সাভারে পুলিশের অভিযানে বেদেপল্লির বাসিন্দাদের নির্যাতনের অভিযোগ

ঢাকার সাভারে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় বেদেপল্লির বাসিন্দাদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৯ জুন রাত পৌনে ৮টার দিকে সাভারের বক্তারপুর এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত  আসামি রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম শামীম ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মশিউর রহমান।

পরে হামলাকারীদের আটক করতে রাত ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত সাভারের বেদেপল্লির বিভিন্নস্থানে অভিযান চালায় পুলিশ।

অভিযোগ উঠেছে, সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ ও পরিদর্শক হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে একাধিক নারীসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও নির্যাতন করা হয়েছে।

বেদেপল্লির কাঞ্চনপুর মহল্লার মুদি দোকানি রফিকুল ইসলাম (৪৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত ৯ জুন রাত ১২টার দিকে একদল পুলিশ দোকানে ঢুকে আমাকে গালিগালাজ করে। পুলিশের এক সদস্য শার্টের কলার ধরে আমাকে দোকান থেকে বের করে আনেন। সেসময় গেটের ভেতর থেকে আমার স্ত্রী বলেন, “আমার স্বামী সাধারণ মুদি দোকানি।” তখন পুলিশ আমার স্ত্রীকেও গালিগালাজ করে। পরে আমার স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘কোনো অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ আমার ও স্ত্রীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছে। এটা পুলিশ করতে পরে না।’

রফিকুলকে হয়রানির একটি ভিডিও পেয়েছে ডেইলি স্টার। ভিডিওতে দেখা যায়, পরিদর্শক হেলাল উদ্দিনের সামনে রফিকুলকে শার্টের কলার ধরে দোকান থেকে টেনে বের করা হচ্ছে।

রফিকুলের দোকানের কাছেই তিন রুমের টিনশেডের একটি বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকেন পেশায় সাপুড়ে রতন মিয়া (৫০)।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘রাত সাড়ে ১২টার দিকে এলাকায় চিৎকার ও কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ দরজা ভেঙে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমার ঘরে ঢুকেন। তারা আমাকে ও স্ত্রীকে মারতে মারতে ঘর থেকে বের করে আনে।’

‘বাইরে এসে দেখি আমার বড় ছেলে আকাশ, তার স্ত্রী আখি ও ছোট ছেলে আরিফকে মারধর করছে পুলিশ’, বলেন রতন।

তিনি আরও বলেন, ‘পরে আমাদের গাড়িতে ওঠায়। তখন পুলিশকে বলি—বাড়িতে দুইটা ছোট বাচ্চা আছে। আমাদের নিয়ে গেলে তাদের দেখবে কে? পরে ছোট ছেলে আরিফকে ছাড়া সবাইকে ছেড়ে দেয়।’

রতন বলেন, ‘আমার ছেলেকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আমাদের অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে। পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

রতনের বড় ছেলে আকাশ পেশায় অটোরিকশাচালক।

তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে অটোরিকশা দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাই। মাথার কয়েকটি সেলাই লেগেছে। এখনো সুস্থ হইনি। এর মধ্যে আমাকে মারতে মারতে কাঠের রোলার ভেঙেছে পুলিশ। আমার মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। ছোট ভাইকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছে। আমার এর বিচার কোথায় পাবো?’

একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আকাশের মা ও রতন মিয়ার স্ত্রী নাসিমাকে গলার ওড়না ধরে এক নারী পুলিশ সদস্য হেনস্তা করছেন।  

ওই রাতে পেশায় সাপুড়ে সাগর মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তার পরিবারের অভিযোগ, কয়েক মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় সাগরের গলার সামনের অংশের দুটি হাড়ে (কলার বোন হাড়) আঘাত পেয়েছেন। অভিযানের সময় তাকে অমানবিক নির্যাতন করে পুলিশ। পরে মামলায় সাগরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

সাগরকে নির্যাতনের একটি ভিডিও পেয়েছে ডেইলি স্টার। এতে দেখা যায়, সাগরকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেছেন পুলিশ সদস্যরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেদেপল্লির একাধিক বাসিন্দা ডেইলি স্টারকে বলেন, অভিযানের সময় পুলিশ যাকে পেয়েছে, তাকেই মারধর করেছে। নারী-পুরুষ কেউই বাদ যায়নি। বেশ কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে পুলিশ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছে। এরপরও পরদিন আসামি রফিকুল ইসলামকে আমরা আটক করে পুলিশের কাছে সোর্পদ করেছি। যেন নিরপরাধ মানুষদের হয়রানি করা না হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন ডেইলি স্টারকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘কাউকেই হয়রানি বা নির্যাতন করা হয়নি। যারা অপরাধ করেছে, তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও রয়েছে, জানানো হলে তিনি বলেন, ‘ভিডিওগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এমন কোনো অভিযোগ আমার কাছে কেউ করেননি। যেহেতু ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, সেগুলো আমাকে পাঠালে আমি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেব।’

তিনি আরও বলেন, সাধারণ জনগণ হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হলে বিচার হবে।

গ্রেপ্তার আরিফ ও সাগরের বিষয়ে এসপি শামীমা পারভীন বলেন, ‘অপরাধীরা কখনোই তাদের অপরাধ স্বীকার করে না। তারা বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। তারপরও কেউ যদি তদন্ত নিরাপরাধ প্রমাণিত হয়, তাহলে মামলা থেকে বাদ যাবে।’

 

Related Articles

Latest Posts