লেবাননের বিউফোর্ট দুর্গে পতাকা তুলে যে বার্তা দিলো ইসরায়েল

দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ—আরবি নাম ‘কালাত আল-শাকিফ’—বহু শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্য, ধর্মযুদ্ধ, দখলদারিত্ব এবং প্রতিরোধের ইতিহাসের সাক্ষী। ক্রুসেডারদের নির্মিত এই দুর্গ কখনও মধ্যযুগীয় সামরিক ঘাঁটি, কখনও ফিলিস্তিনি গেরিলাদের অবস্থান, আবার কখনও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের সংঘাতে দুর্গটির পতন আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আজ রোববার ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিউফোর্ট রিজ বা বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে। তার ভাষায়, এটি ‘গ্যালিলি অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোর একটি’।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা কেবল একটি সামরিক সাফল্যের বিবরণ নয়; বরং এটি হিজবুল্লাহ, লেবানন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি ইসরায়েলের একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা।

‘গোপন’ অভিযান থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা

দুর্গ দখলের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে কাৎজ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অভিযানটি এতদিন ‘ইনফরমেশন ব্ল্যাকআউট’ বা তথ্য গোপন অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছিল।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্দেশনা এবং আমার তত্ত্বাবধানে ইসরায়েলি বাহিনী লিতানি নদী অতিক্রম করে বিউফোর্ট রিজ দখল করেছে। এটি গ্যালিলি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আমাদের বাহিনীর সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোর একটি।’

কাৎজের বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, এটি ছিল পরিকল্পিত ও বহুস্তরীয় সামরিক অভিযান। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল চেয়েছিল সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পরই বিষয়টি প্রকাশ করতে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ঘোষণার মাধ্যমে ইসরায়েল নিজ দেশের জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে দক্ষিণ লেবাননে চলমান ব্যয়বহুল অভিযানের বাস্তব ফলাফল রয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিউফোর্ট?

দুর্গটি দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলে একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। এখান থেকে লিতানি নদী উপত্যকা, দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং উত্তর ইসরায়েলের সীমান্ত অঞ্চল স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

সামরিক পরিভাষায় এটিকে বলা হয় ‘কমান্ডিং হাইট’—অর্থাৎ এমন উচ্চভূমি, যেখান থেকে গোয়েন্দা নজরদারি, গোলন্দাজ হামলা সমন্বয় এবং শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সহজ।

לראשונה מאז הנסיגה מלבנון: דגלי ישראל וגולני ניצבים בראש רכס הבופור @ItayBlumental @rubih67 pic.twitter.com/HMIbuPcHyf

লেবাননের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বাসাম ইয়াসিন বলেছেন, ‘১৯৮২ সাল থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘটিত প্রায় প্রতিটি বড় যুদ্ধে বিউফোর্ট দুর্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’

এ কারণেই দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি স্থাপনা দখলের বিষয় নয়; বরং এটি গোটা দক্ষিণ সীমান্তের সামরিক ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত।

লিতানি নদী অতিক্রম: যুদ্ধের নতুন অধ্যায়

বিউফোর্ট দুর্গ দখলের দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত দুর্গটি নয়, বরং সেখানে পৌঁছানোর পথ। ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লিতানি নদী অতিক্রম করে অভিযান পরিচালনা করেছে।

লিতানি নদী বহু বছর ধরে দক্ষিণ লেবাননের একটি কৌশলগত সীমারেখা। ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবে নদীর দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছিল।

এখন সেই নদী অতিক্রম করে ইসরায়েলি বাহিনীর উত্তরমুখী অগ্রযাত্রা অনেক বিশ্লেষকের কাছে যুদ্ধের নতুন ধাপের সূচনা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ‘একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থলসেনা দক্ষিণ লেবাননে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স লাইন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করেছে।’

অর্থাৎ, ইসরায়েল আর কেবল সীমান্ত রক্ষা করছে না; বরং দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে একটি নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।

২৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীরে অনুপ্রবেশ

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, বিউফোর্ট দুর্গ সত্যিই ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে এটি ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের পর সবচেয়ে গভীর স্থল অনুপ্রবেশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এই কারণেই ঘটনাটি শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রের খবর নয়; বরং এটি দক্ষিণ লেবাননের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলানি ব্রিগেডের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযান ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েল অঞ্চলটিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে।

হিজবুল্লাহর জন্য কী বার্তা?

বিগত দুই দশক ধরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের পার্বত্য অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে তাদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছে।

কিন্তু বিউফোর্ট দুর্গ দখলের দাবি করে ইসরায়েল মূলত বলতে চাইছে—হিজবুল্লাহর ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতীকী এলাকাগুলোও আর অপ্রবেশযোগ্য নয়।

তবে হিজবুল্লাহ এখনও পরাজয় স্বীকার করেনি। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা জাওতার আল-শারকিয়া, ইয়োহমোর আল-শাকিফ ও দিব্বিন এলাকার উপকণ্ঠে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের ভাষায়, ‘ইসরায়েলি বাহিনী এখনো এসব এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়নি।’ এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিউফোর্ট দুর্গকে ঘিরে তথ্যযুদ্ধও সমানভাবে চলছে।

‘ভূমি পুড়িয়ে দেওয়ার নীতি’

দুর্গ দখলের দাবির পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ‘ভূমি পুড়িয়ে দেওয়ার নীতি’ অনুসরণ করছে।

টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘তারা শহর ও গ্রাম ধ্বংস করছে, মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসরায়েলের জন্যও নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে না।’

এই মন্তব্য সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ এটি শুধু সামরিক অভিযান নয়; বরং মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

ইউনেস্কো ঐতিহ্য ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিউফোর্ট দুর্গ শুধু সামরিক স্থাপনা নয়; এটি একটি ইউনেস্কো-সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

লেবানন সরকার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলকে সতর্ক করেছে যে চলমান সংঘাতের কারণে দুর্গটি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে যদি দুর্গটির কাঠামোগত ক্ষতি হয়, তাহলে তা শুধু লেবাননের নয়, পুরো মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি হবে।

এই কারণে সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি বিউফোর্ট এখন সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।

কূটনৈতিক আলোচনায় চাপ সৃষ্টি

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিউফোর্ট দুর্গ দখলের ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে যখন ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের সামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নিরাপত্তা আলোচনা চলছে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, ‘আলোচনার ফলাফল নিশ্চিত নয়, তবে এটি আমাদের জনগণের জন্য সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল পথ।’

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অগ্রগতি দেখিয়ে ইসরায়েল কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

অর্থাৎ, ভবিষ্যতের যেকোনো যুদ্ধবিরতি বা সীমান্ত চুক্তি যেন তাদের তৈরি করা নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই হয়—সেই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের প্রতি গোপন বার্তা

বর্তমান সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হলো ইরান। হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে বিউফোর্ট দুর্গ দখলের দাবি করে ইসরায়েল মূলত তেহরানকেও বার্তা দিচ্ছে যে তার আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলো সরাসরি সামরিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

এ কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, বিউফোর্ট দুর্গের লড়াই আসলে শুধু লেবাননের নয়; বরং এটি ইসরায়েল-ইরান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও একটি অধ্যায়।

ফলে বিউফোর্ট দুর্গ দখলের ইসরায়েলি দাবি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এটি শুধু একটি পাহাড়চূড়ার দুর্গ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা কাঠামো, হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ কৌশল, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ইসরায়েল এটিকে ‘কৌশলগত বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে লেবানন এটিকে আরও গভীর আগ্রাসনের অংশ হিসেবে দেখছে। হিজবুল্লাহ বলছে, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।

ফলে বিউফোর্ট দুর্গ আজ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা রাজনীতি এবং কূটনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Related Articles

Latest Posts