খরচ, উড়োজাহাজের কার্যকারিতা, ক্রুদের কর্মঘণ্টা এবং পরবর্তী ফ্লাইটের সময়সূচির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

সর্বশেষ প্রাণহানি ও ফ্লাইট স্থগিতের ঘটনা দেখাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে দুই দেশের উড়োজাহাজ সংস্থা ও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কীভাবে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Related Articles

Latest Posts