বোন ফুফু কন্যাদের বঞ্চিত করছেন না তো ?

আমার এক বন্ধু। যুক্তরাজ্য প্রবাসী। বেশ দীনদার। দান-সাদাকাও করেন হাত খুলে। দেশে এসে গ্রামে গেলে এক মামার বাড়িতে ওঠেন। মামাদের সাথেও বেশ ভালো সম্পর্ক। লক্ষ লক্ষ টাকা মামাদের পরিবারের জন্য অকাতরে ব্যয় করতে আমি নিজে দেখেছি। কিন্তু ইদানিং সেই মামাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। কারণ, সেই বন্ধু মামাদের কাছে তার মায়ের ওয়ারিস ক্লেইম করেছে।

তার এক মামাতো ভাইয়ের সাথে আমার অল্পবিস্তর জানাশোনা আছে। সে বলল—বলেন ভাই, এইটা করার কি ওনার কোনো দরকার ছিল? আমাদেরকে বিভিন্ন সময় উনি যে পরিমার টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন, তা ওই ওয়ারিসের জমির চেয়ে অনেকগুনে বেশি, কিন্তু উনি এই জমিটুকু এমন করছেন!

সে যে আশা নিয়ে আমার সাথে কথা বলেছিল সে আশার গুড়ে একটু বালিই পড়ল। আমি বললাম—এটা ওনার মায়ের প্রাপ্য অধিকার, এটা দিয়ে দাও। ইনফ্যাক্ট তোমরা দেওয়ারও কেউ না, কেবল বুঝিয়ে দাও। ওনার মা তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিক হয়েই আছেন।

আমার বন্ধুর একই কথা—আমার মায়ের ওয়ারিস বুঝিয়ে দিতেই হবে। এটা বুঝে নেওয়ার জন্য যদি জমির দামের একশ গুণও খরচ করতে হয়, আমি করব। এই দেশে মেয়েদেরকে ওয়ারিস বুঝিয়ে না-দেওয়ার যে কালচার, এটার বিরুদ্ধে এভাবেই আমার প্রতিবাদ হবে। এরপর আমি সেই মামাতো ভাইকে ওনার পারস্পেক্টিভটা বুঝিয়ে বললাম।

ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, এরপর তারা ফুফুর/বোনের সম্পদ বুঝিয়ে দিয়েছে। সেখানে জমির দামের দশগুণ বেশি ব্যয় করে আমার সেই বন্ধু একটা বাড়ি বানিয়েছে; তবে সেই বাড়িতে তার সেই মামারাই থাকেন।
আমি এই ভাইটাকে স্যাল্যুট জানাই। একই সাথে নিন্দা জানাই সেই সব লোকের; যারা বোন-ফুফু তথা নারীদেরকে তাদের ওয়ারিস বুঝিয়ে দেয় না। অনেক বকধার্মিক দেখেছি, যারা তাদের কথাবার্তায় এমন ভাব করে—যেন আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য রক্ত দিতে প্রস্তুত; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় বোনের সামান্য ওয়ারিস দিয়েও আল্লাহর বিধান কায়েম করতে প্রস্তুত না।

বোনদের ওয়ারসি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটিকে ক্রেডিবিলিটির একটা কোর ইস্যু মনে করা যায়। একজন মানুষের দীনি কমিটমেন্ট সত্যিকার অর্থে কেমন, সেটা এই প্যারামিটার দিয়ে অনেকটা যাচাই করা যায়। কারণ, মুখে কথার ফুলঝুরি ছুটানো দীনদারদের তো এই সমাজে কোনো অভাব নেই।

আজ এই পোস্ট যারা পড়ছেন, তাদের প্রত্যেককে আমি বলব—আজই বিষয়টা নিয়ে ভাবুন।

কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পর যে সকল বিষয় সবচেয়ে জরুরি, তার মধ্যে অন্যতম হলো তার ওয়ারিস বণ্টন; কিন্তু আমরা দাফন করে মনে করি শেষ; অনেকে তো চল্লিশা চেহলাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, কিন্তু ওয়ারিস বণ্টনের নাম মুখে আনি না। এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ওয়ারিস অবিভক্ত থেকে যায় এবং এগুলোর কারণে নানারকম পারিবারিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

ওয়ারিস বণ্টন না-করার ক্ষেত্রে ভাইদের অনিহাই বেশি দেখা যায়—বিশেষত বেশি বোন থাকলে। অনেক সময় মারা যাওয়ার পরপরই সম্পদ বণ্টনকে এক ধরণের স্বার্থপর চিন্তা ভাবা হয়। এটা মোটেই স্বার্থপর চিন্তা নয়, ঠিক যেমন স্বার্থপর চিন্তা নয় মাস শেষে বেতন প্রাপ্তি কামনা করা। আপনি যদি আপনার কোনো ভাইবোনের প্রতি সদয় হতে চান, ভালো কথা; কিন্তু ওয়ারসি বণ্টন স্থগিত রাখা সদয় হওয়ার কোনো নিদর্শন নয়। আপনি বণ্টন করে নিজেরটা বুঝে নেন, অন্যেরটাও বুঝিয়ে দেন। এরপর কেউ যদি কাউকে নিজের অংশ দান করে দিতে চান, সেই সুযোগ তো আপনার রয়েই যাচ্ছে।

আপনি আল্লাহর চেয়ে উদার হতে যাবেন না, এটা ভালো নয়। আল্লাহই আমাদের ভালো চেনেন। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাদের যতটা জানেন, আমরা নিজেরাও তা জানি না। যে কাজের মধ্যে আমাদের কল্যাণ রয়েছে, তিনি আমাদের কেবল সেই নির্দেশই দিয়েছেন।

আজকের সমাজে পশ্চিমা নারীবাদের আদলে গড়ে ওঠা যে ধরণের চিন্তার উত্থান দেখা যাচ্ছে, সেখানে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র আছে সন্দেহ নেই; তবে সেই ষড়যন্ত্র হালে পানি পাওয়া সহজ হতো না, যদি আমরা পুরুষরা নারীদেরকে ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে, সেটা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতাম। আর এই অধিকারের অন্যতম হলো উত্তরাধিকার। আপনারা যদি সত্যিই চান ঘৃণ্য পশ্চিমা নারীবাদের উত্থান ঠেকাতে, তা হলে নারীদের যে অধিকারগুলো ইসলাম নির্ধারণ করেছে, সেগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.