আমির খানের হজ্জ: একটি শিক্ষণীয় গল্প

২০১২ সালে আমির খান তার মা জিনাত হুসেনকে নিয়ে হজ্জে যান। আমির খানের মা হুইল চেয়ারে বসা ছিলেন। তিনি মায়ের হুইল চেয়ার ঠেলে মাকে হজ্জ করতে সহযোগিতা করেন।
ঠিক একই সময় হজ্জ করতে যান পাকিস্তানের দুই বিখ্যাত দাঈ- মাওলানা তারিক জামিল (হাফিজাহুল্লাহ) ও জুনায়েদ জামশেদ (রাহিমাহুল্লাহ)। মাওলানা তারিক জামিল একজন দা’ঈ হিশেবে সারা বিশ্বে বিখ্যাত। তিনি মানুষকে দ্বীনে ফেরানোর জন্য, অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিয়ে যান। তাঁর দাওয়াতের মেথোডলজি হলো তাঁর একটি কথার মতো-
“মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বিলাও। ঘৃণা তো আগে থেকেই বিরাজমান।”
মাওলানা এবার টার্গেট করলেন আমির খানকে ইসলামের দাওয়াত দিবেন। আমির খান যেহেতু হজ্জ করতে এসেছেন, তার মন-মানসিকতা দাওয়াতের উপযোগী, এই সময়ই তাকে দাওয়াত দিলে সেটা কার্যকর হতে পারে।
একজন দা’ঈ সবসময় সুযোগ সন্ধানী। তিনি মানুষের জন্য পেরেশানবোধ করেন, নিজে কিভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচবেন এবং মানুষকে কিভাবে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবেন এই নিয়েই তিনি সর্বদা ভাবেন। মানুষকে জাহান্নামে প্রেরণ নয়, জাহান্নামে যাওয়া থেকে আটকানোই থাকে তার লক্ষ্য।
কিন্তু, ভারতের একজন স্টার অভিনেতার সাথে ইচ্ছে করলেই তো আর দেখা করা যায় না। এর জন্য প্রটোকল লাগে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট দরকার হয়। মাওলানা তারিক জামিল মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানের ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদির সহযোগিতা নিলেন। দাওয়াতের ময়দানে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কারো কাছে দাওয়াত দিতে গেলে তার পরিচিত কাউকে সঙ্গে নিয়ে যান বা তার মাধ্যমে যান। এতে করে তার কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।
মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য আমির খানের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেয়া হয় মাওলানা তারিক জামিলকে। তিনি সাথে নিয়ে যান (এক সময়ে পাকিস্তানের বিখ্যাত রকস্টার, পরবর্তীতে যিনি দ্বীনে ফিরেন) জুনায়েদ জামশেদকে।
মাওলানা তারিক জামিল কলেজ লাইফ পর্যন্ত দ্বীনদার ছিলেন না। আর দশজন মুসলিম তরুণের মতো ছিলেন, দ্বীন সম্পর্কে জানাশোনা, আবেগ-উচ্ছ্বাস এতোটা ছিলো না। গান নিয়ে মজে ছিলেন। মুভি দেখতেন, মুভির খবর রাখতেন।
আমির খানের সাথে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হলো, তখন আমির খান বেশ আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। কখন জানি মাওলানা বলে উঠেন- ‘এসব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে দ্বীনে ফিরো, নতুবা জাহান্নামে যাবে’! মাওলানা তারিক জামিল আমির খানের চেহারা দেখে এমনটাই আঁচ করেন।
বলিউডের অন্যতম সেরা নায়কের সাথে বিশ্বের অন্যতম সেরা দা’ঈর কথোপকথন শুরু হলো। মাওলানা ইসলাম নিয়ে কোনো কথা না বলে কথা শুরু করলেন মুভি নিয়ে। ১৯৬০-১৯৭২ সালের বলিউডের (বুম্বাই) মুভির ইতিহাস পর্যালোনা করলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, এই সময়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে তিনি যতোটা জানেন, আমির খান ততোটা জানেন না। তিনি আলাপ শুরু করলেন নায়ক দিলিপ কুমার, রাজ কাপূর, মেহবুব সাব, মদন মোহনের।
আমির খানের চক্ষু চড়কগাছ! তিনি অবাক হয়ে শুনতে লাগলেন একজন মাওলানা তার সাথে ফিল্ম নিয়ে কথা বলছেন। তার ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সেই মাওলানা তারচেয়েও বেশি জানেন! (মাওলানার এই জ্ঞান ছিলো তার কলেজ বয়সের জ্ঞান)
এভাবেই কেটে যায় ৩০ মিনিট। মাওলানা বললেন, “সময় তো শেষ।” আমির খান বললেন, “তাহলে আসুন, ডিনার করে নিই।”
খাওয়া-দাওয়া শেষে স্বাভাবিক হতে লাগলো আরো প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট। এখনো মাওলানা ইসলাম নিয়ে টুঁ শব্দ করেননি। আমির খানের সাথে যখন মোটামুটি ভাব জমলো, আমি খান যখন বুঝতে পারলেন যে, মাওলানা দুজন তাকে জাহান্নামে পাঠানোর জন্য আসেননি, ঠিক সেই মুহূর্তে মাওলানা তারিক জামিল একটি প্রস্তাব করেন-
“আমির ভাই, আপনি তো আপনার মাকে নিয়ে হজ্জ করতে এসেছেন। আপনাকে কি আমি শুনাবো কিভাবে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জ করেছেন?”
আমির খান খুব উৎসাহ নিয়ে বললেন, “জ্বি, শুনান।”
মাওলানা নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জের ঘটনাগুলো শুনাতে থাকলেন, আমির খান গালে হাতে দিয়ে সুবোধ বালকের মতো বসে শুনতে লাগলেন। তন্ময় হয়ে শুনছিলেন। কোনো নড়াচড়া করলেন না। মাওলানা তারিক জামিল প্রায় ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট আমির খানকে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনা শুনালেন।
এই ঘটনা উল্লেখ করে মাওলানা একটি ওয়াজে মন্তব্য করেন-
“মানুষ ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত। আর আপনারা মানুষকে ভালোবেসে কাছে না টেনে ফতোয়া দিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।”
৩০ মিনিটের জন্য দেয়া সাক্ষাৎকার ৩ ঘন্টায় গিয়ে শেষ হয়। আমির খান সময়টা খুব উপভোগ করেন। মাওলানারা যখন চলে যাচ্ছেন, তিনি ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলে শুধু বিদায় দেননি, গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন।
যাবার সময় মাওলানা জিজ্ঞেস করেন, “হজ্জের পর আমরা আবার দেখা করি?” আমির খান বললেন, “জ্বি অবশ্যই।”
হজ্জ শেষে আমির খান চলে যান মদীনায়। মাওলানা ম্যাসেজ করে দেখা করার জন্য বললে তিনি জানান যে, তিনি মদীনায়। মাওলানা মদীনায় যান তার সাথে দেখা করতে। দেখা করার জন্য আমির খান যে সময় দিলেন, সেই সময়ে তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক ঘন্টা গেলো এলেন না। দুই, তিন ঘন্টা গেলো, তবুও এলেন না। মাওলানার সাথে থাকা জুনায়েদ জামশেদ অনেকটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “চলেন তো, যাই!”
কিন্তু, মাওলানা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ৬ ঘন্টা পর যখন আমির খান এলেন, তখন মাওলানা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি, কোনো রকমের বিরক্তি প্রকাশ করেননি। এভাবেই তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। মাওলানা নিয়মিত আমির খানের সাথে যোগাযোগ রাখেন, আমির খানও মাঝেমধ্যে তাঁকে ফোন দেন।
মাওলানা এখানে আরেকটি টেকনিক শেখান; যেটা তিনি সবসময় অনুসরণ করেন। সেটা হলো- কাউকে আগে কল দেবার আগে তাকে ম্যাসেজ দেয়া- ‘আপনি কি ফ্রি আছেন? কল দেবো?’ ম্যাসেজে ইতিবাচক সাড়া পেলে তবেই ফোন দেন, নতুবা সেই ব্যক্তি ফোন দেয় (একান্ত ইমার্জেন্সি কারণ ছাড়া এভাবেই অনুমতি নেয়া উচিত)।
আমির খানের সাথে মাওলানা তারিক জামিলের দাওয়াতের গল্পটি বলার পর তিনি একটি প্রচলিত প্রবাদ বলেন-
“একজন মদ্যপ, নেশাগ্রস্থকে (Drunk) ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া সহজ, কিন্তু মাটিতে পড়ে থাকা একজন মদ্যপকে টেনে তোলা অনেক কঠিন।”
এই কথাটি বেশ ওজনদার। একজন পাপী ব্যক্তিকে তার পাপের জন্য গালাগালি করা, অভিযুক্ত করা বেশ সহজ। কিন্তু, তাকে তার পাপের পথ থেকে বাঁচিয়ে আনা, উদ্ধার করাটা বেশ কঠিন। আমরা এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় ‘সহজ’ কাজটি করি। কোনো পাপীকে ভালো করার চেষ্টা না করে উল্টো তার পাপের জন্য কী শাস্তি হতে পারে তার লিস্ট ধরিয়ে দিই, পারলে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিই!

দুই.

একজন ফক্বীহর কাজ এবং একজন দা’ঈর কাজে মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। একজন ফক্বীহ হলেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। তিনি রোগীর জন্য ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন। অন্যদিকে, রোগীর রোগ সারানোর জন্য সার্বক্ষণিক তার পাশে থাকেন তার বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান কেউ না কেউ। তারা রোগীর সেবাযত্ন করেন, ওষুধ কিনে আনেন, খাবার খাইয়ে দেন।
একজন দা’ঈর কাজ রোগীর ঐ সেবাকারীর/সেবাকারীদের মতো। রোগীর যতো বড়োই অসুখ থাকুক না কেনো, তিনি তার সেবা করেন। একজন দা’ঈও তেমন। একজন ব্যক্তি যতোই পাপী হোক না কেনো, তার ব্যাপারে সবাই আশা ছেড়ে দিলেও একজন দা’ঈ কিন্তু আশা ছাড়েন না। তিনি ক্রমাগত দাওয়াত দিতেই থাকেন। তার দাওয়াতে মানুষ ফিরে আসুক বা না আসুক; দাওয়াতের কাজ তিনি চালিয়ে যান।
কিয়ামতের দিন অনেক নবী পুনরুত্থিত হবেন, যাদের অনুয়ারী ২ জন, ৩ জন, ৫-৭ জন। আবার এমন নবীও পুনরুত্থিত হবেন, যাদের কোনো অনুসারী থাকবে না। ঐ নবীর সারাজীবনের আহ্বানেও কোনো মানুষ সাড়া দেয়নি, এমন নবীও থাকবেন। তাই বলে তাঁদের দাওয়াত অকার্যকর হয়ে যায়নি। তাঁদের কাজ ছিলো আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। তারা সেই কাজটি যথাযথভাবে করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবনে বিভিন্ন রকম ভূমিকা পালন করেছেন। একজন দা’ঈ হিশেবে তাঁর ভূমিকা ছিলো চোখে পড়ার মতো মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানো তথা ইসলাম গ্রহণের দাওয়াতের জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাওয়াতের জন্য পেরেশানির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:
“হয়তো তুমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজেকে শেষ করে দেবে; যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান না আনে।” [সূরা কাহাফ ১৮:৬]
রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, মানুষের জন্য দুশ্চিন্তা করে তাঁর জীবন যায়-যায়। একজন মুসলিম মাত্রই এমন চিন্তা লালনকারী। সে আরেকজন মুসলিমকে পাপ কাজে লিপ্ত দেখে আনন্দিত হবে না, সে আরেকজন মুসলিম জাহান্নামের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেখে খুশি হবে না; তার বরং দুঃখ হওয়া উচিত, ঐ মুসলিমের জন্য তার আফসোস হওয়া উচিত।
প্রত্যেক মুসলিম একেকজন মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফচ্ছির হতে পারবে না, ইসলাম এমনটা চায়ও না, এটা বাস্তবসম্মতও না। তবে, প্রত্যেক মুসলিম একেকজন দা’ঈ হতে পারে। সে যেকোনো মানুষকে হিকমাহর সাথে দ্বীনে আহ্বান জানাতে পারে। যারা নিয়মিত নামাজ পড়ে না, তাদেরকে নামাজের জন্য বলতে পারে। আচার-ব্যবহার দ্বারা, জ্ঞান দ্বারা সে অমুসলিমকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারে।
একজন দা’ঈকে প্রো-এক্টিভ হতে হয়। ইসলামের মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে অনেকক্ষেত্রে তাকে ‘ছাড়’ দিতে হয়। এই ছাড়া দেয়াটা হীনমন্যতা থেকে নয়, বিশেষ পরিস্থিতে মানুষকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য।
মনে করুন, এলাকার একজন ভালো ফাস্ট বোলার আছে। সে নামাজ পড়ে না, ইবাদাতের দিকে তার তেমন মনোযোগ নেই। অন্যদিকে ঐ সমাজে একজন দা’ঈ আছেন। ছোটোবেলায় তিনি বেশ ভালো ক্রিকেট খেলতেন। এখন খেলা বাদ দিয়েছেন, তবুও আত্মবিশ্বাস আছে যে ব্যটিং করতে নামলে বেশ ভালো করতে পারেন।
তিনি একদিন এলাকার ঐ ফাস্ট বোলারকে নামাজের দাওয়াত দিতে গেলেন। সে বললো, “হুজুর, আমাকে দাওয়াত দিয়ে লাভ নাই। আপনি আমার সাথে খেলবেন? আমি এক ওভার বোলিং করবো, আপনি একটি ছক্কা মারতে পারলে আমি আপনা-আপনি আপনার সাথে নামাজ পড়তে আসবো। খেলবেন?”
ঐ অবস্থায় দা’ঈ কী করবেন? তার আত্মবিশ্বাস আছে যে, তিনি ওভারে অন্তত একটি ছক্কা মারতে পারবেন। ছক্কা মারলে সে কথামতো নামাজ পড়তে যাবে। তার উচিত হলো সুযোগটি গ্রহণ করা। এখানে ক্রিকেট খেলা হারাম কিনা, এভাবে বাজি ধরা ঠিক হবে কিনা ঐসব দেখে তিনি পারবেন না। পুরো বিষয়টিকে একজন ফক্বীহর চোখে না দেখে একজন দা’ঈর চোখে দেখবেন। এই জায়গায় তাকে দা’ঈর ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রুকানা নামের এক কুস্তিগীরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। সে ইসলাম গ্রহণের আগে শর্ত জুড়ে দিলো- রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাথে কুস্তি লড়তে হবে। যদি তাকে হারাতে পারেন, তবেই সে ইসলাম গ্রহণ করবে।
রুকানা ছিলো অপরাজিত কুস্তিগীর। তাকে কেউ কখনো হারাতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর সম্মানিত নবী। তিনি কি একজন কুস্তিগীরের সাথে কুস্তি লড়বেন?
ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রুকানার সাথে কুস্তি লড়লেন এবং তাকে পরাজিত করলেন। অবশেষে রুকানা ইসলাম গ্রহণ করলেন। রাদিয়াল্লাহু আনহু। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/১৯৯, সুনানে আবু দাউদ: ৪০৭৮]

তিন.

একজন লোক একবারে নামাজই পড়ে না। সারাদিন মুভি দেখে, গেইম খেলে, ফেসবুকিং করে কাটায়। তার কাছে একজন দা’ঈ ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলো, নামাজ পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করলো। কিন্তু সে বায়না ধরলো- প্রতিদিন এতো ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারবে না, সর্বোচ্চ ২-১ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।
এটা শুনে একজন দা’ঈর উচিত না তাকে ফেলে আসা। তাকে এটা বলারও দরকার নাই যে- ‘২-১ ওয়াক্ত নামাজ দিয়ে কী হবে? পড়লে ৫ ওয়াক্ত পড়বা, না পড়লে নাই!’
সে যে ২-১ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে আগ্রহী হয়েছে, এটাই বেশ। তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, গিফট দেয়া। এতে করে আস্তে আস্তে এক-দুইমাস পর দেখা যাবে সে এমনিতেই নামাজী হয়ে যাবে। তাকে আর তখন বলা লাগবে না যে, নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো। তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে হবে, সঙ্গ দিতে হবে শুধু।
কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করতো, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক খুশি হতেন। তিনি তো কাফিরদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন। সেখানে কেউ যদি ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়, তাঁর তো খুশি হবারই কথা।
একটি ব্যতিক্রম এবং খুব কম আলোচিত ঘটনার উদাহরণ দিই।
সাকিফ গোত্র রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাইয়াত দেবার সময় দুটো শর্ত জুড়ে দেয়। শর্ত দুটো হলে- তারা যাকাত দিবে না এবং জিহাদ করবে না। অর্থাৎ, ইসলামের অন্যতম দুটো রুকন তারা পালন করবে না। ঘরের ভেতরের কেউ এমন শর্ত দেবার সুযোগ নেই বা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু, যারা এখনো ঘরে প্রবেশ করেনি, তারা ইসলামের দুটো রুকন পালন না করার শর্ত দিচ্ছে!
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি করবেন? তাদের বাইয়াত গ্রহণ করে ইসলামের ঘরে প্রবেশ করার সুযোগ দিবেন? নাকি কোনো কম্প্রোমাইজ করবেন না, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো ছাড় দিবেন না?
আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বাইয়াত গ্রহণ করে নিলেন! এই দুটো রুকনকে কি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের জন্য মাফ করে দিয়েছেন? তাদেরকে আর সেগুলো মানতে হবে না, এমন কিছু? না, এমন কিছু না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের ব্যাপারে ছিলেন অপটিমিস্টিক (আশাবাদী)।
তিনি বলেন,
“যখন তারা মুসলিম হয়ে যাবে, তখন অচিরেই তারা যাকাত দিবে এবং জিহাদেও যোগদান করবে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৩০২৫]
অর্থাৎ, তারা ইসলামের ঘরে ঢুকতে চাচ্ছে, তাদেরকে তাড়িয়ে দেবো কেনো? তারা ঘরে প্রবেশ করুক, আস্তে আস্তে ইসলামের সৌন্দর্য দেখুক, তখন এমনিতেই তারা সেগুলো পালন করবে। তখন দেখা যাবে তাদেরকে আর বলে দিতে হচ্ছে না। এই আশাবাদ নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাকিফ গোত্রের বাইয়াত গ্রহণ করেন।
আরেক লোককে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইসলাম গ্রহণ করতে বললেন। কিন্তু, তিনি বললেন, “ইসলাম আমার অপছন্দ।”
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ লোককে বললেন,
“অপছন্দ হলেও ইসলাম গ্রহণ করো।” [মুসনাদে আহমাদ: ১১৬৫০]
সেই ব্যক্তি একটি শর্ত জুড়ে দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে চাচ্ছিলেন না মূলত এতো ওয়াক্ত নামাজ তিনি পড়তে পারবেন না এজন্য। তিনি শর্ত দিলেন, মাত্র দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার শর্ত মেনে নিলেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। [মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৬]
ইসলামের ঘরে প্রবেশ করানোর জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাময়িক শিথীলতা মেনে নিয়েছেন এজন্য যে, ঘরে প্রবেশ করার পর ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধি করে তারা সবগুলো বিধান মানবে এই আশায়।
আমাদের সমাজে, বিশেষ করে ফেসবুকে অযোগ্য ফক্বীহদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তারা অনেকাংশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, কিন্তু আরেকজনের ভুল ধরায়, আরেকজনকে কিভাবে ইসলাম থেকে বের করে দেয়া যায়, কিভাবে জাহান্নামে পাঠানো যায় এই নিয়ে ব্যস্ত। তারা না হতে পারছে ভালো দা’ঈ, না হতে পারছে ভালো ফক্বীহ। কারণ, একজন ভালো ফক্বীহ মাত্রই একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি জানেন একজন দা’ঈ কতোটা উদার হতে পারবে। কিন্তু, ফেসবুকীয় আমার মুসলিম ভাইয়েরা অন্যের ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত রুক্ষ স্বভাবের।
জীবন্ত সাধারণ কোনো পাপীর পাপাচার দেখে আশা হারালে হবে না। তাকে নিয়েও আশাবাদী হতে হবে যে, তাকে ঠিকমতো দাওয়াত দিলে সে ফিরে আসতে পারে। তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেবার দায়িত্ব আল্লাহ আমাকে-আপনাকে দেননি। ৯৯ টি খুনের অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকেও আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন!
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে বলা হতো-
‘খাত্তাবের গাধাটি ইসলাম গ্রহণ করলে করতে পারে, কিন্তু উমর ইসলাম গ্রহণ করবেন না!’
সেই উমরও (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করেন, দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদ পান।
লেখাটি শেষ করছি বনী ইসরাঈলের দুজন লোকের ঘটনা দিয়ে।
বনী ইসরাঈলের এক লোক ছিলো আমলদার, আরেক লোক ছিলো পাপী। আমলদার লোকটি পাপী লোকটিকে বিভিন্ন সময় উপদেশ দিতো, তাকে পাপ কাজ পরিহার করতে বলতো। কুরআনের ভাষায় এই ধরণের কাজকে বলে- ‘নাহি আনিল মুনকার’ বা মন্দ কাজে নিষেধ করা।
যথারীতি আমলদার লোকটি একদিন পাপী লোককে উপদেশ দিচ্ছিলো। পাপী লোকটি ক্ষ্যেপে গেলো! সে বললো, “আমাকে আমার রবের উপর ছেড়ে দাও। তোমাকে আমার উপর পাহারাদার করে পাঠানো হয়েছে?” অর্থাৎ, তার আর ভালো কথা শুনতে ভালো লাগছে না। সে বলতে চাচ্ছে- ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’।
পাপী লোকটির এমন কথা শুনে আমলদার লোকটি উল্টো ক্ষ্যেপে গেলো। সে শুধু ক্ষ্যেপে গেলোই না, একটি জাজমেন্টাল কথা বললো। সে বললো, “আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না। তোমাকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।”
এমন কথা তো আমরাও বলি, তাই না? কোনো পাপী লোককে দেখলে আমরাও তো কনক্লুশনে পৌঁছে যাই, এই লোকটি জান্নাতে যেতে পারবে না।
তো, ঐ দুই লোকের মৃত্যু হয়। আল্লাহর নিকট দুজন হাজির হয়। আল্লাহ আমলদার লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কাছে যা আছে, সেটার উপর আমি ক্ষমতাবান নাকি তুমি ক্ষমতাবান?” অর্থাৎ, তুমি যে বললে ঐ লোকটি জান্নাতে যাবে না, সেটা বলার তুমি কে? তোমার কাছে কি জান্নাত-জাহান্নামের ক্ষমতা? তোমাকে কি ঠিক করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে?
আল্লাহ পাপী লোকটিকে বললেন, “তুমি আমার রহমতের জান্নাতে প্রবেশ করো।” অন্যদিকে আমলদার লোকটির উদ্দেশ্যে আল্লাহ বললেন, “একে জাহান্নামে নিয়ে যাও।”
পুরো উল্টো হয়ে গেলো না? পাপী লোকটি জান্নাতে গেলো আর আমলদার লোকটি জাহান্নামে গেলো। পাপী লোকটির আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ছিলো। অথচ আমলদার লোকটি নিজের আমলের উপর এতো বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলো যে, আরেকজনও যে জান্নাতে যেতে পারে, সেটা সে সহ্য করছে না। তার অহংকার তাকে জাজমেন্টাল বানিয়েছে। পাপীকেও আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন, এটা যেনো সে সহ্য করতে পারছে না। কে জান্নাত-জাহান্নামে যাবে এটা নির্ধারণ করার ‘দায়িত্ব’ আল্লাহ কোনো মানুষকে দেননি, কিন্তু ঐ আমলদার লোকটি এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে আরেকজনের ব্যাপারে মন্তব্য করেছে। তার এমন অযাচিত মন্তব্যের পরিণামে সেই বরং জাহান্নামে যায়!
হাদীসটি বর্ণনা করে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
“সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন! সে (আমলদার লোকটি) এমন উক্তি করেছে, যার ফলে তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে গেছে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০১]

আমির খানের হজ্জ: একটি শিক্ষণীয় গল্প
আরিফুল ইসলাম
১১ জুলাই ২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published.