বাবা, স্বামী মারা গেছে পাঁচ বছর। ছেলে ঢাকায় থাকে, রিক্সা চালায়। এবার নাকি ইনকাম কম হয়েছে। তাই টাকাও পাঠিয়েছে কম। কোরবানি দেওয়ার সাধ্য নাই। কিন্তু সকাল থেকেই নাতির গরুর মাংস খাওয়ার আবদার মেটাতে এখানে আসা।
‘ঈদের দিন ছোট্ট মানুষটার মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমার ঈদ।’
কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব রহিমা বেগম। হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, চোখে-মুখে ক্লান্তি। তবু, ঠোঁটে একটুখানি হাসি। ঈদুল আজহার সন্ধ্যায় তিনি এসেছেন মৌলভীবাজার শহরের চাঁদনী ঘাটে।
এখানে প্রতি বছর ঈদের রাতে বসে এক অলিখিত মাংসের হাট—যেখানে কোরবানির উদ্বৃত্ত মাংস বিক্রি হয়, আর রহিমা বেগমের মতো মানুষেরা নাতি-নাতনির মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে ভিড় করেন।
এই হাট কোনো সরকারি আয়োজন নয়, কেউ ঘোষণা দিয়ে ডাকেনি—বছরের পর বছর ধরে মানুষ নিজেই এখানে এসেছে, আর এভাবেই তৈরি হয়েছে এক নীরব ঐতিহ্য।
বিকেলে থেকেই এখানে আসতে থাকেন মানুষেরা আর সন্ধ্যার আঁধার নামতেই চাঁদনী ঘাটে জ্বলে ওঠে টর্চ আর মোবাইলের আলো। একদিকে কোরবানির আনন্দে ভরপুর ঘর, অন্যদিকে যাদের সেই আনন্দ নেই—তাদের জন্য এই হাটটাই যেন ঈদের ছোট্ট একটা উপহার।
রহিমা বেগম আরও বলেন, ‘নাতিটার বয়স মাত্র পাঁচ। সকাল থেকে বলছে, দাদু গোস্ত খাইতাম, গোস্ত খাইতাম। পাড়ার সবার বাড়িতে কোরবানি হয়েছে, ওদের ঘরে মাংসের গন্ধ। আমার নাতি সেই গন্ধ পেয়েছে—তাই চাইছে।’
আবার থামলেন। এবার চোখের কোণ একটু ভিজে উঠল।
তিনি বলেন, ‘কী করব বলেন? কারো কাছে হাত পাততে পারি না। লজ্জা লাগে। শুনলাম এখানে একটু কম দামে পাওয়া যায়। তাই হেঁটে আসলাম। ছেলেটার মুখে যদি একটু হাসি ফোটাতে পারি—এটুকুই আমার ঈদ। আর কিছু চাই না।’
একই বাজারে রিপন মিয়া একটা পলিথিন ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ক্লান্ত মুখে হাসি। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে ভাগ দেওয়ার পরও কিছু থেকে গেছে। নষ্ট হতে দেব কেন? কেউ খেতে পারলে ভালোই তো।’
পাশেই দাঁড়ানো আব্দুল হামিদ সারাদিন বিভিন্ন বাড়ি থেকে অতিরিক্ত মাংস সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফ্রিজে জায়গা নেই, মাংসও রাখা যাচ্ছে না। তাই নিয়ে আসলাম।’
ক্রেতার সঙ্গে দরদাম চলছে—কেউ আড়াই হাজার বলছেন, কেউ দুই হাজারের নিচে নামতে চাইছেন। কিন্তু রাগ নেই, ঝগড়া নেই। ঈদের রাতে মানুষ যেন একটু বেশিই নরম থাকে।
ভিড়ের মাঝে তরুণ সজলকে দেখা গেল একা হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাগ সামলাতে। সে জানায়, ‘পাশের বস্তির পাঁচটি পরিবার তাকে বলেছিল তুমি যাও, আমাদের হয়েও একটু বিক্রি করে দিয়ে আসো। ওরা আসতে পারে না, লজ্জা পায়। আমি বিক্রি করে টাকাটা পৌঁছে দেব।’ মুখে কোনো অহংকার নেই—শুধু একটা সহজ মানবিক দায়িত্ববোধ।
তিন সন্তানের বাবা রিকশাচালক ইমরানও এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সবার সামর্থ্য তো সমান না ভাই। এখানে একটু কম দামে পাওয়া যায়, ছেলেমেয়েরাও মাংস খেতে পারবে।’ কথা বলতে বলতে চোখ দুটো একটু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার।
তবে অন্ধকার রাস্তায় খোলা মাংসের বেচাকেনা নিয়ে স্বাস্থ্যবিধির প্রশ্নটা থেকেই যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চান, কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিক—যেন মানবিক এই হাটটা আরো পরিচ্ছন্নভাবে চলতে পারে।
চাঁদনী ঘাটের এই মাংসের হাট আসলে কেবল বেচাকেনার জায়গা নয়। এটা ঈদের রাতে সামর্থ্যবানের উদ্বৃত্ত আর অসামর্থ্যবানের চাহিদার মাঝে তৈরি হওয়া এক নীরব সেতু—যেখানে কোরবানির ভাগটা একটু হলেও সবার কাছে পৌঁছে যায়।
