দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চিত্রকলা, টেলিভিশন, নাটক এবং শিশুদের জন্য সৃজনশীল নানা কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রজন্মের প্রেরণা। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ।
তিনি বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের গুরু। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, ছিলেন উচ্চ রুচির একজন দারুণ ব্যক্তিত্ব।’
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের খুব কাছের ও অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন। ১৯৬৭ সালের কোনো একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয়ই আজীবনের সম্পর্কে রূপ নেয়। তার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি, অনেক কিছু জেনেছি। কত বিচিত্র বিষয়ে যে তার জ্ঞান ছিল, তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি আমাদের শিল্পের গুরু।’
মামুনুর রশীদ বলেন, আমি তাঁকে ‘মন্টু ভাই’ বলে ডাকতাম। তার কাছ থেকে যে স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই প্রিয় মন্টু ভাই আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি যে কাজ করে গেছেন, যে অবদান রেখে গেছেন, তা দেশ ও মানুষ সব সময় মনে রাখবে।
‘১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করার সময় তার আরও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তখনই বুঝেছিলাম, তিনি শুধু অসাধারণ শিল্পী নন, অসাধারণ একজন মানুষও। শিল্পচিন্তাই ছিল তার জীবনের মূল বিষয়,’ বলেন তিনি।
মামুনুর রশীদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করার সময় আমি ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ নামে একটি মঞ্চনাটক লিখেছিলাম। কলকাতায় নাটকটি মুস্তাফা মনোয়ারের নির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। পরে বাংলাদেশে ফিরে আমরা নাটকটি মঞ্চে এনেছিলাম। তাই তার সঙ্গে আমার স্মৃতির কোনো শেষ নেই।
মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পীসত্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জলরঙের চিত্রকলায় তার সমকক্ষ শিল্পী খুব কমই আছেন। তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী। একই সঙ্গে ছিলেন উচ্চ রুচির মানুষ। ধীরে ধীরে আমরা সেই মানুষদের হারিয়ে ফেলছি, যারা আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, তার অসংখ্য সৃষ্টি তাকে মানুষের মনে অমর করে রাখবে। রক্তকরবীর মতো কালজয়ী নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
মুখরা রমণী বশীকরণসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার সৃজনজীবনের অংশ। শিশুদের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের কাজের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, তিনি শিশুদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। শিশুদের জন্য অসংখ্য কাজ করেছেন। তার মন অনেক বড় ছিল বলেই শিশুদের জন্য এত সুন্দর সৃষ্টি রেখে যেতে পেরেছেন। তার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা।
শেষে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। গান নিয়েও তিনি অনেক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সত্যি বলতে, তাকে নিয়ে বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আমি বিশ্বাস করি, তিনি তার কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
