সবুজ মাঠে যখন ইতিহাসের পদধ্বনি

ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচ মানেই কি কেবলই পরের রাউন্ডে যাওয়ার লড়াই? ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই অন্য কিছু।

বিগত ছয় দশক ধরে মাঠের স্মৃতি, বিতর্ক আর আবেগের যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা ফুটবল ম্যাচকে ছাড়িয়ে রূপ নিয়েছে এক চিরন্তন দ্বৈরথে। যেখানে জড়িয়ে আছে এক অধিনায়কের মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি, ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত হ্যান্ডবল, ইতিহাসের অন্যতম সেরা একক গোল, ডেভিড বেকহ্যামের চোখের জল এবং পরবর্তীতে তার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।

প্রতিটি প্রজন্মই ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের কোনো না কোনো রূপ দেখে বড় হয়েছে।

আজকের প্রবীণদের স্মৃতিতে হয়তো এখনো জ্বলজ্বল করছে পিটার শিল্টনকে ফাঁকি দিয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’। আবার কেউ কেউ হয়তো রোমাঞ্চিত হন সেন্ট এতিয়েনে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া মাইকেল ওয়েনের সেই অবিশ্বাস্য গোলের কথা ভেবে, যেখানে মুহূর্তের ব্যবধানে বেকহ্যামের লাল কার্ড পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। আর আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে আগামী বৃহস্পতিবারের সেমিফাইনালটি হতে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক মহাকাব্যের প্রথম চাক্ষুষ অধ্যায়।

আর এই প্রথম, এই চিরন্তন নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছেন লিওনেল মেসি।

আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবল জাদুকর আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রায় প্রতিটি চ্যালেঞ্জই জয় করেছেন। কিন্তু তার বর্ণিল ক্যারিয়ারের ক্যানভাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো বিশ্বকাপের গল্প এত দিন অনুপস্থিত ছিল।

অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটছে। বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট পাওয়ার এই লড়াইয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথটি খুঁজে পেয়েছে তার নতুন মহানায়ককে।

মেসি এই গল্পের সর্বশেষ নায়ক, তবে প্রথম নন। এই গল্পের শুরু তাকে দিয়ে হয়নি, এমনকি ম্যারাডোনাকে দিয়েও নয়। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা ফুটবলের অন্যতম সেরা এক দ্বৈরথ রচনা করেছে, যেখানে রাজনীতির ছায়া এসে পড়েছে খেলার মাঠে, বিতর্ক রূপ নিয়েছে লোকগাথায়, আর প্রতিটা বিশ্বকাপ ম্যাচ রেখে গেছে এমন কিছু গল্প যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।

এই বৈরিতার শিকড় পোঁতা আছে ১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে।

কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের ১-০ গোলের সেই জয় তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পথ সুগম করেছিল ঠিকই, কিন্তু ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের সেই বিতর্কিত লাল কার্ডের ঘটনার জন্য। জার্মান রেফারির ভাষা বুঝতে না পেরে রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রতিবাদস্বরূপ রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য নির্ধারিত লাল গালিচায় গিয়ে বসে পড়েন।

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের ম্যানেজার আলফ রামসে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ‘পশু’ বলে কটূক্তি করেন এবং নিজের দলের খেলোয়াড়দের জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় এই পরাজয়কে আখ্যা দেওয়া হয় ‘শতাব্দীর সেরা চুরি’ হিসেবে—যার ক্ষোভ অনির্বাণ থেকেছে দীর্ঘ ছয় দশক। তবে মজার ব্যাপার হলো, রাত্তিনের সেই লাল কার্ডের বিভ্রান্তিই পরবর্তী সময়ে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালুর পথ তৈরি করে দেয়।

এরপর ফুটবলের সঙ্গে এসে মিশে গেল রক্তক্ষয়ী ইতিহাস।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধ দুই দেশের ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। মাত্র ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে প্রায় ৯০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা দক্ষিণ আটলান্টিকের দুই পাড়েই গভীর আবেগময় ক্ষত রেখে যায়।

ফলে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে যখন এই দুই দল আবার মুখোমুখি হলো, সেটি আর সাধারণ কোনো কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল না।

অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের সেই অবিস্মরণীয় চার মিনিটে ম্যারাডোনা যেন ফুটবলের দুই চরম বৈপরীত্যের রূপ তুলে ধরলেন। প্রথমে রেফারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পিটার শিল্টনের মাথার ওপর দিয়ে হাত দিয়ে বল জালে জড়িয়ে জন্ম দিলেন কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’-এর। এর ঠিক চার মিনিট পরেই দেখা গেল তার অতিমানবীয় রূপ; নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে বল ধরে একা পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে শিল্টনকে বোকা বানিয়ে করলেন শতাব্দীর সেরা গোল। ফিফা পরবর্তীতে একে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ঘোষণা করে।

বছরের পর বছর পরে ম্যারাডোনা তার আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছিলেন, সেই জয়টি ছিল ফকল্যান্ডস যুদ্ধের এক প্রতীকী প্রতিশোধ। তার ভাষায়, ইংল্যান্ডকে হারানো মানে ছিল ‘কোনো ফুটবল দলকে নয়, যেন একটা আস্ত দেশকে হারিয়ে দেওয়া।’

এই নাটকের পরবর্তী খলনায়ক ও নায়ক দুই রূপেই আবির্ভূত হলেন ডেভিড বেকহ্যাম।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিল আরেক ক্লাসিক ম্যাচ। মাইকেল ওয়েনের একক নৈপুণ্যের অসাধারণ গোলটি ইংল্যান্ডের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারত, কিন্তু ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে মৃদু ধাক্কাধাক্কির পর মাঠের উত্তেজনায় বেকহ্যামের সেই এক মুহূর্তের ভুল বদলে দিল সব সমীকরণ। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন বেকহ্যাম। দশজন নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে লড়েও টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিল ইংল্যান্ড। আর দেশে ফিরে বেকহ্যাম দেশবাসীর চোখে খলনায়কে পরিণত হলেন।

তবে ফুটবল সবসময়ই তার গল্প নতুন করে লিখতে ভালোবাসে।

চার বছর পর সাপোরায় বেকহ্যামের নেওয়া এক ঠান্ডা মাথার পেনাল্টিতে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারায় ইংল্যান্ড। এই জয়ে ইংল্যান্ড নকআউট পর্বে পৌঁছায় আর আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে খলনায়ক থেকে জাতীয় বীরে পরিণত হলেন বেকহ্যাম।

এরপরই হঠাৎ করে কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল এই চিরচেনা লড়াই।

দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার আর কোনো দেখা হয়নি। পুরোনো স্মৃতিগুলোর রোমন্থন হয়েছে, চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে, কিন্তু নতুন কোনো অধ্যায় যুক্ত হয়নি।

অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটছে।

জাপানে বেকহ্যামের সেই মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের ২৪ বছর পর, বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে আবারও মুখোমুখি এই দুই পরাশক্তি।

এবার সব আলো কেড়ে নিয়েছেন মেসি। ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন এবং অসমাপ্ত এক গল্পে অবশেষে পা রাখলেন তিনি। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা আবারও স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে গাইবেন তাদের সেই বিখ্যাত ‘মুচাচোস’ গান—যা ম্যারাডোনা ও মেসিকে বন্দনা করার পাশাপাশি ফকল্যান্ডস যুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর শহীদদেরও স্মরণ করায়। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের বর্তমান প্রজন্ম বিশ্বাস করে, এবার তারা দুঃখের স্মৃতি মুছে এক নতুন বিজয়ের ইতিহাস লিখবে।

ম্যারাডোনা আজ আর নেই। বেকহ্যামও বুট জোড়া তুলে রেখেছেন বহু বছর আগে। রাজনৈতিক তিক্ততাও হয়তো সময়ের সাথে কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, আর স্টেডিয়ামের আবহও আলাদা। কিন্তু কিছু দ্বৈরথ কখনো পুরোনো হয় না।

কারণ, ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়, ইতিহাস তখন পেছনের পাতায় পড়ে থাকে না; খেলোয়াড়দের আগেই তা মাঠে এসে হাজির হয়।

 

Related Articles

Latest Posts