প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনতে নতুন খসড়া নির্দেশিকা তৈরি করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর একজন শিক্ষার্থীর কী জানা উচিত, কী ধরনের দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতার পাশাপাশি নাগরিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এতে।
খসড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পঞ্চম শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থীরা যেন সাবলীলভাবে পড়তে, লিখতে, গণনা করতে, শেখা বিষয় ব্যাখ্যা করতে ও মৌলিক ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারে।
এসব লক্ষ্য অর্জনে পাঠ্যবই, শিক্ষক সহায়িকা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক উপকরণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও ভিডিও পাঠ সমন্বিতভাবে তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি পাঠে নির্দিষ্ট শিখনফল, শিক্ষকের জন্য নির্দেশনা, দ্রুত মূল্যায়নের ব্যবস্থা ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এই নির্দেশিকা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক মৌলিক ভাবনার প্রতিফলন। চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞ কমিটিগুলো তৈরি করবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা এ বিষয়ে আলোচনা করছে।
তিনি বলেন, ভাষা ও গণিতের ভিত্তিমূলক দক্ষতার পাশাপাশি মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও আধুনিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্ব পাবে। সামাজিক, নৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও পাঠ্যক্রমের অংশ হবে।
‘প্রাথমিক শিক্ষাক্রম উন্নয়ন’ শীর্ষক এই খসড়া নথিতে পাঠ্যবই, শিক্ষক সহায়িকা, সহায়ক উপকরণ ও ভিডিও পাঠ তৈরির একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। এসব উপকরণ প্রণয়নে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই), জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে।
পঞ্চম শ্রেণি শেষে কী জানবে শিশুরা
খসড়া নির্দেশিকায় ‘ব্যাকওয়ার্ড ডিজাইন’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে নির্ধারণ করা হবে পঞ্চম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থীর কী জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকা উচিত। এরপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রতিটি শ্রেণির শিখনফল, পাঠদান, শিক্ষাসামগ্রী ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সাজানো হবে।
প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অন্তত একটি দৃশ্যমান শেখার কার্যক্রম থাকবে। যেমন পড়া, লেখা, সমস্যা সমাধান, ব্যাখ্যা করা বা প্রমাণসহ উপস্থাপন, এসব অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
পঞ্চম শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থীরা বাংলায় শ্রেণি-উপযোগী গল্প ও তথ্যভিত্তিক লেখা পড়তে এবং অনুচ্ছেদ, চিঠি ও সংক্ষিপ্ত প্রতিফলনমূলক লেখা লিখতে পারবে। ইংরেজিতে মৌলিক কথোপকথন, ছোট লেখা পড়া ও নির্দেশনা অনুসরণ করে অনুচ্ছেদ ও প্রয়োজনীয় নোট লেখার সক্ষমতা অর্জন করবে।
গণিতে ভগ্নাংশ, দশমিক, পরিমাপ ও উপাত্ত, এই চারটি ধারণা ব্যবহার করে গাণিতিক সমস্যার সমাধান ও ব্যাখ্যা করতে পারার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান, নাগরিক দায়িত্ব, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার বিষয়েও নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন, কারণ-ফল সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে এবং নাগরিক দায়িত্ব, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, জাতীয় ইতিহাস ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারে, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন পরবর্তী শ্রেণিতে যেতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ বা হঠাৎ জটিলতার মুখোমুখি হতে না হয়। অর্থাৎ, পাঠ্যবই ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হবে, কিন্তু অপ্রস্তুত অবস্থায় অতিরিক্ত তথ্য বা কঠিন ধারণা যুক্ত করা হবে না।
প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মৌখিক ভাষা, খেলাধুলা, ছন্দ, প্রাক-গাণিতিক ধারণা ও সামাজিক আচরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রতিদিন বাংলা ও গণিত এবং প্রতিদিনই মৌখিক ইংরেজি চর্চার প্রস্তাব রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিকে পড়তে শেখা থেকে ‘পড়ে শেখা’য় উত্তরণের ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে সমন্বিত শিক্ষাসামগ্রী
প্রতিটি শ্রেণির জন্য পাঠ্যবই বা রিডারের পাশাপাশি কার্যপুস্তিকা, শিক্ষক সহায়িকা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়িকা এবং ভিডিও পাঠ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সব উপকরণে একই শিখনক্রম ও মূল্যায়ন কাঠামো অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
খসড়ায় নিম্নমানের ছবি ও মুখস্থনির্ভর অনুশীলনী বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র, কমিকস, আলোকচিত্র, মানচিত্র ও ডায়াগ্রাম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক উপকরণে কেবল পাঠ্যবই পুনরাবৃত্তি নয়, বরং অক্ষর চেনা বা মৌলিক গণনার মতো নির্দিষ্ট শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ছয় থেকে নয় মিনিটের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ভিডিও পাঠ, তিন থেকে পাঁচ মিনিটের সংক্ষিপ্ত পাঠ এবং দুই থেকে চার মিনিটের পুনরুদ্ধারমূলক ভিডিও তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন
খসড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, মূল্যায়ন শুধু পাঠ্যবই শেষ করার ওপর নির্ভর করবে না। শিক্ষার্থীরা শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, তা যাচাই করা হবে। এ জন্য প্রতি মাসে বাংলা ও গণিতে মূল্যায়ন, প্রতি দুই সপ্তাহে ইংরেজিতে মৌখিক দক্ষতা যাচাই এবং প্রতি সপ্তাহে নাগরিক দায়িত্ববোধের পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। এনসিটিবি পাঠ্যক্রম, পাঠ্যবই ও শিক্ষক সহায়িকার বিষয়বস্তু তৈরি করবে। নেপ কাজ করবে পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ভিডিও পাঠের চিত্রনাট্য নিয়ে। আর ডিপিই শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষাসামগ্রী, রুটিন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, গ্রাম, শহর, চর, হাওর, বস্তি ও পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালুর পর দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হবে। বেসরকারি সংস্থা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা কারিগরি পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় সহায়তা করবেন।
খসড়ায় সুপারিশ করা হয়েছে, শিক্ষক সহায়িকা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য পরিকল্পনা, মূল্যায়ন তালিকা এবং ভিডিও পাঠের নমুনা প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পাঠ্যবই মুদ্রণে না পাঠাতে।
এতে ৯০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় শ্রেণিকক্ষের সময়সূচি নির্ধারণ, পঞ্চম শ্রেণির শিখনফল চূড়ান্ত করা, শিক্ষক সহায়িকা ও পুনরুদ্ধারমূলক উপকরণের নমুনা তৈরি, ভিডিও পাঠের চিত্রনাট্য প্রস্তুত এবং মাঠপর্যায়ে পর্যালোচনার কাজ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এটি কমিটিগুলোর জন্য একটি প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা। তাদের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর তা বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় ব্র্যাক, গণসাক্ষরতা অভিযান (ক্যাম্পে) এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সহযোগী প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।
তিনি জানান, কমিটিগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে এনসিটিবি নতুন পাঠ্যবই ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাসামগ্রী তৈরির কাজ শুরু করবে।
