খেলাধুলার বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম যেসব খেলার অনুমোদন দেয়
.
ইসলাম সব ধরনের খেলাধুলাকে নিষেধ করে না। ইসলাম অনেক খেলাধুলাকে বৈধ মনে করে। ব্যক্তির যেমন এসব খেলাধুলার প্রয়োজন আছে, তেমনি সমষ্টিরও প্রয়োজন আছে। তবে খেলাধুলার উদ্দেশ্য হবে নিছক মনতুষ্টি কিংবা হাস্যরস অথবা বিনোদন। আমরা ইতোপূর্বে গান এবং রসিকতা বৈধ হওয়া সম্পর্কে যেসব আলাচনা করেছি এবং ইমাম গাযালি ও ইবনে হাযম প্রমুখের যেসব অভিমত উদ্ধৃত করেছি, তা সবই এসব খেলাধুলা সম্বন্ধেও প্রাসঙ্গিক। বরং এমন কিছু খেলাধুলাও আছে, ইসলাম যাকে উৎসাহিত করে। যেমন— যেসব খেলা শরীরচর্চার অন্তর্ভুক্ত কিংবা সামরিক কুচকাওয়াচের আওতাভুক্ত সেগুলোকে ইসলাম উৎসাহিত করে। কারণ, এসবের মাধ্যমে শারীরিক কসরত হয়, অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় এবং কায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
.
হাদিস শরিফে তির নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় ইত্যাদিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে— শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে বেশি প্রিয়।
.
ইসলাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এই দুটি ঈদের দিন মুসলিমদের উপহার দিয়েছে এমন দুটি দিনের বিপরীতে, যে দুুদিন আনসাররা খেলাধুলা করত।
.
নবি কারিম সা. তাঁর মসজিদে ঈদের দিন হাবশিদের তির-বল্লম নিয়ে খেলাধুলা ও কসরত করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাদের উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আরফাদার ছেলেরা সামনে এগিয়ে চলো”Ñ যা আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি।
.
ইসলাম যেসব খেলা নিষিদ্ধ করে
.
ইসলাম কিছু কিছু খেলাধুলা সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। যেসব খেলা ইসলামের উদ্দেশ্য ও বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, সে খেলাধুলা সম্পর্কে নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করে। যেমন—
.
১. যেসব খেলাধুলায় বিনা প্রয়োজনে এমন সব কসরত পরিবেশন করা হয়, যাতে কারও মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন— রেসলিং; এতে নিজেকে এবং অপরকে বিনা প্রয়োজনে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করা হয়।
.
২. যেসব খেলায় নারী দেহের এমন সব অঙ্গের প্রদর্শন করা হয়, পরপুরুষের সামনে যা খোলা রাখা তাদের জন্য বৈধ নয়। যেমন— সাঁতার ইত্যাদি। নারীরা যদি এসব খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায়, তাহলে তাদের জন্য আলাদা খেলার স্থান ও সাঁতারের স্থান থাকা অবশ্যক, যেখানে কোনো পুরুষ থাকবে না। আর তাও রুচিশীল পোশাক পরে খেলবে।
.
৩. যেসব খেলায় সত্যি সত্যি জাদু থাকে, তা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারণ, জাদু সাতটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই তা শেখা, চর্চা করা ও প্রদর্শন করা হারাম বিবেচিত হবে।
.
৪. যেসব খেলাধুলায় ধোঁকা-প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করার ব্যবস্থা থাকে। যেমন— জুয়া, লটারি ইত্যাদি।
.
৫. যেসব খেলায়ধুলায় পশু-পাখিকে নানান রকমের কষ্ট দেওয়া হয়। যেমন— মোরগের লড়াই, গরু বা ষাড়ের লড়াই ইত্যাদি। রাসূল সা. থেকে সহিহ সনদে পশু-পাখির মধ্যে লড়াই দিতে নিষেধবাণী বর্ণিত আছে। সুতরাং যেসব খেলাধুলায় নিরীহ পশু-পাখির রক্ত ঝরানো হয়, তা দেখে আনন্দ উপভোগ করা মানুষের জন্য বৈধ হতে পারে না। হাদিসে এসেছে— “যে অপরের প্রতি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।”
.
৬. যেসব খেলাধুলা কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল, সেসবের বিধান নিয়ে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন— লুডু খেলা। মিশরে একে টেবিল খেলা বলা হয়। তা ছাড়া যেসব খেলায় মানুষের মেধা খোলে, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ হয়; যেমন— দাবা। এ খেলাগুলো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতানুসারে কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ। সেসব শর্ত ইসলামে হালাল হারামের বিধান ও ফতোয়ায়ে মুয়াসারা নামক গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে আলাচনা করেছি।
.
৭. যেসব খেলায় জুয়া আছে, সেগুলো অবৈধ। কারণ, জুয়াকে কুরআনে মদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে— তা নাপাক ও শয়তানের কারসাজির ফল।
.
৮. যেসব খেলাধুলায় মানুষের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়, তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়, তাকে অন্যের হাসি-তামাশায় টার্গেট বানানো হয়— তাতে ব্যক্তিবিশেষকে টার্গেট করা হোক কিংবা দল বা গোষ্ঠী বিশেষকে টার্গেট করা হোক তাও অবৈধ। যেমন— অন্ধ, ল্যাংড়া, কালো অথবা পেশাবিশেষের লোকদের টার্গেট করে বিদ্রুপ করা হয় তাও অবৈধ। তবে দেশের সাধারণ প্রথানুযায়ী যতটুকু সমর্থনযোগ্য তা বৈধ হবে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَومٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّن نِّسَاء عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ
“হে মুমিনগণ! কেউ যেন অপর কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ না করে, হতে পারে সে তার চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের নিয়ে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে সে তার চেয়ে উত্তম।” সূরা হুজুরাত : ১১
.
৯. খেলাধুলায় অতিরঞ্জন বৈধ নয়। কারণ, খেলাধুলা সৌন্দর্যবর্ধক জিনিসের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তা প্রয়োজনীয় কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া বাঞ্চনীয় নয়। আর যদি তা জরুরি কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে, তাহলে কী হুকুম হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
.
সব বৈধ কাজ বৈধ হয় অতিরঞ্জন পরিহারের শর্ত সাপেক্ষে। কারণ, আল্লাহর তায়ালা অতিরঞ্জনকারীকে পছন্দ করেন না। তেমনিভাবে তা বৈধ হয় এ শর্তে যে, তা কোনো দুনিয়াবি কিংবা দ্বীনি ওয়াজিব কর্ম ব্যাহত করতে পারবে না।
.
মুসলিম সমাজ ও মুসলিম ব্যক্তির কাছে কাম্য হচ্ছে, তার কাছে কাঙ্ক্ষিত জিনিসের মধ্যে যেন সে ভারসাম্য রক্ষা করে। তারা যেন প্রত্যেক বিষয়কে তার অধিকার যথাযথভাবে দেয়।
.
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বিশেষ খেলা সমগ্র খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ওপর প্রধান্য লাভ করলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর খেলাধুলা কারও জীবনে অতি প্রভাবক হয়ে ওঠবে অথবা খেলার অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে কিংবা আল্লাহর ইবাদতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবেÑ তা হতে পারে না। খেলাধুলা কোনোভাবেই পৃথিবী আবাদ ও মানুষের অধিকার রক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে না।
.
কিন্তু কোনো কোনো দেশে কখনও কখনও তা যেন পূজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়। মানুষ যেন তার পূজা করে। একজন খেলোয়াড় লক্ষ কোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়, কখনও মিলিয়ন বিলিয়ন টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়। অন্য দিকে চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী, লেখক, গবেষকরা ভাত-কাপড় পায় না। পায়ের ক্ষমতা যেন মাথার ক্ষমতায় চেয়ে বেশি। তাদের কার্যকলাপ প্রমাণ করে, মানুষের মূল্যায়ন নিম্নাঙ্গ নিয়ে, ওপরাঙ্গ নিয়ে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.