জীবনোপলব্ধি-মু. লাবিব আহসান

বিয়েটা হয়েছিল ভালোবেসে। অতঃপর? অনেক আবেগ, এক আকাশ স্বপ্ন আর হাজারো নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে সাথে নিয়ে চলতে শুরু করলো সংসার নামক গাড়িটির চাকা। ‘হাওয়ায় উইড়া উইড়া’ চলা নয়, ‘গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে’ টাইপ চলা। তবুও কোথাও একটা সুখের নহর প্রবাহিত হতো সবসময়, যেখান থেকে ধেয়ে আসা শীতল সমীরণ গভীর মমতার কোমল পরশ বুলিয়ে যেত যন্ত্রণাদগ্ধ ক্ষতস্থানে।

শাহেদ-রিয়া দম্পতির সবচেয়ে বড় শক্তিটা ছিল ভালোবাসার। কত লম্বা রাত তারা অনাহারে কাটিয়েছে, কিন্তু কেউ কারো প্রতি ওঠায় নি অভিযোগের অঙ্গুলি। বরং একসাথে মিলে কাটানো এই অন্ধকার সময়গুলোই তাদের কাছাকাছি এনেছে ততোধিক, বাড়িয়ে দিয়েছে পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ। বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের অবিরাম ঘুর্ণনের দৃশ্যটি দেখতে দেখতে ভেবেছে- একদিন তাদের জীবনভাগ্যের চাকাটিও এভাবে ঠিক ঘুরে যাবে।

শাহেদ এবং রিয়া তখনও জানে না- আরো অধিকতর নিকষ অন্ধকার এক সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। যে অন্ধকার তাদের দুজনকে চিরদিনের জন্য পরস্পরের থেকে আলাদা করে ছাড়বে। ভেঙ্গে খানখান করে দেবে তাদের স্বপ্নে গড়া সংসার। মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্যই সম্ভবত এটা- মানুষ তাদের ভবিষ্যত জানে না। ভবিষ্যত জানে না বলেই জীবন সুন্দর, রোমাঞ্চকর, রহস্যাবৃত।

পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেছিল শাহেদ-রিয়া। দুজনের কারো পরিবারই মেনে নেয়নি। ফলতঃ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তারা। বেছে নেয় অনিশ্চিত গন্তব্যে ধূসর যাত্রার পথ। সংকল্প করে দুজন মিলে জীবন কাটিয়ে দেবার। কিন্তু ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারে- যে জীবন তারা বেছে নিয়েছে, সে জীবন সহজ নয়। পরিবার নামক বটবৃক্ষটিকে হারিয়ে উপলব্ধি করতে শেখে বটবৃক্ষটির গুরুত্ব। এক নিঃসীম যন্ত্রণার কালোমেঘ ওড়াউড়ি করে তাদের হৃদয়াকাশ জুড়ে।

ঘটনাটি ঘটল এক বাদলামুখর সন্ধ্যায়। নবদম্পতিদের জন্য অতি প্রিয় এই মুহূর্তটিতেই গ্রেফতার হলো শাহেদ। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে কলাবাগান থানায়। আকাশ ভেঙ্গে পড়ল রিয়ার মাথায়। থানায় দেখা করতে গিয়ে শাহেদের ছলছল নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই রিয়া বুঝে নিলো- তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে, সে নিরপরাধ। শুরু হলো একজন একাকী নারীর সংগ্রামী জীবন।

টাকার কারণে শাহেদের পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেনি রিয়া। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিলো। দুটি জীবনের গতিপথ মোড় নিলো দুটি নতুন ধারায়। শাহেদবিহীন পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে রিয়াকে সাহায্য চেয়ে হাত বাড়াতে হলো বন্ধু সোহেলের দিকে। সোহেল রিয়ার জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করল। শাহেদের জামিনের জন্য উকিল নিয়োগের টাকারও যোগান দিলো সে।

রিয়া তখনও জানে না- প্রিয়তম জীবনসঙ্গীকে কারাগার থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করতে গিয়ে কখন অজান্তে নিজেই এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ওঠা-বসার সুবাদে সোহেল এবং রিয়া দুর্বল হয়ে পড়েছে পরস্পরের প্রতি। রিয়ার হৃদয়ের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা শাহেদের ছবিটি ধীরে ধীরে ম্লান হতে শুরু করেছে, সেখানে সন্তর্পণে জায়গা করে নিচ্ছে সোহেল।

যে ভয়ঙ্করের পথে রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে যে এক-আধবার অনুশোচিত হয়ে ওঠেনি মন, এমন নয়। কিন্তু একটা সময় গিয়ে আবিষ্কার করল- সোহেলকে ছেড়ে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব। তার জীবনে শাহেদ তখন কেবলই একটি ঢাউস আকারের প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে উঠেছে। তার জন্য হৃদয়ের গহীণ কোন্দরে কেবল কিছু করুণা জেগে ওঠে, অন্যকিছু নয়। মনের সবটা জায়গা জুড়ে তখন সোহেলের বসবাস।

সোহেলের সহযোগিতায় ছয় মাসের মাথায় আপিল করে কারাগার থেকে মু্ক্তি পেল শাহেদ। মুক্ত পৃথিবীতে এসে সে অনুভব করল- ছোট কারাগার থেকে বেরিয়ে সে বড় এক কারাগারে ঢুকে পড়েছে। আপাদমস্তক বদলে গেছে রিয়া। তার আচরণে আন্তরিকতার লেশমাত্র নেই। তার ভাবনার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে বসে আছে সোহেল নামের অনাহূত একজন। ছয় মাস আগে যে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন বুনেছিল দুজন মিলে, সে সংসার যেন অদূরে বসে উপহাস করছে শাহেদকে।

‘তোমার সঙ্গে সংসার করা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমি সোহেলকে ভালোবেসে ফেলেছি। ওর সঙ্গে বাকিটা জীবন কাটাতে চাই’- সাফ সাফ জানিয়ে দিলো রিয়া। শাহেদ এ কথার প্রত্যুত্তর দিয়েছে নিশ্চুপ থেকে। কিছু কথার জবাব মুখ দিয়ে যতটা দেয়া যায়, চুপ থেকে দেয়া যায় তার চেয়ে বহুগুণ। শাহেদ নেমে এসেছে রাস্তায়। তার মনে পড়ছে অনেক বছর আগে বলা রফিক ভাইয়ের কথাগুলো। পথে অবিরাম হাঁটতে হাঁটতে আওড়ে চলেছে সেসব স্মৃতিই।

ইসলামের পর্দাপ্রথা নিয়ে ঘোর আপত্তি শাহেদের। তার মনে হতো- পর্দার নামে ইসলাম যথেষ্ট বাড়াবাড়ি করেছে। চাচাতো-মামাতো ভাই-বোনরা পরস্পরের সঙ্গে মিশতে পারবে না, ছেলে আর মেয়ে একে অপরের বন্ধু হতে পারবে না; এসব কোনো কথা হলো? এ কেমন পশ্চাদপদ একটি ধর্ম! এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এসব অনাধুনিকতা কি বেমানান নয়?

সেদিন রফিক ভাই শতবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও মানতে চায়নি শাহেদ। আজ নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করতে পারছে- ইসলামের এই অনাধুনিকতাই ছিল সবচেয়ে বড় আধুনিকতা। পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো, পিতা-মাতার মনে কষ্ট দেয়া, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া; এসব কিছুই তো একসূত্রে গাঁথা। শাহেদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি ছিল সোহেলের সঙ্গে রিয়ার সম্পর্কে জড়ানো। বন্ধুর সঙ্গে অবাধে মিশতে গিয়েই তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে রিয়া।

এটিই কি তবে আল্লাহর বিধানের মাহাত্ম্য? তিনি তার বান্দাদের কষ্ট পেতে দিতে চান না বলেই কি ছেলে এবং মেয়ের অবাধ মেলামেশাকে শৃঙ্খলিত করে দিয়েছেন? অনেক বছর ধরে মনের অলিগলিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের উত্তরটি যেন শাহেদ নিজের ভিতর থেকেই পেয়ে গেল আজ। তার মনে পড়ল শেক্সপিয়রের সেই কথাটি- ‘I must be cruel, only to be kind.’

আল্লাহ মানুষকে ভালো রাখতে চান বলেই কি ‘পর্দা’ নামক রক্ষাকবচটি চাপিয়ে দিয়েছেন? প্রভুর প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিতে উত্তাল হয়ে উঠল শাহেদের হৃদয়সমুদ্র। তার মনে হলো- যে ভালোবাসা তাকে ছেড়ে চলে গেছে, তা ছিল নিকষ আঁধার মাত্র। সত্যিকার ভালোবাসার এক সুবিশাল মহাসমুদ্র নিয়ে কেউ একজন দূরে বসে আছেন। ভুল ভাবছে সে। দূরে নয়, কাছেই বসে আছেন। খুব বেশি কাছে বলেই আমরা তাঁকে দেখতে পাই না।

‘জীবনোপলব্ধি’/ মু. লাবিব আহসান

Leave a Reply

Your email address will not be published.