ফরিদপুরে গত ২১ জুন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, একদিন আগে আটকের সময় তাকে মায়ের সামনেই মারধর করা হয়েছিল। পরদিন ইশতিয়াকের মরদেহ পায় পরিবার।
কদিন পর গত ২৪ জুন চট্টগ্রামে কারা হেফাজতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যু হয়। তিনিও একদিন আগে সুস্থ অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
গত বছরের ৩১ জানুয়ারি কুমিল্লায় যৌথ বাহিনীর হেফাজতে যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় এসেছিল। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নের ছবি সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়েছিল।
বিভিন্ন সময়ে পুলিশ, র্যাব বা কারাগারের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা মানুষ কীভাবে মারা যান, নির্যাতনে মারা গেলে আইন কী বলে?
আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের পর একজনের জীবন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সুস্থ অবস্থায় আটক হওয়া ব্যক্তির মরদেহ কয়েক ঘণ্টা বা দিনের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফিরছে। কখনো অসুস্থতা বা আত্মহত্যা, কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোককে মৃত্যুর কারণ বলা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে এটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।
হেফাজতে মৃত্যু বলতে কী বোঝায়?
পুলিশ, ডিবি, র্যাব, বিজিবি বা কারাগারের মতো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় কারও মৃত্যু হলে তাকে হেফাজতে মৃত্যু বা কাস্টোডিয়াল ডেথ বলা হয়।
সব হেফাজতে মৃত্যুই নির্যাতনের কারণে ঘটে, এমনটা না-ও হতে পারে। অসুস্থতা, আত্মহত্যা বা অন্য কারণেও কেউ মারা যেতে পারেন।
তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, হেফাজতে থাকা অবস্থায় যেকোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ওপর বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়। কারণ তখন ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অবস্থানে থাকেন না।
পরিসংখ্যান কী বলছে
বাংলাদেশে সরকারিভাবে ‘হেফাজতে মৃত্যু’ নিয়ে কোনো কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অধিকার ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংকলিত তথ্যই ব্যবহার করা হয়।
আসকের হিসোবে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত শুধু কারা হেফাজতেই ৯০০-এর বেশি বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তবে এর সবগুলো নির্যাতনের কারণে হয়েছে—এমন দাবি সংস্থাটি করে না। অনেক মৃত্যু অসুস্থতা বা অন্যান্য কারণেও হয়েছে। তাই ‘হেফাজতে মৃত্যু’ ও ‘নির্যাতনে মৃত্যু’, দুই ধরনের ঘটনা আলাদা।
অধিকারের তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত নির্যাতনে ৪৮৬টি হেফাজতে মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে—আওয়ামী লীগ সরকারের সময় (২০০৯-২০২৪) সর্বোচ্চ ২১৩টি, বিএনপির প্রথম মেয়াদে ১৮৪টি, দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৪৮টি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২৯টি এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের শুরুতে আরও দুটি। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকারের আমলেই এমন ঘটনা ঘটেছে।
আইন কী বলে
বাংলাদেশের সংবিধান, ফৌজদারি আইন এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩—এই তিনটি আইনি ভিত্তি হেফাজতে থাকা ব্যক্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করে।
সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ কাউকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার মৌলিক অধিকার বাতিল হয়ে যায় না।
বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন বা ক্যাটে যোগ দেয়। দীর্ঘ দাবির পর ২০১৩ সালে সংসদে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনটি পাস হয়। হেফাজতে নির্যাতনকে প্রথমবার আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এই আইন।
কোনো সরকারি কর্মকর্তা তথ্য বা স্বীকারোক্তি আদায়, শাস্তি বা ভয় দেখানো অথবা বৈষম্যমূলক কারণে কাউকে নির্যাতন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নির্যাতনে মৃত্যু হলে শাস্তি আরও কঠোর—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিধান আছে।
আইনটি প্রণয়নের সময় এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার আইন ভাবা হয়েছিল।
হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে সেটিকে শুধু একটি ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে সাধারণত সুরতহাল, ময়নাতদন্ত, ইনকোয়েস্ট এবং প্রয়োজনে বিচার বিভাগীয় বা ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত অথবা আদালতের নির্দেশে স্বাধীন তদন্ত হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে ২০১৩ সালের আইনের আওতায় পৃথক ফৌজদারি মামলাও করা যায়।
নির্যাতিত হলে ভুক্তভোগী নিজে, তার স্ত্রী বা স্বামী, বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন বা আইনগত প্রতিনিধি আদালতে অভিযোগ করতে পারেন। আর নির্যাতনের ফলে মৃত্যু হলে তার পরিবারের সদস্য বা আইনগত প্রতিনিধি মামলা করতে পারেন। পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানালে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাওয়ার সুযোগও আছে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, সাধারণ নাগরিকরা প্রায়ই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন না। মামলা করলেও তদন্ত প্রক্রিয়াটি ন্যায়ের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটা সংস্থা যদি তাদের নিজ সদস্যদের নামে অভিযোগ তদন্ত করে, তাহলে সেটা কতটা ন্যায্য ও স্বচ্ছ হয়?
বাস্তবতা কী?
কাগজে-কলমে ব্যবস্থা থাকলেও ভুক্তভোগী পরিবারের সামনে বাধার শেষ নেই—মামলা নিতে গড়িমসি, সাক্ষীদের ভয়, দীর্ঘ তদন্ত এবং অভিযুক্তরাই একই বাহিনীর সদস্য থাকায় নিরপেক্ষ তদন্তের সংকট।
আসক ও অন্য মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রতিবছর অনেক হেফাজতে মৃত্যু ঘটলেও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা বিরল। ২০১৩ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগের মামলায় দণ্ড হয়েছে—এমন ঘটনা বিরল।
পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলার রায় হয় গত বছরের আগস্টে। হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দণ্ড দেওয়া হয়। অথচ এই মামলাটি করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। বাকি অধিকাংশ মামলাই তদন্ত পর্যায়ে ঝুলে আছে বা দীর্ঘসূত্রিতায় শেষ হয়নি।
এ কারণেই এসব অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন সংস্থা বা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) কার্যকর তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এনএইচআরসিকে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু তদন্তের ক্ষমতা দিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সেই অধ্যাদেশ ল্যাপস বা বাতিলের প্রক্রিয়ায় গেছে এবং প্রস্তাবিত খসড়া এনএইচআরসি বিলে কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্তক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়েছে।
