মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরপারের ভুকশিমইল এলাকার কৃষক দারাছ মিয়া। গত সপ্তাহে তিনি তার কয়েকটি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতিটি গরুর দাম পেয়েছেন ৪৫ হাজার টাকা। অথচ তার আশা ছিল প্রতিটি গরু থেকে অন্তত ৬৫ হাজার টাকা পাবেন।
দারাছ মিয়া বলেন, ‘আমার আরও চারটি গরু আছে। সেগুলোও বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। কিন্তু দাম খুব হতাশাজনক।’
গরুর খাবারের সংকটের কথা জানিয়ে এই কৃষক বলেন, ‘আকষ্মিক বন্যায় খড় পচে গেছে। স্তূপ করে রাখা খড়ে চারা গজিয়েছে। গরুকে খাওয়ানোর মতো কিছু নেই।’
হাওরজুড়ে এখন একই চিত্র। ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সব জায়গায় গবাদিপশুর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা প্রকৃত দামের অর্ধেক মূল্যে গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পানি জমে থাকায় কৃষকের গোলায় ধান নেই, খড়ও নেই। খামারিরা বলছেন, এখন বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নাহলে গরু শুকিয়ে রোগা হয়ে যাবে, তখন দাম আরও কমে যাবে।
একই এলাকার আরেক কৃষক আবদুল সাত্তার। চারটি গরু তিনি বিক্রি করেছেন মাত্র দেড় লাখ টাকায়। সেই টাকার পুরোটাও এখনো হাতে পাননি। আবদুল সাত্তার বলেন, ‘পাইকার বলেছে টাকা পরে দেবে। বাকি পাঁচটি গরুর দিকে তাকিয়ে আছি।’ কমপক্ষে দুই লাখ টাকা দাম পাওয়ার আশা ছিল তার।
এলাকার আরেক বাসিন্দা মতিন মিয়া। তিনি তিনটি গরু বিক্রি করেছেন মাত্র ৬০ হাজার টাকায়। আক্ষেপ করে বলেন, ‘শুধু আমি নই, এলাকার বেশির ভাগ কৃষক পরিবারের এখন একই অবস্থা।’
চলতি মৌসুমে হাওরের ফসল প্রায় পুরোটাই তলিয়ে গেছে। কৃষকেরা জানান, জমির সামান্য অংশের ফসল তারা ঘরে তুলতে পেরেছেন। পানির ওপরে যতটুকু খড় ছিল, তা-ও পচে গেছে।
গত বুধবার বিকেলে দেখা যায়, কৃষকেরা রাস্তার পাশে প্রায় পচে যাওয়া খড় শুকাচ্ছেন। কৃষক মদরিছ আলী দুর্গন্ধযুক্ত এক বোঝা খড় নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি বলেন, ‘গরুও এই খড় খেতে চাইবে না। তবু নিয়ে যাচ্ছি। আর কিছু না পেলে হয়তো বাধ্য হয়ে খাবে।’
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার ইকরাম হাওরের বড় কৃষক সাত্তার মিয়া। কৃষকদেরকে গরু বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন তিনি। কারণ জিগাসা করতেই বললেন, ‘গরুকে ঠিকমতো না খাওয়ালে শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে দাম আরও কমবে। এখন বিক্রি করলে অন্তত কিছু টাকা পাওয়া যাবে। প্রান্তিক কৃষকদের আগে নিজেদের বাঁচতে হবে।’
বানিয়াচংয়ের উন্নয়নকর্মী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক কৃষক আমাকে বলেছেন—গরু বাঁচানো যাবে না, নিজেদের বাঁচানোই কঠিন। গরু রাখলে খাওয়াব কী?’
তিনি জানান, হাওর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও পুষ্টির নিরাপত্তায় গবাদিপশুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গরিব পরিবারে শিশুদের পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস গরুর দুধ। এখন পশুগুলো বিক্রি হয়ে গেলে অনেক কৃষক আর নতুন করে তা কিনতে পারবেন না। এতে হাওরের পুরো জীবনচক্র ব্যাহত হবে।
গবাদিপশু ছাড়া আগামী বছরের চাষাবাদ কীভাবে সামলাবেন এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব বেশির ভাগ কৃষকের কাছেই নেই। কেউ ঋণ নেওয়ার কথা বলছেন, কেউ বলছেন সময় হলে দেখা যাবে।
তবে হাওর অঞ্চলে গবাদিপশুর দাম কমার বিষয়টি আংশিক সত্য বলে দাবি করেছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক আবু জাফর মো. ফেরদৌস।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে হাওর এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিন দেখেছি। কৃষকদের দাবি পুরোপুরি ঠিক নয়। এ বছর সিলেট বিভাগে কোরবানির জন্য প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।’
