উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শোরুমগুলোতে আশানুরূপ ক্রেতা না থাকা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাজারে বিক্রি কিছুটা বেড়েছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হলেও বাজারে এবার স্পষ্টভাবে বদলে গেছে ক্রেতাদের চাহিদার ধরন। বড় ও দামি পণ্যের পরিবর্তে তুলনামূলক সাশ্রয়ী পণ্যের দিকে ঝুঁকেছেন ক্রেতারা। আর ফ্রিজের বাজারে এবার সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা গেছে চেস্ট ফ্রিজার বা ডিপ ফ্রিজে।
ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে তাদের নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। তবে আগের বছরের তুলনায় বড় ও উচ্চমূল্যের (হাই-এন্ড) ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চাহিদা এবার তুলনামূলক কম ছিল। এর বিপরীতে মাঝারি ও কম দামের পণ্য ভালো বিক্রি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে মূল্য নিয়ে সংবেদনশীলতা ছিল। একই বাজেটের মধ্যে অনেকে বড় সাইজের টেলিভিশন অথবা বিকল্প ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ক্রেতারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসাব করে খরচ করছেন।
তিনি আরও জানান, ফোনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হলেও অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় এবার শোরুমে সরাসরি আসা ক্রেতার সংখ্যা কম ছিল।
ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স বিভাগের প্রোডাক্ট হেড মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, সাধারণত বটম মাউন্ট ও টপ মাউন্ট রেফ্রিজারেটরের বিক্রিই বাজারে সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। পুরো মৌসুমজুড়েই ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল চেস্ট ফ্রিজার বা ডিপ ফ্রিজের দিকে।
তিনি জানান, সাধারণত ঈদের তিন থেকে চার দিন আগে ডিপ ফ্রিজারের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরু থেকেই এর চাহিদা ছিল ব্যাপক। ফলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং আসা বেশিরভাগ পণ্যই দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
তার ভাষ্য, যেখানে সাধারণত বটম মাউন্ট ও টপ মাউন্ট ফ্রিজ বাজারে আধিপত্য করে, সেখানে এবার ডিপ ফ্রিজ উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করেছে। বিপরীতে বটম মাউন্ট রেফ্রিজারেটরের বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
ওয়ালটন হোম অ্যান্ড কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সেসের চিফ বিজনেস অফিসার মো. আবদুল্লাহ-আল-জুনায়েদ বলেন, তাদের কোম্পানি বর্তমানে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বিক্রি অব্যাহত ছিল এবং গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ওয়াশিং মেশিন ও ওভেনের চাহিদা সারা বছরই স্থিতিশীল থাকে। তবে ঈদুল আজহা উপলক্ষে মশলা পেষার জন্য ব্লেন্ডার এবং দ্রুত মাংস রান্নার জন্য প্রেসার কুকারের চাহিদা বেড়ে যায়। এবারও এই দুই পণ্যের বিক্রি ভালো হয়েছে। পাশাপাশি কুকওয়্যার পণ্যের বিক্রিও সন্তোষজনক।
র্যাংগস ইমার্টের ব্র্যান্ড ম্যানেজার মাহমুদুল ইসলাম রাজ বলেন, ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসগুলোতে হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রি কিছুটা বেড়েছিল। তবে দীর্ঘ ছুটির কারণে অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ায় শোরুমে প্রত্যাশিত ক্রেতাসমাগম হয়নি।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো নানা বাহ্যিক কারণ ক্রেতাদের আস্থা ও কেনাকাটার আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ইলেকট্রো মার্ট গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নুরুল আফসারও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানান। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল ভোক্তা মনোভাবের কারণে এবারের ঈদ বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে।
তার মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নতুন ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনার বদলে কোরবানির পশু কেনাকাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিক ঈদ মৌসুমের তুলনায় এবার বিক্রি প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম হয়েছে। যদিও ঈদের আগের কয়েক দিনে বিক্রিতে কিছুটা গতি ফিরে আসে।
