বিশ্বে আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে বছরে ২৪ থেকে ২৬ লাখ টন আম উৎপাদিত হয় এবং এর অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার।
তারপরও দেশে নিয়মিত আম আমদানি করা হয়। আর এসব আম আসে উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের সারা বছর আমের চাহিদা মেটাতে।
গুলশান, বনানী, বায়তুল মোকাররম, ধানমন্ডি ও উত্তরার কাঁচাবাজার ও সুপারশপগুলোর ফলের দোকানে সারা বছরই এসব আমদানি করা আম দেখা যায়। বেশি দাম দিয়ে হলেও বছরজুড়ে আম কিনতে ইচ্ছুক উচ্চ আয়ের ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতেই এসব আম বিক্রি করা হয়।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাদের দিক থেকে বাংলাদেশের আম অতুলনীয়। তাই, দেশে যখন আমের মৌসুম চলে তখন আমদানি করা জাতগুলোর চাহিদা তেমন একটা থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আম আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৩ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে ১ হাজার ৩৪৩ টনে পৌঁছায়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি কমে ১৪১ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ২৯ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৪ দশমিক ৮৭ টনে নেমে আসে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে আমদানি আবার বেড়ে ৩৭ দশমিক ০৫ টনে পৌঁছায়।
থাইল্যান্ড, মিশর, ভারত, কেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, মিয়ানমার, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আম আমদানি করে বাংলাদেশ। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু থাইল্যান্ড ও ভারতের পাশাপাশি হাতে গোণা কয়েকটি দেশ থেকে আম আমদানি করা হয়েছে।
আম আমদানিকারক মো. আব্দুল মানিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আগে খরচ কম থাকায় আমদানি বেশি হয়েছিল। তখন প্রতি কেজিতে শুল্ক ছিল ৪৫ টাকার মতো, আর উড়োজাহাজে পরিবহন খরচ ছিল প্রতি কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর এখন প্রতি কেজিতে শুল্কই দিতে হয় প্রায় ৫০০ টাকা। সেইসঙ্গে প্রতি কেজিতে উড়োজাহাজে পরিবহন খরচ বেড়ে প্রায় ৩০০ টাকা হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে এসব আমের দামও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই আমদানিও কমেছে।’
থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে খাদ্য আমদানিতে মাত্র প্রায় পাঁচ শতাংশ কর আরোপ করা হয় উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাংলাদেশে কর কমানো হলে আঙুর, আপেল ও মাল্টার মতো ফল আরও কম দামে পাওয়া যাবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমদানি করতে যে খরচ পড়ে যায়, তাতে উচ্চ আয়ের অল্পসংখ্যক মানুষই আমদানি করা আম কিনতে পারেন। আসলে মিষ্টি বেশি হওয়ার কারণে এসব আমের চাহিদা রয়েছে। থাই সুইট ম্যাঙ্গো এখনো সবচেয়ে বেশি চলে।’
ইউনিমার্টের গুলশান-২ শাখার বিক্রয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ লিমন জানান, দেশে আমের মৌসুম শুরু হলে বিদেশি আমের চাহিদা কমে যায় এবং সে অনুযায়ী আমদানিও কমানো হয়। মৌসুম শেষ হলে আবার আমদানি বাড়ে।
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার আর২ই২, ভারতের কাটিমন ও থাইল্যান্ডের ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ আরও কয়েকটি জাতের চাহিদা বেশি। এগুলোর পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস থেকেও আম আমদানি করা হয়। আর২ই২ প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। কাটিমন বিক্রি হয় প্রতি কেজি ২৫০ টাকায়।’
লিমনের ভাষ্য, বছরজুড়ে এসব আমের চাহিদা থাকলেও রমজানে চাহিদা বাড়ে। রমজানে সব জাতের আমের চাহিদা বেশি থাকে।
গুলশান-২ কাঁচাবাজারের ফল বিক্রেতা কবির হোসেন বলেন, ‘থাইল্যান্ডের জাম্বু, চেরি ম্যাঙ্গো ও সুইট ম্যাঙ্গোর চাহিদা বেশি। জাম্বু প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা, চেরি ম্যাঙ্গো ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং সুইট ম্যাঙ্গো ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।’
তার ভাষ্য, আমদানি করা এসব আমের মূল ক্রেতা বড় ব্যবসায়ী ও ভালো বেতনের পেশাজীবীরা। প্রতি সপ্তাহে তিনি প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কেজি আম বিক্রি করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সরফ উদ্দিন বলেন, ‘দেশে আমের মৌসুম না থাকলে আমদানি করা আম ভোক্তার চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু, স্বাদ ও মানের হিসাব করলে আমদানি করা আমগুলো বাংলাদেশের আমের সমকক্ষ নয়। আসলে সারা বছর যারা আম খেতে চান, তারা বাজারে প্রাপ্যতার ভিত্তিতেই আমদানি করা আম কেনেন।’
