২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালের বাকি আর মাত্র এক সপ্তাহ। বিশ্বজয়ের সোনালী স্বপ্ন বুকে নিয়ে টিকে রয়েছে কেবল চারটি দল। গত এক মাসে সহ-আয়োজক কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র এবং ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও জার্মানির মতো ৪৪টি দলকে বিদায় নিতে হয়েছে। বর্তমানে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন লড়াইয়ে টিকে রয়েছে। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্যে মাঠে নামবে তারা।
চলুন দেখে নেওয়া যাক সেমিফাইনালের দলগুলোর শক্তির জায়গা এবং সমীকরণ।
ফ্রান্স বনাম স্পেন (মঙ্গলবার, বাংলাদেশ সময় রাত ১টা | আর্লিংটন, টেক্সাস)
ফ্রান্স: অপরাজেয় গতি ও আক্রমণভাগ
সেমিফাইনালের পথ: ফ্রান্সের সেমিফাইনালের যাত্রা ছিল বেশ মসৃণ। এখন পর্যন্ত ছয়টি ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে তারা, গোল করেছে ১৬টি। কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিসের আক্রমণাত্মক নৈপুণ্যের সামনে প্রতিপক্ষরা স্রেফ উড়ে গেছে। গ্রুপ পর্বে সেনেগাল (৩-১), ইরাক (৩-০) ও নরওয়েকে (৪-১) অনায়াসে হারিয়ে শেষ ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেয় ফরাসীরা। শেষ ১৬-তে প্যারাগুয়ের শারীরিক ফুটবল কিছুটা বাধা তৈরি করলেও এমবাপের পেনাল্টিতে ১-০ গোলের জয় পায় ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নরা। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে এমবাপের পেনাল্টি মিস হলেও, দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত এক একক গোল এবং দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করিয়ে ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
সেরা পারফর্মার: টুর্নামেন্টে ৮টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট নিয়ে সবার ওপরে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে। উসমান দেম্বেলে (৫ গোল, ২ অ্যাসিস্ট) এবং মাইকেল অলিসও (৫ অ্যাসিস্ট) দারুণ ফর্মে আছেন। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের রেকর্ড অবিশ্বাস্য; ২০ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা ২০টি, যা কেবল লিওনেল মেসির পেছনে।
সেরা মুহূর্ত: কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের ৬০ মিনিটে এমবাপের দুর্দান্ত গোলটি ছিল ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির মুহূর্ত, যা দলের আধিপত্যকে জয়ে রূপান্তর করে।
স্পেন: ডিফেন্স ও মেরিনো ম্যাজিক
সেমিফাইনালের পথ: ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন এখনো তাদের সেরা ফর্মে না ফিরলেও, খুব একটা বিপদে পড়েনি। কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে আসর শুরু করলেও সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ পর্ব পার করে তারা। এরপর অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারায়। শেষ ১৬-তে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের ৯০ মিনিটে মিকেল মেরিনোর গোলে ১-০ ব্যবধানের নাটকীয় জয় পায় স্পেন। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও বদলি হিসেবে নেমে ৮৮ মিনিটে মেরিনোর করা গোলেই ২-১ ব্যবধানে জেতে স্প্যানিশরা। রদ্রি এবং হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে ফেরা লামিন ইয়ামাল ধীরে ধীরে ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে, যা এই বিশ্বকাপের সেরা রক্ষণভাগ।
সেরা পারফর্মার: মাত্র ১৩৬ মিনিট খেললেও স্পেনের সবচেয়ে বড় ত্রাতা মিকেল মেরিনো। এছাড়া মিকেল ওয়ারজাবাল ৪টি গোল করেছেন। মাঝমাঠে রদ্রি দলের মূল ভরসা।
সেরা মুহূর্ত: কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মেরিনোর অন্তিম মুহূর্তের গোলটি স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গত ইউরোতেও জার্মানির বিপক্ষে তিনি একইভাবে দলকে জিতিয়েছিলেন।
মাঠের লড়াই যেখানে নির্ধারিত হবে
ফ্রান্স পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। তবে স্পেন বল পজিশন ধরে রেখে ফ্রান্সের আক্রমণের গতি কমিয়ে দেওয়ার কৌশল নিতে পারে। কিন্তু ফ্রান্স যদি একবার বল কেড়ে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে যায়, তবে এমবাপের গতি ও অলিসের নিখুঁত পাস স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্সের জন্য মারাত্মক হতে পারে। মাঝমাঠে রদ্রি বনাম এমবাপে-অলিস দ্বৈরথই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেবে।
ভবিষ্যদ্বাণী ও বাজির দর
লিজ বেচেরানো: ফ্রান্স ৩-১ স্পেন
জেফ কার্লাইল: ফ্রান্স ২-১ স্পেন
বিল কনেলি: স্পেন ২-১ ফ্রান্স
রব ডসন: ফ্রান্স ১-০ স্পেন
টম হ্যামিল্টন: ফ্রান্স ৩-১ স্পেন
গ্যাব্রিয়েল মারকোটি: স্পেন ২-১ ফ্রান্স
জেমস অলি: ফ্রান্স ১-২ স্পেন
মার্ক অগডেন: ফ্রান্স ২-১ স্পেন
বাজির দর: ফ্রান্স: -১৫৫ | স্পেন: +১২৫
ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা (বুধবার, বাংলাদেশ সময় রাত ১টা | আটলান্টা)
ইংল্যান্ড: বেলিংহামের কাঁধে ভর করে লড়াই
সেমিফাইনালের পথ: ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ৪-২ গোলের বড় জয় দিয়ে শুরু করলেও ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে থমকে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। পানামাকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ৩২-এ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মুখোমুখি হয় তারা। শুরুতে পিছিয়ে পড়লেও হ্যারি কেইনের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে রক্ষা পায় ইংলিশরা। এরপর মেক্সিকোর বিপক্ষে মাঠের বৈরি পরিবেশ ও জ্যারেল কোয়ানসার লাল কার্ড সত্ত্বেও জুড বেলিংহামের জোড়া গোল এবং কেইনের পেনাল্টিতে ৩-২ গোলে জেতে তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে আবারও পিছিয়ে পড়ে অতিরিক্ত সময়ে বেলিংহামের জাদুতে ২-১ গোলের নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নেয় থমাস টুখেলের দল।
সেরা পারফর্মার: জুড বেলিংহাম ছাড়া ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠা অসম্ভব ছিল। রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৬টি গোল করে গোল্ডেন বলের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠেছেন।
সেরা মুহূর্ত: নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে বেলিংহামের করা জয়সূচক গোলটি ইংলিশ সমর্থকদের বুনো উল্লাসের উপলক্ষ এনে দেয়।
আর্জেন্টিনা: মেসির অবিস্মরণীয় রূপকথা
সেমিফাইনালের পথ: আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের যাত্রা ছিল চরম রোমাঞ্চ ও উত্তেজনায় ভরপুর। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া (৩-০), অস্ট্রিয়া (২-০) ও জর্ডানকে (৩-১) হারিয়ে সহজে পার হলেও নকআউটে প্রতি ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দির বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিততে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে হয়। শেষ ১৬-তে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের ১০ মিনিট বাকি থাকতেও ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। এরপর ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও মেসির ৪ মিনিটের ঝড়ে সমতা ফেরার পর ৯৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের জাদুকরী গোলে ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় পায় তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের চোখ ধাঁধানো গোল এবং লাউতারো মার্টিনেজের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
সেরা পারফর্মার: ৩৯ বছর বয়সেও দলের সেরা তারকা লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার ১৭টি গোলের মধ্যে ৮টিই করেছেন তিনি, সঙ্গে রয়েছে ১টি অ্যাসিস্ট। সেইসঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১ গোল করার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন ইন্টার মায়ামির এই মহাতারকা।
সেরা মুহূর্ত: মিশরের বিপক্ষে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৯৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের করা জয়সূচক গোলটি ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবেগঘন মুহূর্ত।
মাঠের লড়াই যেখানে নির্ধারিত হবে
মেসির জাদুতে ভর করে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠলেও তাদের ডিফেন্স বেশ নড়বড়ে। দলটির ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশন মাঝমাঠে মেসিকে সাহায্য করার জন্য বাড়তি সুবিধা দেয়। ইংল্যান্ডের কাজ হবে ডেকলান রাইস ও বেলিংহামের শারীরিক শক্তি ও গতি ব্যবহার করে মেসিকে বোতলবন্দী করা। টুখেল নিজের দলকে নরওয়ে ম্যাচের পর ‘ভাগ্যবান’ বলে সতর্ক করেছেন, তাই ফাইনালে যেতে হলে ইংল্যান্ডকে নিখুঁত ফুটবল খেলতে হবে।
ভবিষ্যদ্বাণী ও বাজির দর
লিজ বেচেরানো: ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনা (পেনাল্টিতে জিতবে আর্জেন্টিনা)
জেফ কার্লাইল: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা
বিল কনেলি: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা
রব ডসন: ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনা (পেনাল্টিতে জিতবে ইংল্যান্ড)
টম হ্যামিল্টন: ইংল্যান্ড ৩-২ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়ে)
গ্যাব্রিয়েল মারকোটি: আর্জেন্টিনা ০-০ ইংল্যান্ড (পেনাল্টিতে জিতবে আর্জেন্টিনা)
জেমস অলি: ইংল্যান্ড ১-২ আর্জেন্টিনা
মার্ক অগডেন: ইংল্যান্ড ২-১ আর্জেন্টিনা
বাজির দর: ইংল্যান্ড: -১৩৫ | আর্জেন্টিনা: +১১০
