মুমিনের আখলাক-ইয়াসির ক্বাদি

অন্যের সম্মান রক্ষা

যখন একজন মুমিন শুনতে পায় তার আরেকজন ভাই-বোনকে অপমান করা হচ্ছে, তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা হচ্ছে, তখন সে বসে থাকতে পারে। সে চুপ থেকে শুনে যেতে পারে না। সে প্রতিবাদ করে। ঐ ভাই-বোনের সম্মান রক্ষার জন্য সে দাঁড়িয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের মান-সম্মানের উপর আঘাত প্রতিরোধ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মুখমণ্ডল জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিরোধ করবেন।” [জামে আত-তিরমিজি: ১৯৩১]

আপনি শুনতে পেলেন আপনার কয়েকজন বন্ধু আরেক বন্ধুর অনুপস্থিতে তাকে নিয়ে মজা করছে, তার সম্মানহানী করছে কিংবা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আরেকজনকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। সেই জায়গায় আপনি ঐ অনুপস্থিত ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব। সবাই তাকে নিয়ে মজা করলেও আপনি সেই মজায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। একজন মুমিন হিশেবে আপনি এই কাজে বাধা দিবেন।

ঐ মজলিশে বা চ্যাট গ্রুপে যদি আপনি আরেকজনের সম্মান রক্ষা করেন, তাকে নিয়ে মজাকারীদের আলোচনা থামিয়ে দেন, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে আপনাকে প্রতিরোধ করবেন।

আপনি যদি অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সম্মান রক্ষা করেন, তাহলে দেখা যাবে আপনার অনুপস্থিতিতেও অন্য কেউ আপনার সম্মান রক্ষা করবে। আর আপনি যদিও সারাক্ষণ অন্যের সমালোচনা করতে থাকেন, অন্যকে নিয়ে গীবত করতে থাকেন, তাহলে কিভাবে আশা করেন আপনার অনুপস্থিতিতে আরেকজন আপনার সম্মান রক্ষা করবে? আপনার পক্ষে দাঁড়াবে?

ফিকহের কিতাবে কিছু মূলনীতি পাওয়া যায়। তারমধ্যে দুটো হলো:

• আপনি যা করবেন, তাই পাবেন

• পাপ-পুণ্য সেরকম হবে, আপনি যেরকম করবেন

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ মোট ২২ টি কিতাব লিখেন। তারমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সহীহ বুখারী। সহীহ বুখারীর পর দ্বিতীয় জনপ্রিয় ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’। এই কিতাবের একটি অনুচ্ছেদ হলো- ‘ভাইয়ের সম্মান রক্ষা’। সেই অনুচ্ছেদে তিনি একটি হাদীস উল্লেখ করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“কারো উপস্থিতিতে কোনো মুমিন ব্যক্তির গীবত করা হলে এবং সে তার অনুপস্থিতিতে মুমিনের সাহায্য করলে আল্লাহ তাকে এজন্য দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। (অন্যদিকে) কারো উপস্থিতিতে কোনো মুমিন ব্যক্তির গীবত করা হল এবং সে তার সাহায্য না করলে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে এর মন্দ ফল ভোগ করাবেন।” [আল-আদাবুল মুফরাদ: ৭৩৯]

আপনি সবার সাথে বসে আছেন। লোকজন অন্যের গীবত করছে, আপনি গীবত করছেন না, শুধু শুনছেন। এক্ষেত্রে আপনি যদি বলেন, “ভাই, এসব বাদ দিন। গীবত করে কী হবে? তারচেয়ে ভালো কথা বলি” তাহলে আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। অন্যদিকে, আপনি যদি সবার মতো শুনে যান, প্রতিবাদ না করেন, তাহলে এরজন্য দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাকে মন্দ ফল ভোগ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের ভাষণে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো খুতবা দেন। সেই খুতবায় হাজার-হাজার সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই খুতবায় বলেন:

“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত-সম্মান তোমাদের জন্য তেমনি সম্মানিত, যেমন সম্মানিত তোমাদের এই দিনটি, তোমাদের এই শহর এবং এই মাস।” [সহীহ বুখারী: ১৭৩৯]

সেই ভাষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে দেন যে, মুসলিমের কাছে মুসলিমের রক্ত, সম্পদ যেমন সম্মানিত, মুসলিম চাইলেই যেমন আরেকজনকে হত্যা করতে পারে না, সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারে না, তেমনি সে আরেকজন ইজ্জতের ওপর আঘাত করতে পারে না, সম্মানহানী করতে পারে না।

মুসলিম যখন দেখে আরেকজনের ইজ্জতহানী হচ্ছে, সে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। সে কথা বলে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার নামে যখন অপবাদ দেয়া হয়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুর (যার নামে অপবাদ দেয়া হয়) অতীতের ভালো গুণের কথা উল্লেখ করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবী ছিলেন মদ্যপায়ী। তাঁর নাম ছিলো আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। প্রায়ই মদপানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেয়া হতো। একবার তাকে শাস্তি দেবার সময় আরেকজন সাহাবী বললেন, “হে আল্লাহ! তার উপর আপনার লানত বর্ষণ করুন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাকে কতোবার যে আনা হলো!”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীর এমন উক্তির প্রতিবাদ করে বললেন:

“তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে।” [সহীহ বুখারী: ৬৭৮০]

একজন মদ্যপায়ী সাহাবীর ভালো গুণের প্রশংসা যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেন, তেমনি মদপানের জন্য তাকে শাস্তি দেন। অন্যরা তাকে লানত দিতে চাইলে তিনি সেই সাহাবীর পক্ষে কথা বলেন। তার সম্মান রক্ষা করেন।

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যাপারে অপবাদ দেয়া হয়। তিনি এই ঘটনা প্রথমে জানতেন না। তাঁকে যারা অপবাদ দেয়, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মিসতাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার দূর-সম্পর্কের আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যাপারে অপবাদ রটান।

একদিন মিসতাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মা আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, “মিসতাহর জন্য দুর্ভোগ!”

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বেশ অবাক হলেন। মা হয়ে উম্মু মিসতাহ তাঁর ছেলেকে বদ-দু’আ করছেন, অথচ আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মিসতাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সম্মান রক্ষা করছেন। তিনি বলেন:

“তুমি খুব খারাপ কথা বলছো। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন এক ব্যক্তিকে তুমি অভিশাপ দিচ্ছো!” [সহীহ বুখারী: ২৬৬১]

পুরো ঘটনা জানার পূর্বে তিনি মিসতাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সম্মান রক্ষা করেন। এটা ছিলো তাঁর স্বভাবজাত প্রতিক্রিয়া। তিনি একজন মুসলিমের সম্মানহানী হতে দিতেন না।

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে যারা অপবাদ দেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু।

অপবাদ আরোপের প্রায় বিশ পর একদিন হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে বেড়াতে যান। যে মানুষটি তাঁকে একসময় অপবাদ দিয়েছিলো, তাঁর সাথে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কেমন আচরণ করবেন? তাঁকে অপমান করে ঘর থেকে বের করে দিবেন? তাঁকে সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিবেন?

না। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সেগুলো না করে বরং মেহমানকে সম্মানের সাথে গদি বিছিয়ে বসতে দেন। প্রায় বিশ বছর আগে যে ব্যক্তি একজন পুত-পবিত্র নারীর চরিত্র নিয়ে অপবাদ দেন, সেই নারী সেটা ভুলে (Forgive & Forget) গিয়ে তাঁকে বসার জন্য আসন পেতে দিচ্ছেন?

উম্মুল মুমিনীন আয়িশার রাদিয়াল্লাহু আনহা ভাই ছিলেন আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বোনের এমন সহনশীলতা, উদারতা দেখে রাগ করলেন। বোনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তাঁকে গদির উপর বসতে দিলেন? আপনি কি ভুলে গেলেন তিনি আপনার চরিত্র নিয়ে অপবাদ দিয়েছিলেন?”

আপন ভাই মনে করিয়ে দিলেন। ভাই সত্য কথাই বলছে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা কি এবার আপন ভাইয়ের পক্ষালম্বন করে একজন মুসলিম ভাইকে তাঁর প্রায় বিশ বছর আগের কর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন? তিনি ভাইকে বললেন-

“হাসসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে কাফিরদের কবিতার জবাব দিতেন। এতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তরে শান্তি পেতেন। এখন তিনি অন্ধ হয়েছেন, আমি আশা করি, আল্লাহ আখিরাতে তাঁকে শাস্তি দিবেন না।” [তাহজীবু ইবনুল আসাকির: ৪/১২৯]

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আপন ভাইয়ের বিপক্ষে গিয়ে আরেকজন মুসলিম ভাইয়ের ইজ্জত হেফাজত করেন; যিনি কিনা তাঁর ইজ্জত নিয়ে একসময় অপবাদ দেন! তিনি হাসসান বিন সাবিতের রাদিয়াল্লাহু আনহু ইতিবাচক গুণের প্রশংসা করেন।

তাবুক যুদ্ধে নারী ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম ব্যতীত সবার জন্য অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিলো। সেই যুদ্ধে আজ প্রস্তুতি নেবো, কাল প্রস্তুতি নেবো বলে কা’ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সময়মতো প্রস্তুতি নিতে পারেননি। ফলে, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

যুদ্ধের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খোঁজ নিলেন কে কে এসেছে আর কে কে আসেনি। তখন খোঁজ পড়লো কা’ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর। একজন বলে উঠলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁর ধন-সম্পদ ও অহংকার তাঁকে আসতে দেয়নি।”

কা’ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুপস্থিতিতে তাঁর ব্যাপারে নিন্দা করলেন একজন সাহাবী। ঠিক সেই সময় আরেকজন সাহাবী তাঁর পক্ষে দাঁড়ালেন। তিনি হলেন মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বললেন:

“তুমি যা বললে, তা ঠিক নয়। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তাঁকে উত্তম ব্যক্তি হিশেবেই জানি।” [সহীহ বুখারী: ৪৪১৮]

একজন মুসলিম ভাইয়ের অগোচরে মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই ভাইয়ের নিন্দা করতে দিচ্ছেন না, তাঁর ব্যাপারে সুধারণা রাখছেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল অজুহাত খুঁজছেন, নিশ্চয়ই কা’ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর কিছু হয়েছে যার ফলে তিনি আসতে পারেননি। তিনি তো ভালো মানুষ, আমলদার ব্যক্তি। অহংকার করে পেছনে থাকা তাঁর কাজ না।

উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যা করা হয়। যারা তাঁকে হত্যা করে, তাদের এক সমর্থক একবার হজ্জ করতে মক্কায় আসে। সে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে কয়েকটি প্রশ্ন করলো।

“বদর যুদ্ধে উসমান অনুপস্থিত থাকেন, সেটা কি আপনি জানেন?”

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “হ্যাঁ, জানি।”

“উহুদের দিন উসমান যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান, এটা আপনি জানেন?”

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “হ্যাঁ, জানি।”

“বাইয়াতে রিদওয়ানে উসমান অনুপস্থিত ছিলেন, আপনি জানেন?”

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার বললেন, “হ্যাঁ, জানি।”

লোকটি যা চেয়েছিলো, তা পেয়ে গেলো। সে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে যেমন ধারণা রাখে, এটার সত্যতা পেলো। আনন্দের আতিশায্যে বললো, “আল্লাহু আকবার!”

এবার আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “এবার আসো, তোমাকে সেই কারণগুলো বলি।”

• বদর যুদ্ধে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুপস্থিতি থাকার কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন তাঁর স্ত্রো ও রাসূলের মেয়ে রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার দেখাশোনা করেন। কারণ, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মতো সওয়াব পাবেন, গণিমত লাভ করেন।

• উহুদের দিন তিনি পালিয়ে যান, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাদের ক্ষমাপ্রাপ্তি ঘোষণা করেন।

• আর বাইয়াতুর রিদওয়ানের কারণই ছিলো উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি মক্কায় গেলে গুজব রটলো, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে, উসমান হত্যার বদলা নিতে সবাই বাইয়াত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে বললেন, এটাই উসমানের হাত। তিনি রূপকার্থে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও সেই বাইয়াতে শরীক করেন। [সহীহ বুখারী: ৪০৬৬]

লোকটি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে যেসব অভিযোগ নিয়ে এসেছিলো, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু সেইসব অভিযোগের জবাব দেন এবং উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সম্মান রক্ষা করেন।

মানুষ সবসময় চায় বিতর্ক সৃষ্টি করতে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো বিশুদ্ধ ব্যক্তি, যাকে দেখে ফেরেশতারা লজ্জা পেতো, তাঁর ব্যাপারে পর্যন্ত মানুষ বিতর্ক করে, তাঁর সম্মানহানী করে। যখন আপনার-আমার বিরুদ্ধে কেউ কুৎসা রটাবে, তখন তাঁদের কথা ভাবতে পারেন। তারা আমাদের চেয়ে কতো উত্তম ছিলো। তবুও তাঁদেরকে নিয়ে মানুষজন দুর্নাম রটায়। কিন্তু, ইতিহাসের পাতায় তারা ঠিকই স্বসম্মানে আছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা অন্যের সম্মান রক্ষা করবো, ঠিক আছে। আমরা কি নিজের সম্মানও রক্ষা করবো? আমাদের ব্যাপারে যদি কেউ অভিযোগ করে, মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে, আমরা কি আত্মসম্মান রক্ষা করবো?

নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা থেকে আমরা এর উত্তর পাই। যখন তাঁর ব্যাপারে নারীরার অপবাদ দিয়েছিলো, তখন তিনি আত্মরক্ষা করেন, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। অন্যদিকে, তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে চুরির অপবাদ দিলে তিনি তাদের অপবাদের জবাবে কিছু বলেননি।

তারমানে বুঝা গেলো, আমাদের মানহানী হলে আমরা যেমন মান রক্ষার জন্য প্রতিবাদ জানাতে পারি, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে সেদিকে কান না দিলেও হবে। কোন ক্ষেত্রে কথা বলবো এবং কোন ক্ষেত্রে কথা বলবো না এতা মাথায় রাখতে হবে। সারাক্ষণ যদি নিজেকে আত্মরক্ষা করতে যাই, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে যাই, তাহলে আর কোনো কাজ করতে পারবো না।

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে এক লোক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালি দিলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আশেপাশে তখন সাহাবীরাও ছিলেন। লোকটি একবার গালি দিলো, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু বললেন না। দ্বিতীয়বার গালি দিলো, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখনও কিছু বললেন না।

লোকটি তৃতীয়বার গালি দিলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রতিশোধ নিলেন। তিনিও গালি দিলেন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি খুব রাগ করলেন। মজলিস থেকে চলে যেতে লাগলেন।

তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি আমাকে গালি দিলো, আপনি তখন বসা ছিলেন। কিন্তু, যখন আমি তার জবাব দিলাম, আপনি তখন রাগ করে চলে গেলেন!”

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যাপারটি বুঝলেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ কেনো করলেন?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন:

“(তোমাকে যখন গালি দেয়া হচ্ছিলো, তখন) আসমান হতে একজন ফেরেশতা নেমে ছিলেন এবং তোমার পক্ষ হয়ে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু, যখনই তুমি তার প্রতিশোধ নিলে, তখন শয়তান এখানে উপস্থিত হয়েছে। শয়তান এখানে উপস্থিত হওয়ায় আমি আর বসতে পারছি না।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৯৬, মুসনাদে আহমাদ: ৯৪১১]

আমরা যদি দেখি আরেকজনকে নিয়ে নিন্দা করা হচ্ছে, তার ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হচ্ছে, গীবত করা হচ্ছে, আমরা তখন তার পক্ষে কথা বলবো। এটা মুমিন হিশেবে আমাদের দায়িত্ব। মুমিন পাপ কাজ দেখে বসে থাকতে পারে না, পাপের কথা শুনতে পারে না। আপনি যদি গান শোনা হারাম বুঝতে পারেন, তাহলে যেমন গানের আসরে বসেন না, তেমনি গীবতকে হারাম বুঝলে সেই আসরেও বসবেন না, সেখানকার আলোচকদের গীবত বন্ধের চেষ্টা করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.