চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ মানেই যেন শেষ বাঁশি বাজার আগপর্যন্ত কোনো কিছুর নিশ্চয়তা নেই। যত কঠিন পরিস্থিতিই হোক, হারের মুখ থেকে ফিরে আসার অবিশ্বাস্য সব গল্প লিখতে জুড়ি নেই স্প্যানিশ পরাশক্তিদের। রোমার মাঠে আরও একবার দেখা গেল সেই চিরচেনা রিয়ালকে। ৮১ মিনিট পর্যন্ত ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি শেষ আট মিনিটে তিন গোল করে জিতে নিল ৪-৩ ব্যবধানে। স্তাদিও অলিম্পিকোতে হতাশার রাতটাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো রিয়ালের আরেকটি স্মরণীয় ইউরোপিয়ান মহাকাব্যে।
রোমার মাঠে শুরু থেকেই রিয়ালের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। মাঝমাঠে বলের দখল রেখে খেলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, দিয়োমান্দে ও কিলিয়ান এমবাপের গতিকে কাজে লাগানোর দিকেই বেশি মনোযোগ ছিল তাদের। জুড বেলিংহামের দায়িত্ব ছিল লম্বা পাসে আক্রমণভাগের এই তিন ফুটবলারকে খুঁজে নেওয়া। রক্ষণে সহায়তার জন্য এমবাপে ও ভিনিসিয়ুসকে নিচে নামতে হলেও দিয়োমান্দেকে রাখা হয়েছিল তুলনামূলক ওপরে।
রিয়ালের এই কৌশল বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি রোমার। শুরু থেকেই ওপরে উঠে প্রেসিং করতে থাকে ইতালিয়ান দলটি। তাতে রিয়ালের আক্রমণ গড়ে তোলার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। হোসে মরিনিওর দলকে চাপে রেখে একের পর এক আক্রমণে থিবো কোর্তোয়াকে ব্যস্ত রাখে স্বাগতিকেরা।
রোমার সেই আধিপত্যের পুরস্কার আসে ২০ মিনিটে। ডি রুনের জোরালো শট মালেনের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করলে বিভ্রান্ত হন কোর্তোয়া। বল জড়িয়ে যায় জালে। ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রোমার এগিয়ে যাওয়াটা ছিল প্রাপ্যই।
তবে রিয়ালের আক্রমণভাগে যখন এমবাপের মতো ফুটবলার থাকেন, তখন ম্যাচের মোড় ঘুরতে খুব বেশি সময় লাগে না। পাঁচ মিনিট পরই সেটি মনে করিয়ে দেন ফরাসি তারকা। মাঝমাঠে বল পেয়ে এগিয়ে গিয়ে বক্সের কিনারা থেকে শট নেন তিনি। মানচিনির পায়ে লেগে বলের দিক বদলে যাওয়ায় কিছুই করার ছিল না গোলরক্ষক গোলিনির। ম্যাচে নিজেদের প্রথম লক্ষ্যে রাখা শটেই সমতায় ফেরে রিয়াল।
গোলটি কিছুক্ষণের জন্য রোমার ছন্দ নষ্ট করলেও দ্রুতই আবার আক্রমণে ফেরে তারা। স্বাগতিকদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান কোর্তোয়া। একের পর এক সেভে রিয়ালকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন বেলজিয়ান গোলরক্ষক। অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণে কয়েকবার রোমার বক্সে বিপদ তৈরি করলেও পরিষ্কার গোলের সুযোগ পাচ্ছিল না রিয়াল। শেষ পর্যন্ত ১-১ সমতায় বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আবার বিপর্যয়ে পড়ে রিয়াল। মাঝমাঠে ভিনিসিয়ুসের অপ্রয়োজনীয় ভুলে বল পেয়ে যান মালেন। বক্সের ভেতর থেকে তার নেওয়া শট আটকাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ফেদেরিকো ভালভের্দে। কিন্তু উল্টো তার পায়ে লেগে বল উঁচু হয়ে কোর্তোয়ার মাথার ওপর দিয়ে জালে ঢুকে যায়। ৫১ মিনিটে আবার এগিয়ে যায় রোমা।
ছয় মিনিট পর ব্যবধান আরও বাড়ান মালেন। ৫৭ মিনিটে তার গোলটি প্রথমে অফসাইডের কারণে বাতিল করা হলেও ভিএআর পর্যালোচনায় সিদ্ধান্ত বদলায়। স্কোরলাইন হয়ে যায় ৩-১। তখন রোমার জয়ই মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফেরার জন্য একের পর এক পরিবর্তন আনেন মরিনহো। নিষ্প্রভ ভিনিসিয়ুস ও ডামফ্রিসকে তুলে নামান এন্দ্রিক ও আরদা গুলেরকে। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচের মতো আবারও ফুলব্যাকের দায়িত্ব নিতে হয় ভালভের্দেকে। পরে আক্রমণের ধার বাড়াতে গুলেরের সঙ্গে ডাবল পিভটে নামানো হয় বের্নার্দো সিলভাকে।
হারানোর আর কিছু ছিল না রিয়ালের। তাই রক্ষণ সামলে রাখার চিন্তা বাদ দিয়ে সব শক্তি নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। তাতেই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের দৃশ্যপট।
৮২ মিনিটে মরিনিওর বাজিমাত হয়ে ওঠেন এস্পি। তার গোলে ব্যবধান কমিয়ে ৩-২ করে রিয়াল। সহকারী রেফারি প্রথমে অফসাইডের পতাকা তুললেও ভিএআর পর্যালোচনায় গোলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
এরপরই যেন চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই অপ্রতিরোধ্য রিয়ালের আবির্ভাব। তিন মিনিটের ব্যবধানে আবারও রোমার জালে বল পাঠান এন্দ্রিক। ৮৫ মিনিটে তার গোলে স্কোরলাইন ৩-৩। কিছুক্ষণ আগেও নিশ্চিত জয়ের স্বপ্ন দেখা রোমা তখন সমতা ধরে রাখতেই মরিয়া।
কিন্তু রিয়ালের প্রত্যাবর্তনের গল্পে তখনো শেষ অধ্যায় লেখা বাকি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে গোল করে সেই গল্পের নায়ক হয়ে ওঠেন আন্তোনিও রুডিগার। ৯০ মিনিটে জার্মান ডিফেন্ডারের গোলে ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে যায় রিয়াল। শেষ আট মিনিটে তিন গোল, তিনটিই সেট পিস থেকে!
